সুনাবানের স্বপ্ন

সুনাবানের চোখের তারায় কোনো স্বপ্ন ছিল না। শুধুই ভাসতো স্বামীর মরা মুখের ছবি। সঙ্গী ছিল বিলাপ ক্রন্দন! কান্না ছাড়া গতিই বা কী! স্বামী দিন মজুর হলেও শিশু সন্তানকে নিয়ে দিন খারাপ যায়নি। আর্থিক দৈন্যের ক্ষতের উপর ছিল ভালোবাসার শক্ত আস্তরণ। তাই কষ্ট হয়নি। আজ ভালোবাসার মানুষকে হারিয়ে সে এখন নিঃস্ব। কোলে শিশু পুত্র, চোখে অশ্রু, চারপাশে ঘরের আধা ভাঙা বেড়া আর মাথার উপর খড়ের ছাদ যা ছুঁয়ে বৃষ্টির পানি সব সময়ই চোখের জলের সাথে মিশে যায়। এ রকম ঘরের বাসিন্দাদের খাবার দাবারের অবস্থা না বললেও চলে। স্বামীর আগেই নিজের বাবা মা গত হয়েছেন। ভাই বোন নেই। তাই নিজের শরীর ও শিশু সন্তান ছাড়া তার আপন বলতে কেউ নেই। সুনাবানকে কেউ সাহায্য করতে চায় না। যারা চায় তাদের সাহায্য সে নেয় না। তার দোষ শরীরে ভরা যৌবন। বয়স কম। সবাই বলে নতুন একটা বিয়ে করলেই তাঁকে আর একা অভাবের ভার সামলাতে হবে না। নতুন করে সংসার সাজানোর কোনো ইচ্ছে নেই সুনাবানের। আবার অনেকেই আসে সাহায্য করতে যাদের মুখে আহা উহা বলে সহানুভূতির সুর থাকলেও চোখে থাকে লালসার আগুন। সুনাবান এদের সাহায্যও নিতে চায় না। তাই গ্রামের প্রতিবেশিদের ঘরে বুয়ার কাজ করেই দিনযাপন। স্বপ্ন, একদিন ছেলে বড় হবে। টাকা পয়সাও হবে। একাকিত্ব ও অভাব দুটোই তখন থাকবে না।

খুব বেশি দিন কাজ করতে হয়নি সুনাবানকে। সততা ও পরিশ্রমের জোরে তাঁকে এখন আর মানুষের ঘরে ঘরে যেতে হয় না। ছোট ছোট সঞ্চয় থেকে সে গড়ে তোলে হাঁসের খামার। হাঁসের ডিম বিক্রি করে মা ছেলের চলে যায়। এমনকি মাসে হাজার দুয়েক টাকাও সঞ্চয় হয়। কয়েক মাস পর যখন সঞ্চয়ের পরিমান হাজার পাঁচেক ছেড়ে যায় তখন সুনাবান চিন্তায় পড়ে! এত টাকা ঘরে রেখে সে বাইরে যাবে কীভাবে। যে কেউ চুরি করে নিয়ে যেতে পারে। ছেলেও এখন স্কুলে যায়। তাই দিনের বেলা ঘরটা ফাঁকা থাকে। ছেলে রমজান স্কুলে আর সুনাবান হাঁসের পেছনে পেছনে ঘরের বাইরে। তখন বুকটা আনচান করে। এত কষ্টের টাকা যদি কেউ নিয়ে যায়! রমজানের সাথে রাতে এ নিয়ে কথা বলে সুনাবান। হ্যাঁ, রমজান এখন দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে। এত টাকার খবর শোনেই রমজান বায়না ধরে তাঁকে সাইকেল কিনে দিতে হবে।

