ফের বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের স্রোত

ফাইল ছবি

সিলেটের সকাল ডেস্ক ।। মিয়ানমার রাখাইন রাজ্য। টানা দুই মাস ধরে সেদেশের সেনাবাহিনীর নির্মম সহিংসতায় মৃত্যুপুরীতে ইতোমধ্যে পরিণত হয়েছে।সেখান থেকে পালিয়ে আসা সব রোহিঙ্গার গল্প যেন একই। কষ্ট, দুর্ভোগ, ক্ষুধা, আতঙ্ক আর নির্যাতনে প্রিয় ঘরবাড়ি ছেড়ে তারা পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের অনেকেরই মুখে স্বজনহারানোর করুণ কাহিনী। সব পেছনে ফেলে প্রাণ বাঁচাতে ছুটছেন নিরাপদ আশ্রয়স্থল বাংলাদেশের দিকে। এতে আবার নতুন করে শুরু হয়েছে রোহিঙ্গা স্রোত। দলে দলে আসছেন তারা।

সোমবার ভোর রাত থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সীমান্তের নাফ নদ পেরিয়ে আনজিমানপাড়া দিয়ে অর্ধলাখের বেশি রোহিঙ্গা উখিয়ায় অনুপ্রবেশ করেছেন। তারা আশ্রয় নিয়েছেন বিভিন্ন আশ্রয় ক্যাম্পে। এদিকে রোহিঙ্গা বহনকারী নৌকা ডুবে বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ১১টি লাশ। জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন অনেকে।

পালিয়ে আসা বুচিদং নয়ংশপাড়া গ্রামের মাদরাসাশিক্ষক হাফেজ ফয়েজ উল্লাহ (৪৮) বলেন, তাদের বর্মি ভাষায় ‘বাঙালি লেখা’ কার্ড নিতে জোর-জবরদস্থি করা হচ্ছে। এ কার্ড না নিলে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হচ্ছে। এতে বুচদিং এলাকার ১৪টি গ্রামে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে রোহিঙ্গারা দলে দলে এপারে চলে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি জানান, তিনি নয়ংশপাড়া হাফেজিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতা করতেন। কয়েক দিন থেকে বর্মি সেনা ও রাখাইন যুবকরা মাদরাসাটি দখল করে। তারা সেখানে ক্যাম্প করেছে। ওই ক্যাম্পে রোহিঙ্গা লোকজনদের ডেকে এনে বর্মি ভাষায় ‘বাঙালি’ লেখা কার্ড নেয়ার জন্য জোর জবরদস্তি করা হচ্ছে। সামরিক জান্তার নয়া কৌশল অনুমান করতে পেরে শিক্ষিত রোহিঙ্গারা এসব কার্ড গ্রহণ করেননি। ক্ষিপ্ত হয়ে বর্মি জান্তারা গ্রামে গ্রামে গিয়ে গরু, ছাগল, হাস, মুরগি, ধান-চাল লুট করছে।

বুচিদং মুরাপাড়া গ্রাম থেকে পালিয়ে আসা আনজিমানপাড়া বেড়িবাঁধে ৯ সদস্যের পরিবার নিয়ে বসে আছেন মোঃ মিয়া (৫৮)। তিনি জানান, মিয়ানমার সেনারা এবার শারীরিকভাবে নির্যাতন করছে না। তবে বাড়িঘরের মালামাল লুটপাট করছে। বিতরণ করছে সাদা কার্ড। কার্ড নিতে অপাগতা প্রকাশ করলে তাদের হাতে থাকা বন্দুক তাক করে রাতারাতি দেশ ত্যাগ করার নির্দেশ দিচ্ছে। ভয়, আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় বুচিদংয়ের বাপিডিপো, নাইছাদং, চিংদং, লাউয়াদং, নয়াপাড়া, চান্দেরবিল, লম্বাবিল, জংমং ও প্রংফোপাড়াসহ ১৪টি গ্রামের অর্ধলাখ মানুষ ৬ দিন পাহাড়-জঙ্গল, খাল-ছড়া পেরিয়ে সোমবার ভোরে নাফ নদের এ পারে চলে এসেছেন।

চান্দেরবিলের আবদুল আমিন (৩৫) জানান, তারা সবাই মিয়ানমারের ফাতিয়ারপাড়া ঢালা নামক স্থানে জড়ো হন বুধবারে। সেখানে বৃহস্পতি ও শুক্রবার পর্যন্ত তারা অবস্থান নেন পথে ফেলে আসা স্বজনদের জন্য। শনিবার ভোরে মিয়ানমার সেনা ও সশস্ত্র রাখাইন যুবকরা তাদের অবস্থান লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ করে। এ সময় দিগি¦দিক ছোটাছুটি করে পালাতে গিয়ে ৫০ জনের মতো বৃদ্ধ-নারী-পুরুষ গুরুতর আহত হন। তারা বেঁচে আছে কিনা- জানা নেই। আরও শতাধিক শিশু ও গর্ভবতী নারী নিখোঁজ রয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন। এ করুণ কাহিনী বলার সময় তার দুই চোখ বেয়ে পানি পড়ছিল। পালংখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ মনজুর ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আলী আহমদ, পালংখালী ইউপি চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী সোমবার ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত নতুন রোহিঙ্গা প্রবেশের সত্যতা স্বীকার করেন। তবে তারা সংখ্যায় কত হবে- তা তারা জানাতে পারেননি। গ্রামবাসীর দাবি, সোমবার ১ দিনেই অর্ধলাখের বেশি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছেন।

নৌকাডুবিতে ১১ নারী-শিশুর লাশ উদ্ধার : সোমবার ভোরের দিকে অনুপ্রবেশের জন্য আসা রোহিঙ্গা বহনকারী একটি ট্রলার টেকনাফের পশ্চিমপাড়া ভাঙা পয়েন্টে বঙ্গোপসাগরে ঢেউয়ের কবলে পড়ে ডুবে যায়। খবর পেয়ে স্থানীয় জেলে, জনসাধারণ ও কোস্টগার্ড তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসে। ঘটনাস্থল থেকে ২১ নারী-পুরুষ ও শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। এছাড়া পাঁচ শিশু ও ছয় নারীর লাশ উদ্ধার করা হয়। বাকিরা এখনও নিখোঁজ। তাদের উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

শাহপরীর দ্বীপ কোস্টগার্ড স্টেশন কমান্ডার লে. জাফর ইমাম শরীফ বলেন, অতিরিক্ত রোহিঙ্গাবাহী একটি ট্রলার বঙ্গোপসাগর হয়ে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টাকালে ডুবে যায়। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার কাজ চালানো হয়। উদ্ধার কাজ এখনও চলছে। স্থানীয় ইউপি মেম্বার নুরুল আমিন বলেন, ফজরের নামাজ পড়ে হাঁটার সময় রোহিঙ্গাবাহী একটি নৌকা আসতে দেখেন। কিছুক্ষণ পর নৌকাটি ডুবে যায়। তিনিসহ লোকজন গিয়ে সাতজনকে জীবিত উদ্ধার করেন। এর পরও উদ্ধার অভিযান চলছিল। কিছু লোক সাঁতারে উপকূলে আসতে দেখা গেছে। দালালের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ না থাকায় এ অপমৃত্যু বেড়েই চলেছে বলে সচেতন মহল মনে করছে।

শেয়ার করুন