স্বামী-স্ত্রীসহ ১১ বাংলাদেশীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার

এনআরবি নিউজ, নিউইয়র্ক থেকে : মোজাম্মেল হক এবং তার স্ত্রী নাসরীন সুলতানাসহ ১১ বাংলাদেশীকে ১১ অক্টোবর ভোর রাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্টের বিশেষ বিমানে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অবৈধ ও অপরাধী শতাধিক অভিবাসীর সাথে এই ১১ জনকেও কড়া প্রহরায় ঢাকায় নামিয়ে দেয়া হবে।

হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্টে আইস তথা ইমিগ্রেশন এ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট’র মিডিয়া দফতর এ তথ্যের সত্যতা স্বীকার করে এনআরবি নিউজকে জানান, ‘এটি প্রচলিত কার্যক্রমেরই একটি অংশ। একদিকে অভিবাসনের আইন লংঘন, অপরদিকে নানাবিধ অপকর্মে লিপ্তদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের যে কার্যক্রম চলছে, তারই ধারাবাহিকতায় এদের গ্রেফতার করে নিজ নিজ দেশে পাঠিয়ে দেয়া হলো।’ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি দফতরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দৈনিক গড়ে প্রায় ৪০০ অবৈধ অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে। গত বছরের চেয়ে তা ৪০% বেশী।

এই ১১ বাংলাদেশীর মুক্তির ব্যাপারে মার্কিন সিনেট ও কংগ্রেসে আবেদনকারী একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার প্রধান মাজেদা এ উদ্দিন এনআরবি নিউজকে প্রচন্ড ক্ষোভের সাথে বলেন, ‘শুধুমাত্র গুরুতর অপরাধীদের ধরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে সামাজিক ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে’-এমন দাবি করছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। অথচ এই ১১ বাংলাদেশীর একজনও কোন ধরনের অপরাধে লিপ্ত ছিলেন না। তাদের অপরাধ একটাই, আর তা হচ্ছে অভিবাসনের মর্যাদা নেই। তারা সকলেই ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা দোকানের বিক্রেতা অথবা ট্যাক্সি ড্রাইভিং করে দিনাতিপাত করছিলেন। ব্রুকলীনের কোনি আইল্যান্ডে রেস্টুরেন্টে কর্মরত অবস্থায় মোজাম্মেল হককে গ্রেফতারের সময় তার স্ত্রী (একই রেস্টুরেন্টের কর্মী) বাধা দিয়ে ফেঁসে গেছেন। কারণ, তিনিও অবৈধভাবে এদেশে বাস করছিলেন। এ দম্পতির ৩টি শিশু সন্তান রয়েছে। সকলেরই জন্ম আমেরিকায়। অপর বাংলাদেশীদেরও রয়েছে ২৫ শিশু-সন্তান। বাবার অনুপস্থিতিতে এই শিশুদের কী অবস্থা হবে, সেটি উল্লেখ করে সম্পূর্ণ মানবিক কারণে তাদের মুক্তি প্রদানে সর্বাত্মক সহায়তা চেয়ে আবেদন করেছিলাম ইউএস সিনেট ও ইউএস হাউজে। কিন্তু কোন সাড়া পাইনি।’

মাজেদা এ উদ্দিন বুধবার রাতে এনআরবি নিউজকে আরো জানান, ‘নিউইয়র্ক সিটির মেয়র বিল ডি ব্লাসিয়ো কিছুক্ষণ আগে এক বার্তায় আমাকে জানিয়েছেন, গ্রেফতারকৃতদের জামিনে মুক্তির ব্যাপারে তিনি চেষ্টা করবেন।’

এদিকে, নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন স্যাঙ্কচুয়ারি সিটিতে অভিযান চালিয়ে গত মাসের শেষ সপ্তাহের ৪ দিনে বাংলাদেশীসহ ৪২ দেশের ৪৮৯ অবৈধ ইমিগ্র্যান্টকে গ্রেফতার করেছে আইস (ইমিগ্রেশন এ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) এজেন্টরা। এরা নানা অপকর্মে জড়িত ছিল এবং ইমিগ্রেশনের আইন লংঘন করে বসবাস করছিল। কর্মকর্তারা আরো জানান, যে সব সিটি প্রশাসন অবৈধ এবং ক্রিমিনাল ইমিগ্র্যান্টদের ধর-পাকড়ে আইসকে সহায়তা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছে সেগুলোতে এ ধরনের অভিযান মাঝেমধেই চালানো হবে।

