সিলেট নগরীতে একখণ্ড পর্যটন

আব্দুল্লাহ আল নোমান :: প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এই সিলেট। এখানে বেড়ানোর জায়গার যেন শেষ নেই। উঁচু-নিচু পাহাড়ে ঘেরা এখানকার প্রকৃতির বর্ণনা করে শেষ করা যায় না। এই সৌন্দর্য শুধুই উপভোগ করার। তাইতো এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেটকে ‘শ্রীভূমি সিলেট’ নামে আখ্যায়িত করেছিলেন।

পাহাড়-নদী-আর ঝর্ণার কলকলে সুর; সিলেটের জাফলং, বিছনাকান্দি,পান্তুমাই কিংবা মায়াবতি ঝর্ণায় গেলেই দেখা মেলে। এখানে রয়েছে দেশের প্রধানতম জলারবন রাতারগুল আর জুগিরকান্দি। আছে লালাখালের নীলাভ জল আর লোভাছড়ার মন মাতানো সবুজ প্রকৃতি। তাছাড়া রয়েছে কাঁঠালবাড়ীর জলাদ্বীপ। প্রকৃতির অনিন্দ সুন্দর এসব স্থানে গেলে পর্যটকের ক্লান্তি নিমিষেই দূর হয়ে যায়।

শুধু তাই নয়; দেখার মতো অনেক পর্যটন আকর্ষণ রয়েছে নগর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায়। দেশের প্রথম চা বাগান নগরের নিকটেই অবস্থিত। পাহাড়ের ঢেউ খেলানো আর ছিমছাম করে সাজানো এই চা বাগান নিমিষেই পর্যটকের মন কেড়ে নেয়।

তাছাড়া নগর পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ তার মধ্যে অন্যতম- ক্বিন ব্রিজ, আলী আমজাদের ঘড়ি, চাঁদনি ঘাটের সিঁড়ি, সবুজ গ্যালারীর স্টেডিয়াম, কাজির বাজার সেতু, হজরত শাহজালালের (রহ.) ও শাহ পরান (রহ.) সহ ওলি-আউলিয়াদের মাজার, এমসি কলেজ, খাদিমনগর জাতীয় উদ্যান, টিলাগড় উদ্যান, শাহী ঈদগাহ, গৌর গোবিন্দের টিলা প্রভৃতি।

বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে সিলেটেরসকালের পাঠকদের জন্য সংক্ষেপে সিলেট নগরী ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ঘুরে বেড়ানোর মত উল্লেখযোগ্য কয়েকটি পর্যটন আকর্ষণের পরিচয় তুলে ধরা হলো-

চা বাগান: ওপরে বড় বড় ছায়া বৃক্ষ। নিচে আধো আলো আধো ছায়ায় দুটি পাতা একটি কুঁড়ির সবুজ চাদর। যেন শৈল্পিক কারুকাজ। সিলেটের চা-বাগানের এ প্রাকৃতিক দৃশ্য পর্যটকের মন ছুঁয়ে যায়।

১৫০০ একর জায়গার ওপর অবস্থিত উপমহাদেশের প্রথম চা বাগান মালনীছড়ায় পর্যটকদের কাছে আরেক বিষ্ময়। সিলেটের চায়ের রঙ, স্বাদ এবং সুবাস অতুলনীয়। বর্তমানে বেসরকারি তত্ত্বাবধানে চা বাগান পরিচালিত হয়ে আসছে।

মালনীছড়া চা বাগান ছাড়াও সিলেটে লাক্কাতুরা চা বাগান, আলী বাহার চা বাগান, খাদিম আহমদ টি স্টেট, লালাখান টি স্টেট, বরজান টি স্টেট উল্লেখযোগ্য।

গ্রিন গ্যালারির স্টেডিয়াম:
লালমাটির পাহাড়ের স্তরের মধ্যে সবুজ বৃক্ষে ঢাকা চার ধাপের ছোট গ্যালারী, যেখানে গাছের ছায়ায় ও সবুজ ঘাসে গা হেলিয়ে সবুজের মাধুরী মিশিয়ে দর্শকরা উপভোগ করেন ক্রিকেটকে। এমন গ্যালারীর দেখা পাবেন সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামে।

লাক্কাতুড়া চা বাগানের পাশ্বে নির্মিত এই স্টেডিয়াম ২০১৪ সালের বিশ্ব টি-২০ খেলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মর্যাদা লাভ করে। চলতি বছরের নভেম্বরে বিপিএল ক্রিকেটের উদ্বোধনী আসর বসবে এই স্টেডিয়ামে।

শাহজালাল (র.) মাজার:
সিলেট নগরীর দরগাহ এলাকায় মনোরম টিলায় অবস্থিত তিনষাট আউলিয়ার প্রধান হযরত শাহজালাল (র.) এর মাজার অবস্থিত। এখানে প্রাচীন ঝর্ণা (কুপ), বড় ডেকচি, পুকুরের গজার মাছ, জালালী কবুতর, শাহজালালের তলোয়ার, ব্যবহৃত খড়ম ইত্যাদি দেখতে পাবেন পর্যটকরা।

