কোম্পানীগঞ্জে বন্যার্তদের ত্রাণ ও পুর্নবাসন প্রয়োজন

সীমান্তবর্তী কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা একটি অবহেলিত, অনগ্রসর ও পশ্চাৎপদ অঞ্চল। সৃষ্টি লগ্ন থেকেই এই অঞ্চলের মানুষ বৈরী প্রাকৃতিক ও দুর্যোগের সাথে লড়াই করে বাচঁতে হচ্ছে। বাংলাদেশ ছয় ঋতুর দেশ। আষাঢ়, শ্রাবন দুই  মাস বর্ষা কাল, প্রতি বছর বর্ষাকাল যখন তাঁর স্বরূপে ফিরে এসে আগ্রাসী ভূমিকায় অবর্তীণ হয়ে ব্যাপক পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়। যদিও এ সমস্যার জন্য আমরাই বেশী দায়ী। কারণ এখানে আল্লাহতায়ালার অশেষ নিয়ামত প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদে ভরপুর হলেও সেগুলোকে আমরা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারিনি। অপরিকল্পিতভাবে নির্বিচারে গাছ পালা উজাড় করে বসত ভিটা ও ফসলী জমিতে বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলনের কারণে এ সমস্যার সৃষ্টি হয়। তাছাড়া নদীর উৎস মুখে বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন করায় নদীর গতিপথ ব্যাহত হয়ে নদীর দু’কুলে ভাঙ্গনের সৃষ্টি হয় এবং বন্যার করাল গ্রাসে বাড়ী ঘর ভেঙ্গে গিয়ে অনেক ক্ষয় ক্ষতি ও প্রাণহানীর ঘটনা ঘটে। মানবসৃষ্ট এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এরই মধ্যে কোম্পানীগঞ্জের মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে বেশ কয়েকটি গ্রাম। বিশেষ করে লড়ং, এলাকার ঐতিহ্যবাহী জমিদার মরিচ বাবুর বাড়ী, কালাইরাগ গ্রাম, নয়াবাজার, কালিমন্দির, কালাইরাগ মসজিদ, মুক্তিযোদ্ধা আদর্শ গ্রামসহ অসংখ্য গুরুত্ব¡পূর্ণ স্থাপনা। বর্তমানে এইসব বাড়ীঘর ও স্থাপনা গুলো শুধুই স্মৃতি। যদিও এ এলাকায় অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করে অনেকেই আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। তবে এর পরিমান খুবই কম। এখনও এ উপজেলার শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করেন। প্রতি বছর বন্যা আসে, আবার চলে যায়, নতুন করে এ অঞ্চলের মানুষ বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু কষ্ট তাদের কিছুতেই পিছু ছাড়ে না।
২০১৭ সালের জুন মাসের ১৭ তারিখে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মানুষের উপর বয়ে যায় দিয়ে বয়ে যায় এক বড় দুর্যোগ। এদিন ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ভয়াবহ প্রলয়ংকারী বন্যায় কোটি কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় ২নং পূর্ব ইসলামপুর ও রণিখাই ইউনিয়নে। সরেজমিনে দেখা গেছে, কালাইরাগ আদর্শগ্রাম, নাজিরগাঁও, সাতাল, চন্দ্র নগর, ভাটরাই, চাঁনপুরী বস্তি ঢালারপাড়, মোস্তফা নগরসহ প্রায় অর্ধশতগ্রাম লন্ডবন্ড হয়ে গেছে। দেখলে চেনার কোন উপায় নেই। ভেঙ্গে পড়েছে গ্রামীন রাস্তাঘাট, ভেসে গেছে গবাদি পশু, নষ্ট হয়েছে ফসলী খেত, কালাইরাগ গ্রামে চোখের সামনে ভেসে গেছে তরতাজা তিনটি প্রাণ। মানুষ সহায় সম্বলহীন হয়ে রাস্তার উপর বসবাস করছে, খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। অকাল বন্যায় ফসল হারানোর কারণে মানুষের ভাগ্যে নেমে এসেছে চরম অন্ধকার। কর্মহীন হয়েছে লাখো মানুষ। বর্তমানে এই জনপদে দুর্ভিক্ষ ন্যায় পরিস্থিতি বিরাজ করছে। রাস্তাঘাট নষ্ট হওয়ায় শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে  যেতে পারছে না। জনসাধারণের চলাচলের একমাত্র রাস্তা দয়ার বাজার থেকে কালাইরাগ পাকা রাস্তাটি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। পানির তীব্রতা এতো বেশি ছিল যে, দয়ারবাজার ও কালাইরাগের মধ্যে দিয়ে মূল নদী থেকে আলাদা হয়ে অন্য একটি শাখা নদী তৈরী হয়েছে। দয়ার বাজার থেকে কালাইরাগ পারাপাড়ের যাত্রীদের নৌকা ছাড়া বিকল্প কোন পথ নেই। তাছাড়া ঝুঁকিতে আছে কালাইরাগ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঈদগাহ, ফুটবল খেলার মাঠ, নয়া বাজার, কালীবাড়ী, ক্লাব ঘর, খেলার মাঠ ও দয়ার বাজার।  এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এই স্থাপগুলো নদী গর্ভে বিলিন হয়ে যেতে পারে। কিন্তু দুঃখজনক হলে সত্য যে, এতো বড় প্রাকৃতিক দূর্যোগ হওয়ার পরেও এই বানভাসি মানুষের সাহায্য ও সহযোগিতায় কেউ এগিয়ে আসেনি। ২০১৭সালের জুলাই মাসের ৮ তারিখে এলাকার কয়েকজন ব্যক্তি দানকৃত কিছু ত্রাণ বিতরণে স্থানীয় সাংসদ উপস্থিত থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় ছিল খুবই কম। যা সাধারণ মানুষের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অথচ খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা এগুলো হলো মানুষের মৌলিক অধিকার। একজন নাগরিক রাষ্ট্রের কাছে এই অধিকারগুলো পাওয়ার দাবী রাখে। তাছাড়া অসহায় দরিদ্র ও বন্যার্তদের বাদ দিয়ে একটি দেশের উন্নয়ন মোটেও সম্ভব নয়। তাই এই বন্যা কবলিতদের শুধু ত্রাণই নয়, তাদের পুর্নবাসন করতে হবে। কারণ একটি দেশে অসহায় ও ক্ষতিগ্রস্ত বৃহৎ একটি অংশকে বাদ দিয়ে আমরা নিজেদের একটি উন্নয়নশীল জাতি হিসেবে ভাবতে পারিনা।

লেখক: আবদুল হালিম

শেয়ার করুন