সুনাবানের খুব কষ্ট হয়। সাইকেল নিয়ে তার কষ্টের স্মৃতি রয়েছে। আলম বেপারির বাড়িতে কাজ করার সময় প্রতিদিনই রমজান কান্নাকাটি করত বেপারির ছেলের সাইকেলে চড়ার জন্য। একদিন বারান্দায় সাইকেল দেখে রমজান সাইকেলে উঠলে বেপারির বউ সুনাবানের চোখের সামনে রমজানের গালে থাপ্পড় মারে। পরদিন থেকেই কাজ ছেড়ে দেয় এ বাড়িতে। মনের মধ্যে একটি স্বপ্ন পোষে একদিন কাজ করে হলেও ছেলেকে সাইকেল কিনে দেবে। কিন্তু আজ যখন ছেলে বায়না ধরল সাইকেল কেনার তখন সুনাবান চিন্তায় পড়ে গেল। এ টাকা দিয়ে সাইকেল কিনলে হাতে আর টাকা থাকবে না। রমজানকে বুঝিয়ে বলল, বাবা তোকে আমি সাইকেল কিনে দিব। তবে এখন নয়। আমার যখন সম্পদ হবে তখন। রমজান জানতে চায় সম্পদ হলে কী হবে। সম্পদশালী হলে সাইকেল কিনলেও আর সম্পদ শেষ হবে না, এখন কিনলে যা আছে সব শেষ হয়ে যাবে বলে সুনাবান জানায়। এখন মা ছেলে দুজনেরই মাথায় চিন্তা এ টাকার সুরক্ষা ও সম্পদ বানানো।

পরদিন স্কুল থেকে এসে রমজান উত্তেজিত হয়ে বলে মা তোমার টাকা ব্যাংকে রেখে দাও। রুমানের স্কুলের পাশে একটা ব্যাংক রয়েছে। স্কুলে যাওয়া আসার পথে প্রতিদিনই সে ব্যাংকটি দেখে। ব্যাংকে যে মানুষ টাকা রাখে বন্ধুদের কাছ থেকে সে শুনেছে। কথাটা সুনাবান মাথায় নিলেও কীভাবে ব্যাংকে টাকা রাখতে হয় তা মাথায় আসে না। তবে মাথায় কিছু ঢুকলে তা ছেড়ে দেয়ার মানুষ নয় সুনাবান। রাত শেষ হলে সকালে ছেলের সাথে স্কুলে চলে যায় সুনাবান। ছেলের মাস্টারের কাছে জানতে চায় কীভাবে ব্যাংকে টাকা রাখতে হয়। মাস্টার সাহেব ব্যাংক একাউন্ট খোলার সবকিছু সবিস্তারে বুঝিয়ে দেন সুনাবানকে। আর আটকায় কে? ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে সুনাবান ব্যাংকে হাজির। কিন্তু নিরক্ষর সুনাবান দস্তখত করতে পারে না তাই অফিসার ব্যাংক হিসাব খুলতে রাজি নয়। ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলেও সুনাবান পরের সপ্তাহে আবার ব্যাংকে হাজির হয়। এবার ছেলের কাছ থেকে অনেক কষ্টে দস্তখত শিখে।

তারপর শুরু হলো ডিম বিক্রির টাকা জমানোর পালা। জমার ভাউচার লিখে ৫০/৬০ টাকা করে জমা নিতে ব্যাংক অফিসাররা একটু গড়িমসি করলেও সুনাবানের আগ্রহ ও উদ্যম দেখে তারা সহযোগিতা করতে লাগলেন। মাসের পর মাস যাচ্ছে, সুনাবানের জমার স্থিতিও বেড়ে চলেছে। তার খামারের হাঁসের সংখ্যাও বাড়ছে। ছেলেও প্রাইমারি স্কুলের শেষ ক্লাসে উঠে গেছে। একদিন মা ছেলে মিলে ব্যাংকে যায়। জানতে চায় তাদের কত টাকা জমা হয়েছে। ব্যাংকের অফিসার এদিক সেদিক তাকিয়ে কম্পিউটারে টিপাটিপি করে বললেন, এক লাখ এক টাকা। মা ছেলে দুজনেই একটু অবাক হয়ে এক সাথে বলে ওঠে কী! ব্যাংকার কিছুটা বিরক্তি নিয়ে আবার বলেন, এক লাখ এক টাকা শুনেননি!

