নারী নির্যাতন ও খুন-ধর্ষণের শেষ কোথায়

গুম-খুন-ধর্ষণের বিভিন্ন ঘটনায় দেশের মানুষ বেশ উদ্বিগ্ন। কয়েক দিন আগে সিরাজগঞ্জের তাড়াশের মেয়ে রুপা খাতুন বগুড়ায় স্কুলশিক্ষকের নিবন্ধন পরীক্ষা দিয়ে বাসে ময়মনসিংহে তার কর্মক্ষেত্রে ফিরছিল। টাঙ্গাইলে তার সঙ্গীটি নেমে গেলে মধুপুর গড় অঞ্চলে বাসের কর্মী কয়েকজনের হাতে মেয়েটি ধর্ষিত হয়। কাছে থাকা পাঁচ হাজার টাকা ও হাতের মোবাইলটির বিনিময়েও সে নরপশুদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। একপর্যায়ে সে চিৎকার দিলে নির্যাতনকারীরা তার ঘাড় মটকে রাস্তার পাশে জঙ্গলে ফেলে দেয়। এর কিছুদিন আগে বরগুনার বেতাগীতে এক শিক্ষিকাকে বিদ্যালয়ে ঢুকে কতিপয় দুর্বৃত্ত শ্লীলতাহানি করে। গত দুই বছরে মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, বরিশালসহ বিভিন্ন জায়গায় চলন্ত বাসে নারী ধর্ষণের বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটে। দেখা যাচ্ছে, নারীদের সম্ভ্রমহানি এখন একশ্রেণির দুর্বৃত্তের বেশ পছন্দের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বছরখানেক আগে ভারতের দিল্লিতে নির্ভয়া নামের এক ফিজিওথেরাপির ছাত্রীকে এভাবে বাসে বাসকর্মীরা শ্লীলতাহানি করে। যার ফলে সে দেশে বড় ধরনের আন্দোলনের সৃষ্টি হয়। শেষ পর্যন্ত পুলিশি তত্পরতা ও দ্রুত বিচারের ফলে নির্যাতিতার পরিবার ও দেশবাসী খানিকটা স্বস্তি পায়।

১৯৯০-এর দশকে এ রকম একটি ঘটনা দিনাজপুরের ইয়াসমিনকে নিয়ে ঘটেছিল। যতটুকু মনে পড়ে, অভিযুক্তরা সবাই ছিল মহাসড়কের পুলিশ। তারা মেয়েটিকে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে গাড়িতে তোলে এবং ধর্ষণের পর মেরে ফেলে। এর বিচার বিলম্বিত হলেও শেষ পর্যন্ত অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড হয় এবং তা কার্যকরও হয়। সম্প্রতি বগুড়ায় তুফানের ধর্ষণের ঘটনাটিরও বড় ধরনের শাস্তি হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। তবু ধর্ষণের ঘটনা চলছেই। সেটাই দুশ্চিন্তার কারণ।

রুপা খাতুনের ঘটনাটি ধর্ষণ ও খুন উভয় অপরাধের সমাহার। খুন-ধর্ষণ ছাড়াও যৌতুকের জন্য নির্যাতন, তালাক প্রদান, আত্মহত্যার প্ররোচনা ও খুনের ঘটনাও কম শোনা যায় না। নারী নির্যাতন, বিশেষ করে ধর্ষণ-নির্যাতনের ব্যাপারে অনেক কারণের মধ্যে আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজও কম দায়ী নয়। পুরুষদের ক্ষমতা, স্বাধীনতা ও প্রাধান্য এ সমাজে অনেক বেশি। অন্যদিকে নারীর অধীনতা ও ক্ষমতাহীনতা তাকে সমাজে যুগ যুগ ধরে দুর্বল তথা অবলা এবং পুরুষাধীন অবহেলার পাত্র করে রেখেছে। নারী দুর্বল ও ভোগের বস্তু বলে সমাজের একশ্রেণির মূল্যবোধহীন মানুষের মনে কুপ্রবৃত্তি জেগে ওঠে। তারই ফলে আমাদের সমাজে নারী নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়। তারই চরম নিষ্ঠুর ও বর্বর রূপ হলো ধর্ষণ ও খুন। তার বৃদ্ধি যেমন জনজীবনে অনিরাপত্তা ও ভীতির সঞ্চার করে, তেমনি গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের জন্যও এসব বড় ধরনের হুমকি।

আইনের শাসন গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ। নারীবিরোধী বিশ্বাস ও মূল্যবোধ পুরনো সামন্ততান্ত্রিক সংস্কৃতির ফসল। বর্তমানে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের জন্য আমাদের যে সংগ্রাম চলছে, তা আধুনিকায়নের সংগ্রামও বটে। গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের স্বার্থে খুন-ধর্ষণের বিরুদ্ধে আইনি ও পুলিশি তত্পরতা আরো জোরদার করতে হবে। দুর্বৃত্তদের মনে ভীতির সঞ্চার করতে হবে এবং দেশব্যাপী এ বার্তা পাঠাতে হবে যে এ ধরনের নিষ্ঠুরতা করে কেউ পার পাবে না। বরং যাবজ্জীবন বা মৃত্যুদণ্ডের শিকার হতে হবে। সরকারি এ ধরনের উদ্যোগের সঙ্গে সামাজিক  আন্দোলন ও প্রতিরোধও গড়ে তুলতে হবে। সমাজের শিক্ষিত সচেতন মানুষকেও এ ব্যাপারে সোচ্চার হতে হবে। দুঃখজনকভাবে লক্ষণীয় যে রুপা খাতুনের ব্যাপারে আমাদের রাজনৈতিক নেতারা, সুধীসমাজ এবং সর্বোপরি নারী আন্দোলনের নেতা-নেত্রীদের তেমন কোনো প্রতিবাদ ও আন্দোলনে মুখর হতে দেখা গেল না। বিশেষ করে নারীসমাজকে এ ব্যাপারে অধিকতর সক্রিয় হতে হবে।

দেশে নারীশিক্ষার হার বাড়ছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কর্মজীবী মহিলার সংখ্যা। এখন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের স্বার্থে নারীকে বাইরের কর্মজগতে পুরুষের সঙ্গে সমানভাবে ভূমিকা পালন করতে হবে। তাই নারীদের অবাধ ও স্বাধীন চলাফেরা উন্নয়নের স্বার্থেই দরকার।

প্রসঙ্গক্রমে এটাও বলা দরকার যে দেশে গুম-খুনের হারও বেড়ে গেছে। গুম করে মুক্তিপণ চাওয়ার ঘটনা প্রায়ই গণমাধ্যমে দেখা যায়। এটা অবশ্যই দুঃখজনক ও আতঙ্কের ব্যাপার। তার চেয়েও দুঃখজনক হচ্ছে যে মুক্তিপণ না দিলে তো বটেই, দেওয়ার পরও গুমকৃত ব্যক্তিটিকে জীবিত পাওয়া যায় না। আবার সরকারের গোয়েন্দা বাহিনী পরিচয়েও কিছু অপহরণ তথা গুমের ঘটনা ঘটছে, যা মানুষের মনে আতঙ্কের সৃষ্টি করে। এর সম্মিলিত ফলাফল হচ্ছে অনিরাপত্তা ও শঙ্কা। অর্থবহ গণতন্ত্র ও টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে দেশ গুম-খুন-ধর্ষণের অভিশাপমুক্ত হোক— এটা মানুষের কামনা।

লেখক : মো. মইনুল ইসলাম,  অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

-কালের কন্ঠ

শেয়ার করুন