জি-২০, মুক্তবাজার ও ট্রাম্পের পরিণতি কী হতে পারে

জার্মানির হামবুর্গে উন্নত ও শিল্পসমৃদ্ধ দেশগুলোর নেতাদের সদ্য সমাপ্ত জি-২০ শীর্ষ সম্মেলন নিয়ে এত দিন যে আশঙ্কা করা হয়েছিল, ঠিক তা-ই ঘটেছে। মুক্তবাজার বা বিশ্ববাণিজ্য, আন্তর্জাতিক অভিবাসন ও নিরাপত্তা এবং মানুষের অভিন্ন স্বার্থসহ পরিবেশ সংরক্ষণের প্রশ্নে অনৈক্য ও দ্বিধাবিভক্তি। উল্লিখিত প্রায় সব বিষয়েই যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিমত পোষণ করেছেন। জি-২০ সম্মেলন শেষে প্রকাশিত যৌথ ঘোষণার ব্যাপারে নেতারা দৃশ্যত একটি ঐকমত্যে পৌঁছলেও বিভিন্ন বিষয়বস্তুর দিক থেকে তাঁরা কোনো অভিন্ন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেননি। মুক্তবিশ্বের নেতৃত্বদানকারী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যেন নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন তাঁদের চিরাচরিত ভূমিকা থেকে। অর্থাৎ মুক্তবাণিজ্যসহ উত্থাপিত প্রায় সব ইস্যুতেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক বিচ্ছিন্নতা ও সংরক্ষণবাদিতার আশ্রয় নিয়েছেন। এমনটা এর আগে কখনো ঘটতে দেখা যায়নি। এমনকি বিশ্বমানবতার অভিন্ন স্বার্থের প্রশ্নে সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পরিচিত গণচীন ও রাশিয়াকেও অতীতে দ্বিমত পোষণ করতে তেমনটা দেখা যায়নি। ট্রাম্পের নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই একটি ভিন্ন পরিস্থিতির উদ্ভব হতে দেখা গেছে। ট্রাম্পের তথাকথিত জাতীয়তাবাদী ঘোষণা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ অনুযায়ী তাঁর কাছে সবার ওপরে আমেরিকার স্বার্থ। সুতরাং ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই বিরাজমান বিশ্বব্যবস্থায় ভাঙন দেখা দিতে শুরু করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে ব্যবস্থায় পৌঁছতে শিল্পসমৃদ্ধ দেশগুলোর নেতাদের অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়েছে বছরের পর বছর, ট্রাম্প শুরুতেই ঝাঁকি দিয়ে তা নড়বড়ে করে দিয়েছেন বলে অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা। তাতে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন রাজনৈতিক, কূটনেতিক কিংবা অর্থনৈতিক প্রচেষ্টার যে অবসান ঘটেছে তা এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর অনুসৃত পথে যুক্তরাষ্ট্রসহ বর্তমান সংঘাতপূর্ণ বিশ্বকে কোথায় নিয়ে যেতে চান, তা তিনি নিজেও ওয়াকিবহাল নন বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। বহুপক্ষীয় বাণিজ্য, মুক্তবাজার ও পরিবেশ সংরক্ষণসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বিশ্বের শিল্পসমৃদ্ধ ১৯টি দেশ একদিকে এবং অন্যদিকে ট্রাম্প একাই ভিন্ন পথে হাঁটতে গিয়ে যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করেছেন তাতে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র কতটুকু লাভবান হবে, তা সে দেশের নেতৃস্থানীয় বুদ্ধিজীবীরাও নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না। তাতে পশ্চিমা বিশেষজ্ঞদের কারো কারো মতে, যুক্তরাষ্ট্র এক বিরাট অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সম্মুখীন হতে পারে। যদি তা-ই হয়, তবে তা হবে উন্নয়নশীলসহ বিশ্বের বিভিন্ন সমৃদ্ধ দেশের জন্য বিপর্যয়কর।

ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই প্রস্তাবিত ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ চুক্তি (টিপিপি) থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তা ছাড়া নর্থ আটলান্টিক ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (নাফটা) ভুক্ত দেশ মেক্সিকো ও কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নতুনভাবে দর-কষাকষির ইঙ্গিত দিয়েছেন। এবং যুক্তরাষ্ট্রে ইস্পাত আমদানির ব্যাপারে অধিক করারোপের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর ধারণা, বিশ্ববাণিজ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিসীম ঘাটতি রয়েছে। চীনসহ বহু দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একতরফা বাণিজ্য করে ধনী হয়ে গেছে; অথচ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের কলকারখানা। আর শ্রমিকরা হারাচ্ছে তাদের কর্মসংস্থান। যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যসামগ্রী তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে পারছে না। সে বিবেচনায় তিনি যুক্তিগ্রাহ্য ও প্রথাগত ব্যবস্থা না নিয়ে মুক্তবাণিজ্যের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে চাচ্ছেন। মুক্তবাজারে বিশ্বাসী যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি পুঁজিবাদী দেশে তিনি সংরক্ষণবাদিতার আশ্রয় নিতে যাচ্ছেন। তাঁর ধারণা, বিশ্বের বিভিন্ন শিল্পসমৃদ্ধ দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয়ভাবে নতুন করে বাণিজ্য চুক্তি করলে যুক্তরাষ্ট্র লাভবান হবে অনেক বেশি। তা ছাড়া জি-২০-এর ধনী দেশগুলোকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য অনেকটা বাধ্য করতে চাচ্ছেন। তাতে উত্পাদন খরচ অনেক বেড়ে যাওয়ার ভয়ে শিল্পোদ্যোক্তারা পিছিয়ে থাকতে চান।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ‘ফ্রি ট্রেড’-এর পরিবর্তে ‘ফেয়ার ট্রেড’-এর পক্ষপাতী। এ জন্য তিনি চীন, জার্মানি, জাপানসহ অন্যদের বিরুদ্ধে এক অঘোষিত বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করেছেন, যা বিশ্ববাজারকে নতুন করে অস্থির করে তুলেছে। বিশ্বের শিল্পসমৃদ্ধ দেশগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র এক বিরাট বাজার হলেও তারা এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো অনির্ভরযোগ্য ব্যক্তির খপ্পরে পড়তে চায় না। তাই তারা আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিশাল অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগের চিন্তাভাবনা শুরু করেছে। জি-২০-এর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া বাকি ১৯টি দেশই মুক্তবাজার ও অবাধ বাণিজ্যের পক্ষে। এর নেতৃত্বে রয়েছেন জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল। তিনি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সংরক্ষণবাদিতার বিরুদ্ধে। চীন, রাশিয়া, জাপানও মুক্তবাজারের পক্ষে। তাতে বিশ্বের ঘন জনবসতিসম্পন্ন উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণ সম্ভব। তাতে অস্থির বিশ্বে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখাও অনেকটা সম্ভব। গণচীনসহ আজকের অনেক সচ্ছল দেশই তার উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সন্দিহান হয়ে জাপান সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একটি বিশাল অঙ্কের মুক্তবাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। তা ছাড়া ট্রাম্প যখন পরিবেশ সংরক্ষণ সংক্রান্ত প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন তখন