ওরা ব্যাংক থেকে বেরিয়ে আসে। দুজনের চেহারা খুশিতে চিক চিক করতে থাকে। কোনো কথা না বলেই বাড়ির দিকে হাঁটছে দুজন। সুনাবানের মাথায় আসছে না এত টাকা দিয়ে সে এখন কী করবে। তবে ছেলের সাইকেল কিনতে যে আর দেরি করবে না সে সিদ্ধান্ত সে মনে মনে নিয়ে নেয়। রুমানও খুশি এবার তাহলে মা তাকে সাইকেল কিনে দিতে নিষেধ করবে না। তবে একটি চিন্তার সুরাহা করতে পারেনি রুমান। মা বলেছিলেন সম্পদশালী হলে সাইকেল কিনে দেবেন। কত টাকা হলে মানুষ সম্পদশালী হয়? তা তো জানা নেই রমজানের! এখন মাকে সাইকেলের কথা বলে আবার যদি অপেক্ষায় থাকতে হয়! তাই কত টাকা থাকলে একজন মানুষ সম্পদশালী এটা না জেনে আর সাইকেল চাইবে না। যেই ভাবনা সেই কাজ। মাকে রাস্তায় রেখে চলে যায় স্কুল মাস্টারের কাছে।
রফিক মাস্টার রমজানের দৌড়ে আসা দেখে জানতে চায় কী হয়েছে? রমজান ঘন ঘন শ্বাস নিতে নিতে জানতে চায় স্যার, মানুষের কত টাকা থাকলে তাকে সম্পদশালী বলা হয়? প্রশ্ন শুনেই রফিক মাস্টার সাহেব জোরে জোরে হাসতে শুরু করেন। রমজান কিছুটা অবাক হয়! তাদের রফিক স্যার ছাত্রদের কাছ থেকে যেকোনো বিষয়ে প্রশ্ন শুনলে খুবই খুশি হোন। আদর করে উত্তর দেন। প্রশ্ন বইয়ের পড়া বিষযক হোক কিংবা অন্য কোনো বিষয়ে হোক। তাই ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীদের মনে যত প্রশ্ন আসে তা অনেকটা বন্ধুর মত মনে করে রফিক স্যারকেই করে ফেলে। এরকম কোনোদিন হাসেননি। একদিনের কথা মনে পড়লে এখনও সহপাঠীরা হাসেন। রমজানের ক্লাসের বন্ধু রতন। স্কুলে আসার পর তার প্যান্টে চেইন নষ্ট হয়ে যায়। কোনো অবস্থাতেই সে তার প্যান্টের চেইন লাগাতে পারছিল না। ক্লাসের সবাই তার দিকে তাকিয়ে হাসছিল। কেউ কেউ বলছিল তাড়াতাড়ি বাড়ি যা। প্যান্ট পাল্টে চলে আয়। একটু পর রফিক স্যারের ক্লাস। এসব বলাবলির মধ্যেই রফিক স্যার চলে আসেন ক্লাসে। রতন দাঁড়িয়ে বলে স্যার আমার প্যান্টে চেইন লাগাতে পারছি না, এখন আমি কি করব। ক্লাসে হাসির রুল পড়লেও পরম মমতায় রফিক স্যার চেষ্টা করলেন চেইনটি লাগিয়ে দিতে। অপারগ হয়ে তাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। সেই স্যার আজ রমজানের জীবনের এত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন নিয়ে কেন হাসছেন তা বুঝতে পারছে না।

রফিক স্যার রমজানের হাত ধরে নিয়ে গেলেন হেড স্যারের রুমে। সেখানে গিয়ে রমজানের প্রশ্নের বিষয়ে হেড স্যারকে বললে তিনিও হাসতে থাকেন। হেড স্যার হাসতে হাসতে বলেন, আমাদের রমজান অনেক বড় হয়ে গেছে। অর্থমন্ত্রী বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে কী বলেছেন সেটা জানার আগ্রহ জন্মেছে তার। বাহ! রমজান! স্যারদের এসব হাসির কোনো অর্থ না বোঝে রমজান শুধু অবাক হচ্ছিল। এমন সময় মনে হলো মাকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রেখে এসেছে। সে আবার জানতে চায় স্যার বলেন না প্লিজ, কত টাকা থাকলে মানুষ সম্পদশালী হয়? আরে ব্যাটা শুনছনি, অর্থমন্ত্রী বলেছেন ব্যাংকে এক লাখ টাকার উপরে থাকলে তাকে সম্পদশালী বলা যায়। স্যার সত্যি! হুম, তাইতো বললেন আমাদের মন্ত্রী মহাশয়!

