ঈদের ছুটিতে ঘুরতে আসুন সিলেটে

আব্দুল্লাহ আল নোমান ।। ঈদ মানে আনন্দ আর খুশি। আর এই এই আনন্দে বাড়তি মাত্রা যোগ করতে পারে ভ্রমন। ঈদের ছুটিতে স্বপরিবারে বেড়াতে যাওয়ার মজাই অন্যরকম। তাই ঈদের পরে পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঘুরতে আসতে পারেন প্রাকৃতির অনন্য দান সিলেটে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লিলাভূমি এই সিলেট। এখানে বেড়ানোর জায়গার যেন শেষ নেই। উঁচু-নিচু পাহাড়ে ঘেরা সিলেটে পাহাড়ের ঢেউ খেলানো চা-বাগান নিমিষেই পর্যটকের মন কেড়ে নেয়। দেখার মতো অনেক স্থাপনাও রয়েছে নগরীর ভিতরে। তার মধ্যে অন্যতম- কিন ব্রিজ, আলী আমজাদের ঘড়ি, চাঁদনি ঘাটের সিঁড়ি, হজরত শাহজালালের (রহ.) ও শাহ পরান (রহ.) সহ ওলি আউলিয়াদের মাজার, খাদিমনগর জাতীয় উদ্যান, শাহী ঈদগাহ, গৌর গোবিন্দের টিলা প্রভৃতি।

এছাড়াও জাফলং, লালাখাল, শ্রীপুর, জৈন্তাপুর, রাতারগুল, জকিগঞ্জে তিন নদী সুরমা-কুশিয়ারা-বরাক মোহনা, জৈন্তিয়া রাজবাড়ী, বিছনাকান্তি ছাড়াও দেখার মতো অনেক কিছু রয়েছে।

সিলেটের প্রকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ননা করে শেষ করা যায় না, এই সৌন্দর্য শুধুই উপভোগ করার। তাইতো এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কবি গুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেটকে ‘শ্রীভূমি সিলেট’ নামে আখ্যায়িত করেছিলেন।

ঈদ-উল-ফিতরকে সামনে রেখে এখন সিলেটের পর্যটন স্পটগুলোতে সাজ সাজ রব। পর্যটক আকর্ষণে ইতিতোমধ্যে শেষ হয়েছে ধোঁয়া-মোছা আর সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ। ঈদের দিন থেকে পর্যটকদের জমজমাট আগমন আশা করছেন পর্যটন কেন্দ্রগুলোর কর্তৃপক্ষ।

প্রাকৃতিক সবুজ সুনিবিড় সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে অনেকেই ঈদের ছুটিতে ছুটে আসবেন সিলেটের অনিন্দ্য সুন্দর পর্যটনস্পটে। জৈন্তিয়া পাহাড়ের অপরূপ দৃশ্য, জাফলং এর মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য, রাতারগুলের জলারবন, পানতুমাইয়ের ঝরণাধারা, বিছনাকান্দির স্বচ্ছ জলের হাতছানি, লোভাছড়ার লোভ মাতানো সৌন্দর্য আর সারি সারি পাথরের স্তুপ পর্যটকদের টেনে আনে বার বার। নিচে সংক্ষেপে সিলেটের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি পর্যটন এলাকার পরিচয় তুলে ধরা হলো-

জাফলং

জাফলং: সুদৃশ্য পাহাড় চুড়া, স্বচ্ছ জলরশি আর নানান রঙের নুড়ি পাথরের এক অপূর্ব সমন্বয় সিলেটের জাফলং। নগর সভ্যতার যান্ত্রিক কোলাহল ছেড়ে জীবন এখানে এসে মাথা লুকোয় একটু শান্তির খোঁজে। প্রকৃতির মায়াবী পরশে আনন্দে নেচে ওঠে মন। তাই ঈদের ছুটিকে  পরিপূর্ণ করে তুলতে যে কেউ আসতে পারেন পাহাড়,পানি ও পাথরভরা রূপকথার রাজ্য জাফলংয়ে।