বিশ্বব্যাপী অন্য স্বাক্ষরকারীরা বলেছে যে সে চুক্তি কোনোমতেই আর পরিবর্তন করা যাবে না। প্যারিস চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী বাকি সব দেশই বিশ্বকে অবধারিত বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচানোর লক্ষ্যে পরিবেশ ও ভূ-প্রকৃতি উন্নয়নে তাদের অঙ্গীকার রক্ষা করতে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। অথচ ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, পরিবেশসংক্রান্ত প্যারিস চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থবিরোধী। কারণ তিনি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বেকার খনি শ্রমিকদের কাজে পুনর্বহাল করার জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়া কয়লাখনিগুলো আবার চালু করতে চান। অথচ তিনি ভুলে যাচ্ছেন যে পৃথিবী এখন জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের পরিবর্তে সবুজ জ্বালানি উত্পাদনের জন্য উত্তরোত্তর সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রক্ষমতা লাভকারী গোঁয়ার স্বভাবের মাথামোটা বর্তমান প্রেসিডেন্টটি পশ্চিমা জগতে শ্বেতাঙ্গদের আধিপত্য বজায় এবং সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে এক নম্বরে রাখার জন্য নতুন এক বর্ণবাদী ও সাম্প্রদায়িক কৌশল হাতে নিয়েছেন বলে যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমে অভিযোগ উঠেছে। ট্রাম্প অশ্বেতাঙ্গ, বিশেষ করে মুসলিমপ্রধান দেশগুলো, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মানুষকে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে অভিবাসন দেওয়া দূরের কথা, তাদের প্রবেশ করতে দিতেও রাজি নন। তাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন পর্যন্ত সিরিয়াসহ যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের উদ্বাস্তুদের যুক্তরাষ্ট্রে গ্রহণ করার ব্যাপারে কিছুই স্পষ্ট করে বলছেন না। অন্যদিকে সিরিয়ার যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষকে অধিক সংখ্যায় জার্মানিতে আশ্রয় দেওয়ার কারণে চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলের বিরূপ সমালোচনা করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের মতে, পশ্চিমা জগৎ ক্রমে ক্রমে তার সভ্যতা ও সামাজিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলছে। সম্প্রতি তিনি বিশ্বের ছয়টি মুসলমানপ্রধান দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ব্যাপারে বিধি-নিষেধ আরোপ করেছিলেন, যা সে দেশের উচ্চ আদালত সাময়িকভাবে আটকে দেন। অথচ সেই ট্রাম্পই অর্থনৈতিকভাবে তাঁর অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে সর্বপ্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে যান সৌদি আরবে। এসব অভিজ্ঞতার আলোকে জার্মানির হামবুর্গে সমবেত হয়েছিলেন জি-২০ নামক শিল্পসমৃদ্ধ দেশগুলোর নেতারা, যেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়ে ইভানকা কুশনারও কূটনৈতিক সব রীতি-নীতি বিসর্জন দিয়ে কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে তাঁর বাবার প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তাতে সম্মেলনের উদ্যোক্তা চ্যান্সেলর মার্কেল ও বেশ কিছু রাষ্ট্রপ্রধান অসন্তুষ্ট হলেও শিষ্টাচার রক্ষার খাতিরে তাঁরা নীরব ছিলেন। হামবুর্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের গতিবিধি ও কার্যকলাপ দেখে মনে হয়েছে, তিনি যেন ইউরোপে এসেছেন একটি মাত্র লক্ষ্য নিয়ে, আর তা হচ্ছে ‘রুশ সম্রাট’ ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য।