ফিরতি দৌড়ে রমজান চলে আসে মায়ের কাছে। উত্তেজনায় স্যারদেরকে সালাম দিয়ে আসতেও ভুলে যায়। এসেই মাকে জড়িয়ে ধরে বলে মা, আমরা এখন সম্পদশালী! সুনাবান বলে কে বলল আমরা সম্পদশালী? ফালতু কথা বাদ দেয়। তোকে সাইকেল কিনে দেব এ কথা মনে মনে ঠিক করে ফেলেছি। না, মা সত্যি তুমি এখন সম্পদশালী! আমাদের হেড স্যার ও রফিক স্যার বলেছেন, ব্যাংকে এক লাখ টাকার উপরে থাকলে নাকি মানুষ সম্পদশালী হয়, অর্থমন্ত্রী বলেছেন। মন্ত্রী বলেছেন শুণে সুনাবানও অবাক হয়! তাহলে সত্যি সত্যি সুনাবান এখন সম্পদশালী! নিজের অজান্তেই আনন্দে বুকটা ফেটে যায় সুনাবানের। ছেলে তো কখনও মিথ্যা বলে না। তার উপর যখন মাস্টারের কাছে শুনেছে, তাহলে কথা পাক্কা। এক লাখ এক টাকা তো লাখের চেয়ে বেশি। সব হিসাবেই দুয়ে দুয়ে চার। সম্পদশালী মানুষ দেদারছে খরছ করলেও সম্পদ শেষ হয় না বলেই সুনাবানের বিশ্বাস।

মুহুর্তেই নতুন এক সুনাবান হিসেবে সে ব্যাংকে ফিরে আসে। অফিসারের কাছে তার টাকা তুলতে চায়। চেকের পাতায় সই নিয়ে ক্যাশিয়ার সুনাবানকে টাকা দেন। তবে এক লাখ নয়, নিরান্নব্বই হাজার। ব্যাংকের একাউন্টে ন্যুনতম এক হাজার টাকা রাখতে হয়। সুনাবানের মন একটু খারাপ হলেও শন শন করে ব্যাংক থেকে বেরিয়ে সে যায় জকিগঞ্জ বাজারের জোনাকি বস্ত্র বিতানে। উদ্দেশ্য রমজান ও নিজের জন্য নতুন কাপড় কেনা। তারপর সিলেট শহরে গিয়ে ছেলের জন্য ভালো একটা সাইকেল কেনা।

কাপড়ের দোকানের মালিক সুনাবানকে চিনেন। তাই সুনাবান যখন ভালো কাপড় দেখানোর কথা বলে তখন কিছুটা অবাক হন। বলেন, ভালো কাপড়ের দাম বেশি, সুনাবান তুমি কিনতে পারবে না। মুখে বিরক্তি নিয়ে সুনাবান বলে, আমি আর আগের সুনাবান নই। এখন আমারও সম্পদ আছে। আপনি দেখান যত টাকা লাগে দেব। সুনাবানের দেমাগ দেখে দোকানদার হাসি চেপে রেখে তার জন্য ভালো একটা শাড়ি এবং রুমানের জন্য ভালো শার্টই দেন। দুটোয় মিলে দাম পাঁচ হাজার টাকা। সুনাবান কোনো দাম দর না করেই টাকা দিয়ে বেরিয়ে পড়ে। কাপড়ের দোকানদার অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়।

বাড়িতে এসে নুতন কাপড় গায়ে দিয়ে মা ছেলে বেরিয়ে পড়েন বাসস্ট্যান্ডের দিকে। সুনাবানের মনে পড়ে গাড়িতে উঠলে ড্রাইভার সাহেবকে অনেক অনুরোধ করতে হতো অতীতে ভাড়া কম নেয়ার জন্য। আজ আর কোনো অনুরোধ নয়। ভালো দেখে দুটো সিটে বসে পড়ে মা ছেলে। কন্ট্রাক্টর গাড়ি ছাড়ার একটু আগে বলে, এই তুমি পেছনের সিটে যাও। সামনের সিটে বসে রইছো আর ভাড়া দেওনের সময় শুধু কম দেয়ার ধান্ধা। সুনাবানের মেজাজ গরম হয়ে যায়। এই তোমার ভাড়া যত আছে তত পাবে, কথা কম বলো। উ.. দেখছি কত টাকা দিতে পারো বলে মুখ ভেংছি কাটে কন্ট্রাক্টর।