শাহপরান (র.) এর মাজার: সিলেট শহরের প্রায় ৮ কিমি পূর্ব দিকে সিলেট তামাবিল সড়ক থেকে প্রায় ৩ কিমি ভিতরে সুউচ্চ ও মনোরম টীলায় অবস্থিত হযরত শাহ্পরাণ (র.)- এর মসজিদ ও দরগাহ্। তিনি ছিলেন হযরত শাহজালালের ভাগ্নে।

চাষনী পীরের মাজার: নগরীর শাহী ঈদগাহ কলবাখানি এলাকায় একটি টিলায় অবস্থিত তিনষাট আউলিয়ার অন্যতম সঙ্গি চাষনী পীরের মাজার। তার মাজার এলাকায় বানরের আধিক্যের কারণে বানর শাহর মাজার বা বান্দর টিলা নামেও ওই স্থানকে অভিহিত করা হয়। পর্যটকেরা সাধারণত বানর দেখতেই সেখানে যান।

ক্বীন ব্রিজ:
সিলেট শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সুরমা নদীর উপর স্থাপিত লৌহ নির্মিত সেতু। এটি সিলেটের অন্যতম দর্শনীয় এবং ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে পরিচিত। ১৯৩৬ সালে ব্রিজটি খুলে দেওয়া হয়। তৎকালীন গভর্ণর মাইকেল ক্বীনের নামেই ব্রিজটির নামকরণ করা হয়।

আলী আমজদের ঘড়ি: সিলেটে বিগ বেন নামে পরিচিত আলী আমজদের ঘড়ি। ১৮৭৪ সালে সুরমার তীরে ক্বীন ব্রিজের পার্শ্বে ঐতিহাসিক ঘড়িঘরটি নির্মাণ করেন কুলাউড়ার পৃত্থিমপাশার শিয়া জমিদার আলী আমজদ খান।

জিতু মিয়ার বাড়ি: সিলেটের জায়গীরদার খান বাহাদুর আবু নছর মোহাম্মদ এহিয়া ওরফে জিতু মিয়ার আবাসস্থল। এই বাড়িটি নগরীর শেখঘাটে কাজীর বাজারে অবস্থিত। এটি সিলেটের অন্যতম প্রধান দর্শনীয় স্থাপনা।

কাজির বাজার সেতু:
সুরমা নদীর উপর নির্মিত দৃষ্টিনন্দন এই সেতুটি পর্যটকের মন কাড়বে। সন্ধ্যায় সেতুর নিয়ন আলোর ঝলকানি আর নদীর পানিতে আলোর প্রতিচ্ছবি সত্যিই মনমুগ্ধকর।

 

 

খাদিমনগর জাতীয় উদ্যান: সুবজ অরণ্যের সমাহার খাদিমনগর জাতীয় উদ্যানেও ঘুরতে পারেন পর্যটকরা। বনে প্রকৃতির মাঝে হেঁটে বেড়ানো যাদের পছন্দ; তারাই যেতে পারেন সেখানে। ২০০৬ সালে প্রতিষ্টিত এই উদ্যানে রয়েছে নানা প্রজাতির গাছ-পালা। এছাড়া হাঁটার জন্য তিনটি ট্রেইল রয়েছে। সিলেট শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে তামাবিল-জাফলং রোডে খাদিমনগর জাতীয় উদ্যান।

টিলাগড় উদ্যান:
শহরতলীতে অবস্থিত আরো একটি উদ্যান। এখানে নির্মিত হচ্ছে সিলেটের প্রথম বন্য প্রাণী আশ্রয়ন কেন্দ্র। নগরীর টিলাগড় থেকে ওই উদ্যানে যাওয়ার পথে পড়বে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এখানে রয়েছে একাত্তরের সম্মুখ সমরে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের গণকবরও।

শাহী ঈদগাহ:
শাহী ঈদগাহ নানা কারণে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। ইংরেজ বিরোধী যুদ্ধের সাক্ষি এই স্থানটি। অনুপম কারুকার্যখচিত এই ঈদগাহের মূল ভূ-খণ্ডটি ২২টি সিঁড়ি মাড়িয়ে উপরে উঠতে হয়। বর্তমানে ঈদগাহের পার্শ্বেই নির্মিত হয়েছে সুউচ্চ মিনার। এটিও পর্যটকের নজর কাড়ছে।

এছাড়াও নগরী বিভিন্ন স্থানে ওলি আউলিয়ার মাজার, স্মৃতিচিহ্ন, রয়েছে গৌর গোবিন্দের টিলা, কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ, এমসি কলেজ ক্যাম্পাস ও ছাত্রাবাস, পর্যটন মোটেল ছাড়াও বিভিন্ন পার্ক-রিসোর্টতো রয়েছেই। তাই ঘুরে দেখতে পারেন এগুলোও।

শেয়ার করুন