‘ভোক্তার কাছ থেকে নেয়া ভ্যাট সরকারকে দিতে সমস্যা মনে করছেন ব্যবসায়ীরা’

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড(এনবিআর)-এর সাবেক চেয়ারম্যান। তিনি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সম্প্রতি তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিলেটের সকালের বিশেষ প্রতিনিধি মুহাম্মদ জাহিদ হাসান।

সিলেটের সকাল: ভ্যাট আইনের কারণে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা কি বেশি বলে মনে হয়?

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: বাজেটের একটা এনোয়াল গ্রোথ রাখতে হয়। সে দিক দিয়েই বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক আছে। এমনকি এবার বড় বড় প্রকল্পে অনেক টাকা বরাদ্দ রাখতে হবে। সেজন্য বাজেট একটু বড়। তবে টোটাল বাজেট থেকে ঘাটতি বাদে বাকিটা অভ্যন্তরীন উৎস থেকে আহরণ করতে হবে। এনবিআরকে এ লক্ষ্যমাত্রার সত্তর ভাগের বেশি আহরণ করতে হবে।

সিলেটের সকাল: লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এনবিআর কতটা ভূমিকা রাখতে পারছে?

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: বাজেট মানেই ব্যয়। বার্ষিক হারে এনবিআরের অর্জনের প্রবৃদ্ধি হার ১২-১৩ এর বেশি হচ্ছে না। বাংলাদেশে ট্যাক্স জিডিপি রেশিও এখনো ১০-১১ কিন্তু যেটা হওয়ার কথা ১৫-১৬ শতাংশ। এবার এনবিআরের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩০-৩২ শতাংশ ধরা হলেও এনবিআরের অর্জন ১৫-১৬ শতাংশ হতে পারে বলে মনে করি। নতুন খাত বা ক্ষেত্র এবং নতুন করদাতা না বাড়ালে একই করদাতাকে সব সময় কর দিতে হয়। করদাতার ব্যবসায় কোন ক্ষতি কিংবা আয় না হলেও তার উপর চাপ সৃষ্টি হয়। সেজন্য নতুন নতুন খাত বের করতে হবে। যারা এখনো করের আওতায় আসেনি, তাদের করজালে আমন্ত্রণ জানাতে হবে। আর সে টার্গেট অনুযায়ী কাজ করতে হবে।

সিলেটের সকাল: নতুন এ ভ্যাট আইনে করদাতাদের বিষয়টি কিভাবে দেখা হচ্ছে?

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: নতুন ভ্যাট আইনটি পরিশীলিত ও আধুনিক। তবে এ আইনে ধরে নেয়া হয়েছে বিক্রেতা বা সেবা প্রদানকারী সকল প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত ও অনলাইনে আছেন। কিন্তু কার্যত এখনো অনেকেই নিবন্ধিত নন ও অনলাইনে নেই। এমনকি কারও কোন ব্যবসা না হলেও সে এখন এ আইনের আওতায় আসবে। এটা অর্থনীতির জন্য, করদাতার জন্য এবং কর সংগ্রহকারীর জন্য অনেকে বিব্রতকর মনে করেন। তবে সকলকে নিবন্ধিত ও অনলাইনে আসতে হবে এবং প্রত্যেককে আর্থিক প্রতিবেদন দিয়ে প্রমাণ করতে হবে তার প্রতিষ্ঠান করের আওতায় আসছেন কি না। এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

সিলেটের সকাল: ব্যবসায়ীরা বলছেন ভ্যাট বাড়ালে সেটা জনগণের উপরেই চাপ সৃষ্টি হবে। এ বিষয়টিকে কিভাবে দেখছেন আপনি?