নিউইয়র্ক সিটির এস্টোরিয়া, জ্যাকসন হাইটস, ব্রুকলীন এলাকায় এ অভিযানে কমপক্ষে ৯ বাংলাদেশীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ নিয়ে প্রবাসীদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার ঘটেছে। যদিও যারা কোন অপরাধে লিপ্ত নন বা ছিলেন না, তাদের ভয়ের কোন কারণ নেই বলে সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেছেন। এমন অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে সকলকে পরিচয়পত্র সাথে রাখার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। যাদের পরিচয়পত্র নেই, তারা যেন এমন কিছু সাথে রাখেন যা দিয়ে গ্রেফতার এড়ানো সম্ভব হয়। বিশেষ করে যাদের স্ট্যাটাস এডজাস্টমেন্ট অথবা অন্য কোন কর্মসূচিতে আবেদন পেন্ডিং রয়েছে, তারা যেন এটর্নীর পরামর্শ অনুযায়ী চলাচল করেন। এটর্নী মঈন চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ধর-পাকড় চলছে, তাই সংশ্লিষ্ট সকলকে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।’

আইসের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক টম হম্যান বলেছেন, স্যাঙ্কচুয়ারি সিটিতে অপরাধী অবৈধ ইমিগ্র্যান্টরা গ্রেফতার হলেও তাদেরকে বহিষ্কারের জন্যে ইমিগ্রেশন বিভাগের কাছে হস্তান্তর দূরের কথা, কারাগারেও আইসের লোকজনকে যেতে দেয়া হয় না। এভাবে তথাকথিত স্যাঙ্কচুয়ারি সিটির অজুহাত দিয়ে নিউইয়র্ক, লসএঞ্জেলেস, বস্টন, ফিলাডেলফিয়া, সানফ্রান্সিসকোসহ কয়েকশত সিটিকে অপরাধী অবৈধ ইমিগ্র্যান্টদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করা হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আইসকে লোকবল নিয়ে অভিযান পরিচালনা করতে হচ্ছে ‘নিরাপদ সিটি’ রচনার সংকল্প বাস্তবায়িত করার জন্যে।’
আইসের লক্ষ্য হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর সাথে সমাজের প্রতিটি সদস্যের মধ্যে সহযোগিতার দিগন্ত প্রসার করা, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং এর মধ্য দিয়েই সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যে মারাত্মক হুমকিওয়ালা অপরাধীদের শনাক্ত ও দমনে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা। জনগণের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোন অপরাধীকেই ছাড় দেয়া হবে না বলে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেন টম হম্যান।

এনফোর্সমেন্ট এ্যান্ড রিমুভাল অপারেশন এর নিউইয়র্কস্থ ফিল্ড অফিসের পুরিচালক থমাস আর ডেকার বলেন, জনগণের নিরাপত্তাকে আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি। সে কারণে সব ধরনের অপরাধীকে চিহ্নিত ও গ্রেফতারে সর্বাত্মক অভিযান চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, ইমিগ্রেশনের ঐতিহ্য রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এবং এজন্যে আমরা সকলেই গর্ববোধ করি। একইসাথে আমরা আইনের শাসনের ক্ষেত্রেও শীর্ষে রয়েছি। তাই, যারা যুক্তরাষ্ট্রে এসে অপরাধ করছে এবং সমাজ-জীবনকে ঝুঁকিতে ঠেলে দিচ্ছে, তাদের রেহাই দেয়ার কোন অবকাশ নেই।

উপরোক্ত অভিযানে গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে বাল্টিমোর-২৮, ইলিনয়ের কুক কাউন্টি-৩০, ডেনভার-৬৩, লসএঞ্জেলেস-১০১, নিউইয়র্ক-৪৫, ফিলাডেলফিয়া-১০৭, সিয়াটল-৩৩, সান্তাক্লারা কাউন্টি-২৭, ম্যাসেচুসেট্্স-৫০ এবং ওয়াশিংটন ডিসি থেকে ১৪ জন রয়েছে। এরমধ্যে ৩১৭ জন গুরুতর অপরাধে জেল খেটেছে, ৬৮ জনের বিরুদ্ধে বহিষ্কারের আদেশ রয়েছে, ১০৪ জনকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের পর আবারো বেআইনীভাবে ঢুকেছিলেন। চিহ্নিত একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য ছিল ১৮ জন।

আইস জানিয়েছে, এক বাংলাদেশী গুরুতর অপরাধ করে জেল খেটেছে। মানুষজনকে হয়রানি করেছে। হুমকি-ধমকি অব্যাহত রেখেছিল। একদিকে ইমিগ্রেশনের স্ট্যাটাস নেই, অপরদিকে সামাজিক অস্থিরতার জন্যে অভিযুক্ত হওয়ায় তাকেসহ বেশ ক’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে অবিলম্বে বহিষ্কারের প্রক্রিয়ায়।

শেয়ার করুন