বন্যা নিয়ন্ত্রণে মহাপরিকল্পনা জরুরি

দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের প্রধানমন্ত্রী চ্যাম্পিয়ান অব দি আর্থ পুরস্কার পেয়েছেন। সুতরাং বন্যার্ত মানুষের দুঃখ-কষ্ট ও দুর্যোগ মোকাবিলায় টেকসই সিদ্ধান্ত নেবেন, এটা প্রত্যাশা
প্রতি বছর আমাদের দেশে বর্ষাকাল এলেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বন্যা দেখা দেয়। এমন হয়েছে যে, দেশে বৃষ্টিপাত হোক আর না হোক, বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশে বন্যা অপরিহার্য। কেননা ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ প্রাকৃতিকভাবে বন্যাপ্রবণ দেশ।
এবার অতিবৃষ্টির কারণে বন্যা হওয়ার চেয়ে ভারতের উজানের পানিই এ বন্যার জন্য দায়ী বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। আর তাই অনেকে বাংলাদেশের বিদ্যমান বন্যাকে মানবসৃষ্ট বলে অভিহিত করছেন। এ উজানের পানির ফলে উত্তরাঞ্চলসহ অনেক স্থানে এর প্রভাব লক্ষ করা গেছে। পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টি আর ভারতের উজানের পানির প্রভাব এতই বেশি যে, প্রতিদিনই নিত্যনতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে আর পানিবন্দি হচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। এসব মানুষ তাদের বসতবাড়ি আর সম্পদ হারিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে বাঁধের ওপর উঁচু স্থানে কিংবা খোলা আকাশের নিচে কোনো সড়কের পাশে। সবকিছু হারিয়ে এসব বানভাসি মানুষ এখন অসহায় হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
গেল এক সপ্তাহে পানির প্রভাব বাড়ছে আর একেকটি করে বাঁধ ভাঙছে। এবারের তিস্তায় রেড অ্যালার্ট জারি ও বন্যার ভয়াবহতা দেখে কেউ কেউ ১৯৮৮ সালের চেয়ে ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা করেছেন। আর এর কারণ দুইটিÑ প্রথমত, ১৯৮৭, ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালে যে ধরনের বায়ু কিংবা মৌসুমি বায়ু ও গতিপ্রকৃতি দেখা গিয়েছিল, এ বছর সে একই ধরনের মৌসুমি বায়ু পরিলক্ষিত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ১৯৮৮ সালের বন্যার সময় কুড়িগ্রাম ও রংপুর সড়কে পানি দেখা যায়নি; কিন্তু এ বছর এসব সড়ক পানিতে ডুবে গিয়ে খালে পরিণত হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, এবারের বন্যার ভয়াবহতা কেমন। আর এ বন্যার ভয়াবহতায় দুর্যোগ মন্ত্রণালয় যে হিসাব দিয়েছে, তাতে ২৬টি জেলার ৯৬টি উপজেলা প্লাবিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৩২ লাখ মানুষ। এ পরিসংখ্যান অনুসারে, প্রায় ৭ লাখ ৫২ হাজার ৩৪৯টি পরিবার, ১ লাখ ৬০ হাজার ৫৪৫টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত এবং ৪ লাখ হেক্টর কৃষি জমি নষ্ট হয়েছে বলে কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়। এদিকে ৮ লাখ গরু, ৫৩ হাজার মহিষ, ২ লাখ ৩৭ হাজার ছাগল, ১ লাখ ৯ হাজার ভেড়া, ২৪ লাখ মুরগি ও ৬ লাখ হাঁস মারা যায় বলে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মাধ্যমে জানা গেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জানা যায়, ২ হাজার ৫০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে, ৪৭টি