সুনাবান কাপড়ের দোকানদার, বাসের কন্ট্রাক্টর সবার কথায় খুব কষ্ট পায়। মনে মনে ভাবে তাদেরকে বুঝিয়ে দিতে হবে সুনাবান সম্পদশালী হয়েছে। সেই সাথে ঠিক করে শহরে গিয়ে আর আত্মীয়ের বাসায় উঠবে না। ওই আত্মীয়রাও গরীব বলে ভালো ব্যবহার করে না সুনাবানের সাথে। এখন যেহেতু সে গরীব নয়, তাই আজ রাতে হোটেলে থেকে কাল সাইকেল কিনে বাড়ি ফিরবে। হোটেলে ছেলের মনে যা চায় তা খেতে দেবে। গাড়ি চলছে, সুনাবানও এগুলো ভাবছে। রুমানের ভাবনায় কীভাবে, কোথায় কাল থেকে সাইকেল চালাবে। তবে রাস্তার করুণ দশার ঝাকুনিতে মা ছেলের চিন্তায় ছেদ পড়ছে অনবরত। মাঝে মাঝে প্রচন্ড ঝাকুনিতে সুনাবান কোমরে ব্যথা পেয়ে ও মাইগো! বলে উঠে। রাস্তার বেহাল অবস্থা দেখে সে ভাবে, সুনাবান সম্পদশালী হইছে দেখে মনে হয় দেশটা গরীব হয়ে গেছে। নইলে রাস্তা এত ভাঙ্গা হবে কেন।

সড়কের বাজার পাড়ি দিয়ে আরও সামনে যাওয়ার পর বড় বড় গর্তে যখন গাড়ি ঢুকে দোলনার মত এপাশ ওপাশ দোলতে থাকে তখন সুনাবান ভয় পেয়ে যায়। মনে মনে কলেমা পড়তে থাকে। ওদিকে রমজান খুব আনন্দ পাচ্ছে গাড়ির দোল খাওয়া দেখে। সে বুঝতে পারছে না মানুষ এত ভয় পাচ্ছে কেন। তার তো ভালোই লাগছে দোল খেয়ে খেয়ে গাড়ির এগিয়ে যাওয়া। শাহবাগের পরে গর্তগুলো যেন ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। গাড়ির দোল খাওয়াও বেড়ে যায়। তারপর..। তারপর সুনাবানের কিছুই মনে নেই। শুধু মনে পড়ে রক্তমাখা ছেলের পাশে সে বসে আছে। গাড়ি এক্সিডেন্ট কীভাবে কোন কোন গর্তে পড়ে হয়েছে বলতে পারবে না। কোনো এক সিএনজি ড্রাইভার মা ছেলেকে তুলে নিয়ে আসে সিলেট শহরে। ছেলের মাথা থেকে অনবরত রক্ত পড়ছে আর সুনাবান চিৎকার করে কান্নাকাটি করছে। ড্রাইভার তাড়াতাড়ি যে ডাক্তার পাও তার কাছে নিয়ে যাও। আমার ছেলেকে বাঁচাও। ছেলে ছাড়া আমি বাঁচব না।

শহরে ঢুকে সিএনজি ড্রাইভার ভাবে ওসমানি হাসপাতাল দূরে, কাছাকাছি ওয়েসিস হাসপাতাল। তাই ওয়েসিসে নামিয়ে দেয় মা ছেলেকে। জরুরি অপারেশন প্রয়োজন রমজানকে বাঁচাতে। অনেক টাকারও দরকার। তাই গরীব চেহারার সুনাবানকে ডাক্তাররা সরকারী হাসপাতালে পাঠাতে চায়। সুনাবান দৃঢ় কন্ঠে প্রতিবাদ করে। যত টাকা দরকার সব টাকাই দেবে সে। ডাক্তার যেন তাড়াতাড়ি চিকিৎসা করেন তার ছেলের। সাথে সাথে হাতের ব্যাগ থেকে টাকা বের করে জমা দেয়। এবার ডাক্তার সাহেবরা তড়িগড়ি করে অপারেশন শুরু করেন।