সীমান্তের ওপারে ভারতীয় পাহাড়-টিলা, ডাউকি পাহাড় থেকে অবিরাম ধারায় প্রবাহমান জলপ্রপাত, ঝুলন্ত ডাউকি ব্রীজ, পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ হিমেল পানি, উচুঁ পাহাড়ের গহিন অরণ্য ও প্রকৃতির শুনশান নিরবতা পর্যটকদের দারুণভাবে মোহাবিষ্ট করে । তাই যান্ত্রিক সভ্যতার সকল ব্যাস্ততা ভুলে গিয়ে কিছুটা সময়ের জন্য হলেও প্রকৃতির সান্নিধ্যে নিজেকে সপে দিতে  প্রতিদিনই দেশি-বিদেশি হাজারো পর্যটক ছুটে আসেন প্রকৃতিকন্যা জাফলংয়ে  ।

প্রকৃতি কন্যা ছাড়াও বিউটি স্পট, পিকনিক স্পট, সৌন্দর্যের রাণী সহ বাহারী নামে পর্যটকদের কাছে পরিচিত জাফলং । ভ্রমন পিয়াসীদের কাছে জাফলংয়ের আকর্ষণ যেন সম্পূর্ণ আলাদা । তাই সিলেট ভ্রমনে আসলে জাফলং না গেলে ভ্রমনই যেন অপূর্ণ থেকে যায় ।

যেভাবে যাবেন: সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে বাস/ মাইক্রোবাস/ অথবা ওসমানী শিশু উদ্যানের সামন থেকে সিএনজি চালিত অটোরিকশা/ হিউম্যান হলার (লেগুনা) যেতে পারেন জাফলং এ। সময় লাগবে দেড় থেকে ২ ঘণ্টা। ভাড়া বাস- ৫৬ টাকা। মাইক্রোবাস-২ হাজার টাকা থেকে ২ হাজার ৪’শ টাকা। সিএনজি অটোরিকশা ৭শ’ টাকা।

যেখানে থাকবেন: জাফলংয়ে থাকার তেমন সুব্যাবস্থা নেই  ।  ঊল্লেখ করার মধ্যে রয়েছে নলজুরী এলাকায় জেলা পরিষদের রেস্ট হাউস (পূর্ব অনুমতি নিতে হবে), শ্রীপুর পিকনিক স্পট, শ্রীপুর বাংলো । এছাড়া জাফলংয়ে থাকার জন্য ব্যাক্তি মালিকানাধীন সাধারণ মানের স্থানীয় কয়েকটি হোটেল রয়েছে ।

বিছনাকান্দি

বিছনাকান্দি: বিছনাকান্দির স্বচ্ছ জলে ছড়িয়ে আছে সফেদ রূপের বাহার। পাথর-কণায় লুকিয়ে থাকা জলতলের সৌন্দর্য মেলে ধরেছে প্রকৃতি। পাথর ছুঁয়ে ধেয়ে নামছে মেঘালয়-চেরাপুঞ্জি পাহাড়ের স্বচ্ছ জল। সেই জলে বাসা বেঁধেছে পাথর। সঙ্গে নুড়িকণা। আশ্চর্য করা এই সৌন্দর্য সিলেটের গোয়াইঘাট সীমান্তের বিছনাকান্দিতে।

যেভাবে যাবেন: সিলেট থেকে বিমানবন্দর সড়ক ধরে তারপর সালুটিকর মোড় ঘুড়ে সব মিলিয়ে দেড় ঘণ্টার পথ পাড়ি দিলেই বিছানকান্দি চলে যাওয়া য়ায়। সালুটিকর থেকে সরু সড়কপথে প্রায় বিশ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে হাদারপাড়া বাজারে থেমে যায় গাড়ি। বাকিপথ হেঁটে অথবা নৌকায় যেতে হয়। এই পথ মাত্র দুই কিলোমিটার। এর পরেই পাথুরে পথ মারিয়ে যেতে হয় বিছনাকান্দি। ভাড়া সিএনজি অটোরিকশা ৪শ’ থেকে ৭শ’ টাকা।

