রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের সমর্থক কি রাশিয়া ও চীন?

মিয়ানমারের সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং লিংয়ের নেতৃত্বে এবং অং সান সু চির সম্মতিতে সে দেশের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের জাতিগতভাবে নিধন করছে। এটা আমার কথা নয়, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এ কথা গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে বলেছে। তাদের হাতে গণহত্যার দালিলিক প্রমাণ রয়েছে। কয়েক দিন আগে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল রাখাইনের কিছু ছবি প্রকাশ করে বলেছে, কিছুদিন আগেও রোহিঙ্গারা যেখানে বাস করত, সেখানে এখন আর ঘরবাড়ি নেই।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর চলমান নিধনযজ্ঞ বন্ধে অং সান সু চিকে শেষ সুযোগ দেওয়া হলো। তিনি যদি এখনই এই নিধনযজ্ঞ বন্ধে পদক্ষেপ না নেন, তাহলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হবে। তিনি হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন, একে জাতিগত নিধনযজ্ঞ হিসেবেই গণ্য করা হবে। জাতিসংঘ মহাসচিব এও বলেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনীই এখনো দেশটি নিয়ন্ত্রণ করছে। আর রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধনযজ্ঞের হোতা তারা।

বিবিসির হার্ডটকস প্রগ্রামে জাতিসংঘ মহাসচিব সু চিকে উদ্দেশ করে বলেন, ১৯ সেপ্টেম্বর নিজ জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার সময়ই সু চিকে নিধনযজ্ঞ বন্ধের নির্দেশ দিতে হবে। রোহিঙ্গাদের নিজ ঘরে ফিরে যেতে দিতে হবে।

এর চেয়ে স্পষ্ট বক্তব্য আর কী হতে পারে? জাতিসংঘ মহাসচিব সবই বলে দিয়েছেন। আর তাঁর বক্তব্য যখন বিবিসি প্রচার করছিল, তখনো রাখাইনে গণহত্যা চলছিল। আর হত্যাযজ্ঞের মূল হোতা মিয়ানমার সেনাপ্রধান মিন অং লিং রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা তাদের স্বীকৃতি দাবি করছে। অথচ তারা কখনোই মিয়ানমারের নৃগোষ্ঠী ছিল না। এটি বাঙালি ইস্যু। আর এই সত্য প্রতিষ্ঠায় আমাদের একতাবদ্ধ হতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজের সরকারি পেজে তিনি এ মন্তব্য করেন।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সুরেই কথা বলেছেন মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি। তিনি গতকাল মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে পুরো বিশ্বকে হতাশ করেছেন। জাতিসংঘ মহাসচিবের আহ্বানকেও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন। রোহিঙ্গা শব্দটি পর্যন্ত তিনি উচ্চারণ করতে কুণ্ঠিত। রাখাইনের মুসলমানরা কেন বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, সেটাও খতিয়ে দেখা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। কিন্তু তাঁর বক্তব্যে সুনির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা নেই।

মিয়ানমার সেনাপ্রধানের বক্তব্যের নিন্দা জানানোর ভাষা নেই। এর চেয়ে বড় মিথ্যাচার আর কী হতে পারে! কে না জানে, মিয়ানমারের আরাকান (রাখাইন) প্রদেশ রোহিঙ্গাদের? রোহিঙ্গারা শত শত বছর ধরে আরাকানে বসবাস করে আসছে। সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীতে ওই অঞ্চলে রোহিঙ্গারা বসবাস শুরু করে। আমার আগের লেখাটিতে তা উল্লেখ করেছিলাম। সেনাপ্রধানের মিথ্যাচারের পর আবার উল্লেখ করতে হলো। এখন বাঙালি বলে চিৎকার-চেঁচামেচি করা হচ্ছে। মুসলমান বলেই কি রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে বিতাড়ন করা হবে?

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসামের মানুষও তো বাংলায় কথা বলে। তাই বলে কি ভারত তাদের নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে দেবে? বিশ্বের আরো অনেক দেশেই বাঙালি বসবাস করছে। কই, তাদের তো কেউ বাঙালি বলে তাড়া করছে না! মিয়ানমার সেনাবাহিনী মুসলিমবিদ্বেষী কেন? তারা কি মুসলমানদের তাড়িয়ে মিয়ানমারকে একটি বৌদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করতে চায়? আসলে কি মিয়ানমার কোনো ধর্ম মানে? ধর্ম মানলে কি মানুষের ওপর এমন নিষ্ঠুরতা চালাতে পারে?

বৌদ্ধ ধর্মের মূল কথাই হচ্ছে—‘জীব হত্যা মহাপাপ’। রোহিঙ্গা মুসলমানরা কি জীব নয়? বৌদ্ধ ধর্মের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামা মিয়ানমার সরকারকে গৌতম বুদ্ধের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, গৌতম বুদ্ধ বেঁচে থাকলে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াতেন। এর চেয়ে বড় বার্তা আর কী হতে পারে!