ব্রিজ, কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে পানিবন্দি হওয়া মানুষের এ পরিসংখ্যান আরও ২৫ লাখ বেশি হবে। কেননা যারা একেবারে ঘরবাড়ি হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন, শুধু তাদের এ পরিসংখ্যানের আওতায় আনা হয়েছে। এছাড়া শরীয়তপুর, মাদারীপুর, হবিগঞ্জ, সিলেট, সুনামগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী প্রভৃতি অঞ্চলের মানুষের দুর্দশার কথা এ পরিসংখ্যানে আনা হয়নি। এসব মানুষের দুর্দশার চিত্র যখন মানবসমাজে ভেসে আসছে, তখন সবাই ত্রাণের জন্য চিৎকার করে নিজেকে মানবতাবাদী হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে। ত্রাণই এ অঞ্চলের একমাত্র সমাধান নয়। এসব অঞ্চলের লোকদের ভাগ্যোন্নয়নে ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে রূপকল্প ঘোষণা করা জরুরি। আমরা আরেকটি বিষয় লক্ষ করছি, আর সেটি হলো, ত্রাণ বলতে যা বোঝায় ওই শুকনো খাবারের প্রয়োজন সর্বত্র নেই। ভুক্তভোগী কেউ বলছেন, আর কত দিন এসব শুকনো খবার খেয়ে থাকতে হবে? কেউ বলছেন, ত্রাণ নয়, চাই বিশুদ্ধ পানি। কেউ বলছেন, পানি থেকে নিজেকে আর তার সম্পদ গবাদিপশুকে বাঁচাতে উঁচু জায়গা প্রয়োজন। আবার কেউ বলছেন, আমাদের স্যানিটেশনের প্রয়োজন। সুতরাং সবারই ত্রাণের প্রয়োজন আছে এমনটাও নয়, তবে বেশিরভাগ মানুষেরই ত্রাণের প্রয়োজন। কিন্তু যে পরিমাণ ত্রাণের প্রয়োজন, সে পরিমাণ এখনও সরকার নিশ্চিত করতে পারেনি। সরকারি হিসাবে ৩৩ লাখ আর বেসরকারি হিসেবে ৫০ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করলেও নেই সরকারি পর্যাপ্ত ত্রাণের ব্যবস্থা। সরকারের পক্ষ থেকে কিছু ত্রাণের ব্যবস্থা করলেও বেসরকারি এনজিও সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে এখনও কোনো ত্রাণের তৎপরতা পরিলক্ষিত হয়নি। মানবতার ডাকে সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসা মানুষের দেয়া ত্রাণ আর সরকারি বরাদ্দকৃত ত্রাণ দিয়ে কিছু হচ্ছে না এসব অঞ্চলের লোকদের। কেননা একটি গ্রামে বন্যার্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার এবং তারা পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন পাঁচ দিন; কিন্তু ত্রাণের সাহায্য এসেছে মাত্র ১০০ কেজি চাল! এ ধরনের ত্রাণ সত্যিই অপ্রতুল। আবার সরকারের পক্ষ থেকে যে পরিমাণ ত্রাণ কিংবা আর্থিক সাহায্য আসছে, তা যথাযথভাবে প্রদান করা হচ্ছে কিনা, তা-ও খতিয়ে দেখা দরকার। অন্যদিকে সুপেয় পানিরও রয়েছে ব্যাপক সংকট। ১ হাজার ৫৯৯টি আশ্রয় কেন্দ্রের জন্য পানি বিশুদ্ধকরণ প্লান্ট রয়েছে মাত্র ৭টি; আর যারা আশ্রয় কেন্দ্রে স্থান পাননি, তাদের অবস্থা বর্ণনা না-ই করলাম। তাদের এ অবস্থা দেখে মনে প্রশ্ন জাগেÑ উত্তরবঙ্গসহ এসব অঞ্চলের মানুষ শুধুই কি কষ্ট আর যন্ত্রণা সহ্য করবে? আমরাও কি শুধু ত্রাণের মাধ্যমে করা সাহায্য আর সহানুভূতি দিয়ে তাদের বাঁচিয়ে রাখব? তারা কি রাষ্ট্রের করুণা নিয়ে বেঁচে থাকবে? তারা কি প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে পত্রিকা আর ইলেকট্রনিক মিডিয়ার শিরোনাম হবে? তাদের হাহাকার, তাদের জন্য স্থায়ী কোনো সমাধান কি কখনও হবে না? এসব মানুষের জন্য আমাদের কি কোনোই দায়বদ্ধতা নেই?