সাত দিন পর রমজান কথা বলতে শুরু করে। তবে চোখে কিছুই দেখতে পায় না। মাথায় প্রচন্ড আঘাতে চোখের অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। ঢাকা কিংবা দেশের বাইরে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা না করালে চোখ ভালো হবে না। হাসপাতাল কতৃপক্ষ এক লাখ সত্তর হাজারের একটি বিল ধরিয়ে দিয়ে বলে আমাদের এখানে এরচেয়ে বেশি কিছু করা সম্ভব নয়। আপনি বাকি টাকা দিয়ে ছেলেকে নিয়ে ঢাকা যেতে পারেন। আরেকটি অপারেশন করলে হয়তো চোখে দেখতে পারে। এ কথা শুনে সুনাবানের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। একদিকে ছেলের চোখ ভালো হবে না, অন্যদিকে আরও টাকা চায়। শালারা সব চোর! নতুবা আমার টাকা শেষ হয় কেমনে- এই ভাবনা থেকে চিৎকার শুরু করে সুনাবান।

সুনাবানের চিৎকারে কর্তব্যরত ইন্টার্ণ ডাক্তার আসেন। খুব মেজাজ নিয়ে বলেন, এই এখানে চিল্লাফাল্লা করছেন কেন? রাবিশ! এবার আগুনে ঘি দেয়ার মতো অবস্থা। সুনাবান চিৎকার আরও বাড়িয়ে দিয়ে বলে মানুষের ঘরে কাজ করে সম্পদশালী হলেও কেউ কোনোদিন আমাকে খবিশ বলেনি। টাকা দিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছি আর ডাক্তার আমাকে খবিশ বলল। আমি এর শেষ দেখে নেব। ডাক্তার বিপদের গন্ধ টের পেয়ে সুর নামিয়ে নিলেন। বলেন মা, আমি খবিশ বলিনি, বলেছি রাবিশ! সুনাবান ভাবে এটা হয়তো কোনো রোগের নাম। বলে, ওহ বাবা কিছু মনে নিও না। আমি আরও ভাবছি আমাকে গালি দিয়েছো। সুনাবানের সরলতায় ডাক্তার মুগ্ধ হয়ে সবিস্তারে জানতে চায় তার সব সমস্যা।
সুনাবানের জীবন কাহিনি শুনে ডাক্তার প্যান্টের পকেট থেকে টিস্যু পেপার বের করে চোখ মুছেন। ভাবেন, সুনাবান হয়তো অশ্রু দিয়ে তার দুঃখের তাপ সহনীয় করেছিল। কিন্তু ছেলেটি চোখ হারিয়ে দুঃখের অগ্নিপথ পাড়ি দেয়ার জন্য সেই অশ্রুও পাবে না। কোনো একদিন হয়তো এই সুনাবান বোঝবে সে কেমন সম্পদশালী হয়েছে যখন অন্ধ ছেলেকে নিয়ে রাস্তায় ভিক্ষা করবে! এখনও সে ভাবছে রফিক মাস্টারকে নিয়ে সে অর্থমন্ত্রীর কাছে যাবে তার সম্পদ কীভাবে শেষ হয় তা জানতে। তখন নিশ্চয়ই হাসপাতালের চুরির বিষয়টি ধরা পড়বে। সেও টাকা ফেরত পাবে। আর ডাক্তার ভাবছেন মেয়েটি এখন বাকি টাকা কীভাবে পরিশোধ করবে, এখান থেকে কীভাবে রিলিজ পাবে! রাস্তায় ভিক্ষা করার জন্যও তো এখান থেকে বের হওয়ার সুযোগ দরকার!

পাদটীকা: ব্যাংকে যাদের লাখ টাকা, তারা সম্পদশালী বলেই বাড়তি কর- অর্থমন্ত্রী

মোঃ মাহমুদুর রহমান : ব্যাংকার ও কলামিস্ট
mahmudpukra@gmail.com

 

শেয়ার করুন