হামবুর্গে অনুষ্ঠিত মূল সম্মেলনের একটি প্রান্তিক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিশেষ বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন রাশিয়ার ক্ষমতাশালী প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে। স্বল্পকালীন সময়ের জন্য নির্ধারিত সে বৈঠক স্থায়ী হয়েছিল এক ঘণ্টা ১৬ মিনিট, যার দিকে বিশেষ নজর ছিল বিশ্বের সব নেতা, উৎসাহী মানুষ ও গণমাধ্যমের। সে বৈঠকে ট্রাম্পের এক প্রশ্নের উত্তরে পুতিন ২০১৬ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের নির্বাচনী দপ্তরে রাশিয়ার সাইবার আক্রমণ ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচারের অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেন। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃস্থানীয় গণমাধ্যম ও ওয়াকিবহাল মানুষ তা বিশ্বাস করেনি। তারা মনে করে, এটি সম্পূর্ণভাবে একটি সাজানো ঘটনা, যা পূর্বপরিকল্পিত। ট্রাম্প পুতিনের প্রদত্ত জবাবকে দৃশ্যত মেনে নিয়েছেন। তা ছাড়া জি-২০ সম্মেলন শেষ হওয়ার পরপরই ট্রাম্পপুত্র জুনিয়র ট্রাম্পের বিরুদ্ধে রাশিয়ার এক প্রভাবশালী আইনজীবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও তাঁর কাছ থেকে হিলারি ক্লিনটন সম্পর্কে অনেক তথ্য লাভের অভিযোগ তুলে ধরেছে নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকা। ক্রেমলিন এ ঘটনা সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে অবহিত ছিল বলে প্রভাবশালী পত্রিকাটি উল্লেখ করেছে। সে কারণে হামবুর্গে ট্রাম্প ও পুতিনের একযোগে সাইবার আক্রমণ ও দস্যুপনার বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে কাজ করার ঘোষণাকে কেউই তেমনভাবে কোনো গুরুত্ব দেয়নি। সম্পূর্ণ বিষয়টি একটি পূর্বপরিকল্পিত সাজানো ঘটনা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরাকের উত্তর-পশ্চিম সীমায় অবস্থিত ইসলামিক স্টেটের (আইএস) শক্তিশালী ঘাঁটি মসুলে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা, সিরিয়ার রাকা নগরী পুনরুদ্ধারের ব্যাপারে যৌথ প্রচেষ্টা এবং সর্বোপরি যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও জর্দানের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর সমঝোতারই বহিঃপ্রকাশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনা হামবুর্গে বসেই ঘটেনি। এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন ও রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ গত এক মাস কাজ করেছেন। তা ছাড়া রাশিয়ার পূর্ব ইউক্রেন আক্রমণ ও ক্রিমিয়া দখল এবং রাশিয়ার ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জারি করা অর্থনৈতিক অবরোধ কিভাবে প্রত্যাহার করা হবে তা নিয়েও আগেই বিস্তারিতভাবে আলোচনা করে তাঁরা একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন। পরে ট্রাম্প বলেছেন, ইউক্রেন সমস্যা সমাধানের আগে রাশিয়ার বিরুদ্ধে জারি করা অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহার করা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে কারো না বোঝার কিছু নেই। সিরিয়া সীমান্তে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র তার সহযোগী পশ্চিমা শক্তি ব্রিটেন কিংবা ফ্রান্সের সঙ্গে তেমন কোনো পরামর্শ করেছে বলে জানা যায়নি।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কিংবা সরকারি উচ্চপর্যায়ের দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ হলেও ট্রাম্প নিজেকে অত্যন্ত বুদ্ধিমান বলে মনে করেন। তবে অতি চালাক এ লোকটি যে ভালোভাবেই ‘রুশ সম্রাট’ পুতিনের খপ্পরে পড়েছেন, তা অনুমান করা যায়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করেন, রাশিয়া, চীন ও সৌদি আরবের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক থাকলে সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে তাঁর বিশেষ অসুবিধা হবে না। উত্তর কোরিয়ার দূরপাল্লার আন্তর্মহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা ও হুমকি তিনি হয়তো শেষ পর্যন্ত কাটিয়ে উঠতে পারবেন। ট্রাম্প মনে করেন, ইউরোপ নিজ স্বার্থেই তাঁর কাছে আসতে বাধ্য হবে। তবে ট্রাম্পের এখন একমাত্র দুশ্চিন্তা হচ্ছে গণমাধ্যমের সঙ্গে তাঁর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বিরোধ নিয়ে। এ বিরোধ এভাবে চলতে থাকলে এবং ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জালিয়াতির অভিযোগ একে একে প্রকাশ পেতে থাকলে অতীতে ঘটে যাওয়া ‘ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি’র মতো একটি সাংবিধানিক ও আইনি বিপর্যয়ে ট্রাম্পের কুপোকাত হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের একজন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা মাত্র ৪২ শতাংশ, যা সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এমন একজন অপরিণামদর্শী আত্মম্ভরিতাপূর্ণ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতায় থাকলে জি-২০ সম্মেলন কেন, বিশ্বব্যবস্থায় কী বিপর্যয় নেমে আসতে পারে এখন তা ক্রমে ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তাতে বিশ্বের তুলনায় বিচ্ছিন্নতা ও সংরক্ষণবাদিতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রই যেন ‘একঘরে’ হয়ে যাচ্ছে। তবু তিনি চান বিশ্বনেতৃত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রকে এক নম্বরে পৌঁছাতে। এ দুটি বিষয় যে পারস্পরিক স্বার্থের বিপজ্জনকভাবে সাংঘর্ষিক হতে পারে, তা ট্রাম্প এখনো উপলব্ধি করতে পারছেন না। সেটি দেখার জন্যই এখন ইউরোপ, চীন, জাপান, রাশিয়া ও অন্যরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

লেখক : গাজীউল হাসান খান-

সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক- বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস)

gaziulhkhan@gmail.com

শেয়ার করুন