উত্তরাঞ্চলের মানুষের এ দুর্দশা হওয়ার পরও সরকারের উচ্চপদস্থ কোনো কোনো ব্যক্তি এবং কিছু মন্ত্রী বলে বসলেনÑ দেশে ওই ধরনের কোনো বন্যা নেই। ঢাকায় বসে এ ধরনের মন্তব্য করাটা একেবারেই স্বাভাবিক। তারা ঢাকার বন্যাকে যেমন জলাবদ্ধতা ভাবেন, ঠিক তেমনি উত্তরাঞ্চলের বন্যাকে একইভাবে ধারণা করেন। বিএনপি-জামায়াতের লাগাতার হরতাল চলাকালে কেউ কেউ সরকারকে ঢাকার সরকার বলে অভিহিত করেছিল। কেননা সারা দেশে হরতাল কিংবা অবরোধের কারণে যানবাহন না চললেও ঢাকায় ব্যাপক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েনের মাধ্যমে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সচেষ্ট হয়েছিল; ঠিক একইভাবে মন্ত্রী কিংবা আমলাদের এ ধরনের মনোভাব সরকারকে পশ্চিমাঞ্চলের সরকার বললে অত্যুক্তি হবে না বোধ করি। আবার লক্ষ করুন, দুুই-তিনবার সরকার পরিবর্তন হলেও উত্তরাঞ্চলের বন্যা নিয়ন্ত্রণে কেউ কার্যত কোনো পদক্ষেপ নেয়নিÑ যদিও উন্নয়নের বুলি শোনানো হয়েছে বহুবার। রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট আর কয়েকটা ফ্লাইওভার নির্মাণের মাধ্যমে উন্নয়ন করে নগর অঞ্চলের মানুষের কিছুটা সুবিধা হলেও উত্তরাঞ্চলের মানুষের খুব বেশি উন্নয়ন হয়েছে বলে কেউ বলতে পারবে না।
প্রশ্ন হলোÑ এত উন্নয়ন হলে কেন মানুষের এত হাহাকার? কেন উন্নয়ন সত্ত্বেও দেশ ভাসছে পানিতে? কেন দেশ ডুবছে পানিতে, আর মানুষের লাশ ভাসছে পানিতে? কেন মৃত মানুষগুলোকে কবর দেয়ার জায়গা নেই? কেন প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে নদী শাসন ব্যবস্থার মনোভাবের উন্নয়ন করাতে পারেনি? এসব অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য নিয়ে সাপলুডু খেলা কেন? কেন প্রতিবেশী দেশ বন্ধুরাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও কূটনৈতিকভাবে তিস্তার পানি চুক্তি এখনও সম্পন্ন করা গেল না? কেন এসব মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা? আর কত মানুষের লাশ বন্যার পানিতে ভেসে গেলে ভারত আমাদের ন্যায্য হিস্যা অনুযায়ী পানি দেবে?
দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের প্রধানমন্ত্রী চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ পুরস্কার পেয়েছেন। সুতরাং বন্যার্ত মানুষের দুঃখ-কষ্ট ও দুর্যোগ মোকাবিলায় টেকসই সিদ্ধান্ত নেবেন, এটা প্রত্যাশা। তার আশপাশে যারা আছেন, তারা একটু দয়া করে তাকে অবহিত করুন, বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হওয়া সত্ত্বেও নদীগুলোর দূষণ রোধ কিংবা ভরাট রোধে কোনো তৎপরতা নেই। আর এসব কর্মকা-ে যারা উদাসীনতা দেখিয়ে যাচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধেও নেই কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা। আইনানুগ কোনো ব্যবস্থা না নিলে নদী, খাল ভরাট চলতে থাকবে। আর এ ধরনের বন্যা প্রতি বছর আরও সীমাহীন দুর্ভোগের সৃষ্টি করবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের এসব বন্যার স্থায়ী কোনো সমাধান না হলে বাংলাদেশ উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। সর্বোপরি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে এরা প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে। আবার বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হলে অবশ্যই এসব এলাকার বীজ, ক্ষেত-খামার ও ফসলি জমি প্রভৃতি রক্ষা করতে হবে। ত্রাণনির্ভর করুণা নয়, বরং এসব অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে রূপকল্প ঘোষণা চাই। অন্যথায় এসব অঞ্চলের মানুষের দুঃখ-কষ্ট কখনোই লাঘব হবে না। আর সত্যি যদি এসব অঞ্চলের মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করতে হয়, তবে বন্যা নিয়ন্ত্রণে টেকসই রূপকল্প এখনই হাতে নিতে হবে। সাময়িকভাবে এসব ভুক্তভোগীর জন্য আলাদা ও পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখতে হবে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ কিংবা সমাধানে আরও বেশি গবেষণা ও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। বন্যা নিয়ন্ত্রণে এবং এ ধরনের ক্ষতি এড়াতে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। হ

শরীফুর রহমান আদিল
শিক্ষক, দর্শন বিভাগ
ফেনী সাউথইস্ট ডিগ্রি কলেজ
গবেষক, রিসার্চ বাংলাদেশ ৭১

শেয়ার করুন