লালাখাল

লালাখাল: জাফলং যাওয়ার পথে জৈন্তাপুর উপজেলার সারিঘাটের সন্নিকটেই অবস্থিত লালাখাল । নির্জন মনকাড়া লালাখানের স্বচ্ছ নীল জলরাশি আর দুই ধারের অপরুপ সৌন্দর্য্য, দীর্ঘ নৌ-পথ ভ্রমণের সাধ যেকোনো পর্যটকের কাছে এক দূলর্ভ আকর্ষণ। ভারতের চেরাপুঞ্জির ঠিক নিচে লালাখালের অবস্থান। চেরাপুঞ্জি থেকে এ নদী বাংলাদেশে প্রবাহিত। এবার ঈদে লালাখালে ভীড় থাকবে পর্যটকের।

যেভাবে যাবেন: সিলেট শহর থেকে লালাখালের দূরত্ব ৪০ কিলোমিটার। সেখানে অনেকভাবে যাওয়া যায়। শহর থেকে বাস, টেম্পু মাইক্রোযোগে পৌঁছা যায়। এছাড়া সারিঘাট থেকে ভারতের চেরাপুঞ্জি পাহাড় থেকে উৎপন্ন হওয়া সারি নদীর স্বচ্ছ নীল জলরাশির উপর দিয়ে নৌকা অথবা স্পীডবোট করেও যেতে পারেন লালাখাল ।

রাতারগুল

রাতারগুল: সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নে অবস্থিত বাংলাদেশের একমাত্র ‘সোয়াম ফরেস্ট’ (জলবন) রাতারগুল। চারদিকে নদী ও হাওরবেষ্টিত এ বনের বেশির ভাগই এলাকাজুড়ে রয়েছে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা হিজল-করচগাছ। ‘সিলেটের সুন্দরবন’ খ্যাত প্রায় ৩৩১ একর আয়তনের রাতারগুল বনে বর্ষাকালে পর্যটকদের ভিড় ব্যাপকভাবে লক্ষ করা যায়।

যেভাবে যাবেন: সিলেট থেকে রাতারগুলের দূরত্ব মাত্র ৩০ কিলোমিটার। শহর থেকে সরাসরি কোন যানবাহন সার্ভিস নেই। তবে শহর থেকে সিএনজি অটোরিকশা/ মাইক্রোবাস নিয়ে যেতে পারেন। ভাড়া পড়বে ৭০০ থেকে ১হাজার টাকা।

পানতুমাই: বাংলাদেশের কোল ঘেঁষে প্রতিবেশী ভারতের মেঘালয়ের গহীন অরণ্যের কোলে বাংলাদেশ পানে নেমেছে অপরূপ এক ঝরনাধারা। সুউচ্চ পাহাড় থেকে নেমে আসছে জলরাশি। সফেদ জলধারা লেপ্টে আছে সবুজ পাহাড়ের গায়। দেখলে মনে হবে সবুজের বুকে কেউ হয়তো বিছিয়ে রেখেছে সাদা শাড়ি। ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা এই ঝরনাধারাটি স্থানীয়ভাবে মায়ামতি ও ফাটাছড়া ঝরনা হিসেবে পরিচিত। আর পর্যটকদের কাছে জলপ্রপাতটির পরিচিতি ‘পাংথুমাই ঝরনা’ নামে।

যেভাবে যাবেন : সিলেট শহর থেকে পাংথুমাইয়ের দূরত্ব প্রায় ৪৫ কিলোমিটার। সিলেট শহর থেকে মাইক্রোবাস বা সিএনজি অটোরিকশাযোগে যাওয়া যাবে পাংথুমাইয়ে। শহরের আম্বরখানা থেকে অটোরিকশা নিয়ে সরাসরি যাওয়া যাবে পাংথুমাই। এছাড়া নগরীর যে কোনো স্ট্যান্ড থেকে মাইক্রোবাস নিয়েও যাওয়া যাবে পাংথুমাইয়ে।  নগরীর আম্বরখানা থেকে সালুটিকর বাজার, সালুটিকর বাজার থেকে গোয়াইনঘাট সড়ক দিয়ে গোয়াইনঘাট ডিগ্রি কলেজের পূর্বপাশের আহারকান্দি রাস্তা দিয়ে সোজা যাওয়া যাবে পাংথুমাই।

