আশান্বিত হব কী?

বাংলাদেশের জন্যে এটি নিঃসন্দেহে বড় কূটনৈতিক সাফল্য যে, মিয়ানমারের একজন মন্ত্রী রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট নিয়ে কথা বলতে প্রতিনিধি দল নিয়ে এসেছিলেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, এ বৈঠকে দুই দেশ একটি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনে একমত হয়েছে- যারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে কাজ করবে। লক্ষ্যণীয় ঘটনা হলো, মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলরের দপ্তরের মন্ত্রী যখন বাংলাদেশে ছিলেন, তখন দেশটি বিদেশি কূটনীতিকদের তিনটি গ্রুপকে রাখাইনের তিন এলাকা পরিদর্শনে নিয়ে গিয়েছে। যদিও এই বিদেশি কূটনীতিক কারা, তা এখনও প্রকাশ করা হয়নি। আবার একই দিন সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার সঙ্গে বৈঠকে মিয়ানমারের সমাজকল্যাণ, ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী উইন মিয়াত আয়ে বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে শরণার্থী ফিরিয়ে নেয়াটাই তাদের এখন অগ্রাধিকারমূলক বিষয়।

ঘটনাগুলো আপাতঃদৃষ্টিতে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু যে মিয়ানমারের ড্রোন ও হেলিকপ্টার গণহত্যা ও নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার পর অন্তত ১৯ বার আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে, এ দেশের জেলে নৌকায় একাধিকবার হামলা চালিয়েছে, তাদের এমন কূটনৈতিক পদক্ষেপকেও সতর্কতার সঙ্গেই দেখতে হয় বৈকি। কারণ মিয়ানমার শুধু রোহিঙ্গা গণহত্যা চালায়নি, বাংলাদেশকে উস্কানিও দিয়েছে- যাতে সংঘাত দেখা দেয়। মিয়ানমারের সৌভাগ্যই বলতে হবে যে, বাংলাদেশ সে ব্যাপারে নিস্পৃহ থেকেছে এবং দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে বার বার কূটনৈতিক পদক্ষেপের ওপর জোর দিয়েছে। আর বাংলাদেশের এই ইতিবাচক অবস্থান আন্তর্জাতিক পর্যায়েরও দৃষ্টি কেড়েছে। তবে বলতেই হয়, গণহত্যা থামাতে এবং ত্রাণ দিতে জাতিসংঘ কিংবা আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলো যত স্পষ্টভাবে কথা বলছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও তাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব দেয়ার ব্যাপারে তত উচ্চকিত নয়।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলের এ বৈঠকে আরও একটি ব্যাপার লক্ষ্যণীয়, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের এই প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘ যুক্ত থাকছে না। যে কোনো কারণেই হোক না কেন, বাংলাদেশের কাছে এখন মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে এবং এ বৈঠকেও দেখা গেছে, নিরাপত্তাসংক্রান্ত একটি আলাদা চুক্তির ব্যাপারেও দুই দেশ কথা বলেছে। তাই বাংলাদেশও বোধকরি জাতিসংঘের সম্পৃক্ততার ব্যাপারে তত আগ্রহী নয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলীকে এ ব্যাপারে সাংবাদিকদের কাছে বেশ স্পষ্টভাবেই বলতে শোনা গেছে, ‘এটার মধ্যে তো জাতিসংঘ আসছে না’। যতদূর জানা গেছে, বৈঠকে মিয়ানমারের মন্ত্রী জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর ব্যাপারে বেশ শক্তভাবেই আপত্তি তুলে বলেছেন, বড় জোর রেডক্রসকে এ ক্ষেত্রে যুক্ত করা যেতে পারে। এমন একটি সমঝোতা থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ভবিষ্যতে কোনদিকে মোড় নেবে, তা বলা মুশকিল।

 

প্রসঙ্গত মনে পড়ছে, ২০১২ সালের অক্টোবরে বারাক ওবামা মিয়ানমার সফর করার সময় বিশেষত বাংলাদেশের পর্যবেক্ষকদের বিশেষ দৃষ্টি ছিল, রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে তার বক্তব্য জানার। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতিই এমন যে, তারা দুই দিক থেকেই দাবা খেলে। ওবামা অবশ্য রোহিঙ্গা অধিকারের পক্ষে কিছু কথা বলেছিলেন। তবে অনেকেই নিশ্চয়ই জানেন, বার্মিজ ভাষায় এই বক্তব্যের অনুবাদ প্রচারের সময় রোহিঙ্গাবিষয়ক ওবামার গুরুত্বপূর্ণ অংশটুকু কেটে ফেলা হয়েছিল! মিয়ানমার মন্ত্রীর এ বাংলাদেশ সফর তাদের গণমাধ্যমে কতটুকু স্থান পেয়েছে, তা থেকেও অনুমান করা যায়, তারা কতটুকু আন্তরিক। মনে রাখা প্রয়োজন, মিয়ানমারের বেসামরিক পোশাকপরা সেনা সরকার দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির নয়টি জাতিগোষ্ঠীকে সশস্ত্রভাবে দমন করার চেষ্টা করে চলেছে। কখনও সহিংসতা চালিয়ে, কখনও-বা আলোচনার নামে কোনো বিষয়কে প্রলম্বিত করার কৌশল ভালো করেই জানা আছে তার।

ইমতিয়ার শামীম : সাংবাদিক

শেয়ার করুন