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: এটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। ভ্যাট ও ট্যাক্স এক সাথে গুলিয়ে ফেললে হবে না। ভ্যাট টাচেস এভরিবডি বাট ইনকাম ট্যাক্স ডাজনট। সেজন্য ভ্যাট এমনভাবে করতে হবে যেন হত দরিদ্রদের জন্য কষ্টকর না হয়। এটা ঠিক ভ্যাট সাধারণত সকলে দিচ্ছে। কিন্তু কিছু ব্যবসায়ীরা সেটা সরকারকে পরিশোধে যথা দায়িত্ব পালন করছেন না।

নতুন ভ্যাট আইনটি ২০১২ সালের। আইনটাতে সংযোজন বিয়োজনের কাজ নিজস্ব হওয়ার কথা। প্রথমে যে ড্রাফট তৈরি হয় সেসময় বেশ কয়েকজন উন্নত অর্থনীতির বিদেশী পরামর্শকরা এখানে সহায়তা দেন। এফবিসিসিআই ড্রাফট প্রণয়নের সময় যুক্ত ছিলেন। ২০১১ সালের ড্রাফট ২০১২ সালে হঠাৎ করে আইনে পরিণত করা হয় এবং আইনের ভিতরেই ৪/৫ অধ্যায় ও ১৫/১৬টি ধারা সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর করা হয়। বাকিগুলোর বাস্তবায়ন সরকার সময় মতো করবেন বলে সাব্যস্ত হয়। সে সময় ইতিমধ্যে পাঁচ বছর পার হয়েছে।

সিলেটের সকাল: আইনটি ব্যবসায়ীদের কাছে কেন অপছন্দের এবং প্যাকেজ ভ্যাটের বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন?

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: একটা আইন করতে গেলে সব সময় সকলের পছন্দ হবে না। বর্তমানেও ১৫ শতাংশ ভ্যাট আছে। তবে খাত ভেদে বিভিন্ন হারে রেয়াতের ব্যবস্থা ছিলো। কিন্তু নতুন আইনে এটা আপাতত নেই। এখন ব্যবসায়ীরা সরকারের সাথে আলোচনায় আছেন। তারা বলেছেন আগে আমাদের কথা শোনা হয়নি। আমাদের বিষয়টি দেখা হয়নি। এ সব বাস্তবায়নে তাদের যাতে সমস্যায় না পড়তে হয় সে মর্মে আইনের কিছু ধারা উপধারা পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছে। ভ্যাট মূলত তাদেরকে ক্রেতার কাছ থেকে নিয়ে সরকারকে দিতে হবে। তবে উৎপাদনকারী ও পাইকারীকারীর উভয়ের কাছ থেকে ভ্যাট নিতে হবে এবং খুচরা ব্যবসায়ীদের জন্য আইনের মাঝে ক্ষেত্র ও প্রয়োজন মত সুযোগ সুবিধা রাখতে হবে।

যাদের ৩০ লক্ষ টাকার কম কেনা-বেচা তাদেরকে ভ্যাটের বাইরে রাখতে হবে। প্যাকেজ সিস্টেম কিন্তু ভালো সিস্টেম না। অনেকেই কিছু দেয় আবার দেয়ও না। । সকলকে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। যারা প্যাকেজ ভ্যাট দিচ্ছেন না তারা আসলেই কি দিচ্ছেন না? সেটা ভাবার বিষয় নয়। এনবিআরের সক্ষমতা ওখানেই দরকার- দোকানে দোকানে মেশিন বসানো, নিবন্ধন করা, ভ্যাট আদায় করা, মনিটরিং জোরদার করা ও ডাটা সংরক্ষণ করা।

সিলেটের সকাল: রাজস্ব আয় বাড়াতে ও সঠিকভাবে ভ্যাট আদায়ে এনবিআর কতটুকু কাজ করতে পারবে বলে মনে করেন?

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: রাজস্ব আয় বাড়াতে আমাদের নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। আমরা আধুনিক হবো, বেস্ট প্রাকটিসে উঠবো। তবে নরমে গরম পদ্ধতি প্রক্রিয়ায় ও মেজাজে উঠতে হবে। আমাদের লক্ষ্য থাকতে হবে ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও উপযুক্ত পর্যায়ে ওঠার। সকলে ঠিকমতো ভ্যাট দিচ্ছে কিনা সেটার মনিটরিং করতে হবে এনবিআরকে। সকল ব্যবসায়ীকে নিবন্ধন ও অনলাইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। তারা ঠিকমতো ভ্যাট দিচ্ছে কিনা, মেশিন ব্যবহার করছে কিনা ও নিয়মিত ডাটা সংরক্ষণ করছে কিনা সবকিছুই এনবিআরকে নিয়মিতভাবে দেখতে হবে।

শেয়ার করুন