লোভাছড়া: সীমান্তের বড় বড় পাহাড় ছুঁয়ে নেমেছে ঝর্ণা।  চারদিকে সবুজ বেষ্টিত চা বাগান, সারি সারি গাছ, পাহাড় আর বালু সমৃদ্ধ স্বচ্ছ পানির বহমান নদী।  অনেকটা লোকচক্ষুর আড়ালে প্রাকৃতিক নৈসর্গের আরেক রূপ। নাম ‘লোভাছড়া’।  সিলেটের সীমান্তবর্তী কানাইঘাট উপজেলায় অবস্থিত মনোমুগ্ধকর অপূর্ব এই সৃষ্টি।  প্রকৃতি যেখানে তারে সৌন্দর্যের লোভ ছড়ায়! রাঙ্গামাটির মতোই একটি ঝুলন্ত ব্রিজ রয়েছে এই লোভাছড়ায়। ব্রিজটি নির্মিত হয় ১৯২৫ সালের এপ্রিল মাসে।

যেভাবে যাবেন : দেশের যেকোনে জায়গা থেকেই সিলেট এসে বাসে করে ৬০ টাকা দিয়ে যাওয়া যাবে কানাইঘাট। অথবা সিলেট থেকে সিএনজি রিজার্ভ করেও যাওয়া যাবে। এক্ষেত্রে ভাড়া নেবে ৬শ টাকার মতো। কানাইঘাট থেকে নৌকা করে লোভাছড়ায় যেতে জনপ্রতি ভাড়া নেবে ৩০-৪০ টাকা করে।

মালনীছড়া চা বাগান

মালনীছড়া চা বাগান: ওপরে বড় বড় ছায়া বৃক্ষ। নিচে আধো আলো আধো ছায়ায় দুটি পাতা একটি কুঁড়ির সবুজ চাদর। যেন শৈল্পিক কারুকাজ। সিলেটের চা-বাগানের এ প্রাকৃতিক দৃশ্য পর্যটকের মন ছুঁয়ে যায়।

১৫০০ একর জায়গার ওপর অবস্থিত উপমহাদেশের প্রথম চা বাগান মালনীছড়ায় পর্যটকদের কাছে আরেক বিষ্ময়। সিলেটের চায়ের রঙ, স্বাদ এবং সুবাস অতুলনীয়। বর্তমানে বেসরকারি তত্ত্বাবধানে চা বাগান পরিচালিত হয়ে আসছে।

চা বাগানের পাশাপাশি বর্তমানে এখানে কমলা ও রাবারের চাষ করা হয়। এই বাগানের পাশ্বেই নির্মিত হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম সুন্দর স্টেডিয়াম। যেখানে ২০১৪ সালের বিশ্ব টি-২০ খেলা অনুষ্ঠিত হয়।

মালনীছড়া চা বাগান ছাড়াও সিলেটে লাক্কাতুরা চা বাগান, আলী বাহার চা বাগান, খাদিম আহমদ টি স্টেট, লালাখান টি স্টেট, বরজান টি স্টেট উল্লেখযোগ্য।

যেভাবে যাবেন: মালনীছড়া এবং লাক্ষতুরা চা বাগান দুটোই সিলেট শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত। শহরের কেন্দ্রস্থল জিন্দাবাজার পয়েন্ট থেকে যে কোনো গাড়ি দিয়ে মাত্র ১৫ মিনিটে যাওয়া যায় চা বাগান দু’টিতে।

এছাড়াও সিলেটের শাহজালাল(র.) এবং শাহপরান (র.) এর মাজার এবং নাজিমগড় রিসোর্ট, জাকারিয়া সিটি, সিলেট নগরীর শেখ ঘাটে ঐতিহ্যবাহী জিতু মিয়ার বাড়ি, ঐতিহ্যবাহী ক্বিন ব্রীজ, টিলাগড়ে অবস্থিত এমসি কলেজসহ অন্যন্য পর্যটন কেন্দ্রও ঘুরে দেখতে পারেন। তাই ঈদের ছুটিতে এবার না হয় চলুন সিলেটে।

শেয়ার করুন