আমার ধারণা, মিয়ানমার সরকার কিংবা সেনাবাহিনী কেউই কোনো ধর্ম মানে না। ধর্ম মানলে তারা মানবজাতির ওপর গণহত্যা চালাতে পারত না। আজকে রাখাইনে কী হচ্ছে তাও কেউ জানতে পারছে না। পশ্চিমা মিডিয়ার সদস্যরা সেখানে যেতে চেয়েছিলেন; কিন্তু তাঁদের যেতে দেওয়া হয়নি। এর মধ্যে একটি গ্রুপকে তারা নিজেরাই নিয়ে গিয়েছিল খুবই সংরক্ষিত কিছু এলাকায়। তারাও সেখান থেকে ফিরে জ্বালাও-পোড়াওয়ের অনেক ছবি প্রকাশ করে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাকে রাখাইনে যাওয়ার অনুমতিই দেওয়া হয়নি। জাতিসংঘের কোনো প্রতিনিধি সেখানে যেতে পারছেন না। সেখানে মানবতার চরম বিপর্যয় ঘটেছে। প্রতিদিন মানুষ মেরে সাগরে ভাসিয়ে দিচ্ছে। পিতৃহারা সন্তান জানে না তার বাবা বেঁচে আছে কি না! স্ত্রী জানে না তার স্বামী কোথায়, কী অবস্থায় আছে! অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, সন্তানের সামনে তার বাবাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, যুবকদের ধরে ধরে হত্যা করা হচ্ছে। যাতে ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা প্রজন্ম বাড়তে না পারে সে কারণে যুবকরাই মিয়ানমার সেনাবাহিনীর টার্গেট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির নাৎসি বাহিনী ইহুদিদের টার্গেট করে একটি প্রজন্মকে নিঃশেষ করে দিয়েছিল। সেই একই কায়দায় রাখাইনের রোহিঙ্গা মুসলমানদের টার্গেট করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী।

বাংলাদেশে আসা চার লক্ষাধিক রোহিঙ্গার বেশির ভাগই নারী ও শিশু। প্রতিটি পরিবারের পুরুষ মানুষটিকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে মিয়ানমার বাহিনী ও মিলিশিয়া গোষ্ঠী। আর এই নির্মম হত্যাযজ্ঞ সমর্থন করছে রাশিয়া ও চীন। সারা বিশ্বে গণহত্যার অভিযোগে যখন অং সান সু চি, মিয়ানমার সেনাবাহিনী প্রধান মিন অং লিংসহ সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্ট সদস্যদের বিচারের দাবি উঠছে তখন তাদের রক্ষা করতে উঠেপড়ে লেগেছে রাশিয়া ও চীন।

রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। রাশিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সমর্থন দিয়েছে। নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছে। ভারতের পাশাপাশি রাশিয়ার সহযোগিতার কারণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ত্বরান্বিত হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। রাশিয়ার সহযোগিতায় বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ব্যক্তিগত সম্পর্কও অনেক ভালো। অথচ রোহিঙ্গা ইস্যুতে রাশিয়া মিয়ানমারের পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা বিবৃতি দিয়ে মিয়ানমারে বহির্বিশ্বের হস্তক্ষেপ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।

চীনের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো। আমি গত সপ্তাহেই আমার লেখায় তা উল্লেখ করেছি। অতীতে মিয়ানমারের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে সমাধানের ক্ষেত্রে চীন মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে। আর তাতে লাভবান হয়েছে বাংলাদেশ। রোহিঙ্গাদের মতো একটি বিশাল বোঝা যখন বাংলাদেশের ঘাড়ে চেপেছে, তখন চীনের মতো বন্ধু মিয়ানমারের পাশে দাঁড়িয়েছে। এটি রীতিমতো হতবাক করার বিষয়! এতেই বোঝা যায়, কে শত্রু আর কে বন্ধু।

ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী ভারতের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ শেখ হাসিনাকে টেলিফোন করে বাংলাদেশের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছেন। এর আগে বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা কালের কণ্ঠকে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত বাংলাদেশের পাশে থাকবে। এটা আশা জাগানিয়া খবর।

আমাদের আরো আশা জাগাচ্ছে জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এখন পর্যন্ত ওই দুই সংস্থার ভূমিকা প্রশংসার দাবি রাখে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা কাউন্সিল রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটি বৈঠক করেছে এবং হত্যাযজ্ঞ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। এর পরও মিয়ানমার কিন্তু ক্ষান্ত হয়নি। তারা হত্যাযজ্ঞ চালিয়েই যাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে। রাখাইনের দুই শতাধিক গ্রাম এখন রোহিঙ্গাশূন্য। হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সীমান্তে অপেক্ষা করছে। এ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের পরও চীন-রাশিয়া মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নেয় কী করে!

তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বেশ সোচ্চার হয়ে উঠেছে। ইতিমধ্যেই ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল গণহত্যার দায়ে সংশ্লিষ্টদের বিচার দাবি করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মিয়ানমারের ওপর কঠোর অবরোধ ও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছে। বিষয়টি বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর বিবেচনায় নেওয়া উচিত। মিয়ানমারের ওপর ব্যাপকভাবে চাপ সৃষ্টি করতে না পারলে তারা একজন রোহিঙ্গাকেও সে দেশে রাখবে না। কারণ তারা রোহিঙ্গাদের অস্তিত্বই স্বীকার করে না। সেনাপ্রধানের বক্তব্যে তা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

বিশ্ব মোড়ল যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারে গণহত্যার নিন্দা জানালেও জোরালো অবস্থান এখনো নেয়নি। আমরা জানি, যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে বহু ধর্ম, বর্ণ ও মতের দেশ; অভিবাসীদের নিরাপদ আবাসস্থল। সেই দেশটি নিশ্চয়ই বিশ্বের সব জাতি-গোষ্ঠীর মানবাধিকার নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখবে। পাশে দাঁড়াবে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের আরো জোরালো ভূমিকা আশা করি।

আরেকটি বিষয় এখানে না বললেই নয়। এ মুহূর্তে বিশ্বে সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয় ঘটছে মিয়ানমারের রাখাইনে। বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা মানবতার পক্ষে থাকবে, নাকি বিপক্ষে? রোহিঙ্গা ইস্যুতেই সেটি পরিষ্কার হয়ে যাবে।

লেখক::মোস্তফা কামাল-কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

শেয়ার করুন