নৌপথে ইউরোপগামীদের মধ্যে ‘বাংলাদেশির সংখ্যাই বেশি’

uuusm20170506221655সিলেটের সকাল ডেস্ক ।। ইউরোপে শরণার্থীদের উৎসস্থল একক দেশ হিসেবে সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইরাককে ছাড়িয়ে বাংলাদেশ এখন শীর্ষে। এই শরণার্থীরা মূলত লিবিয়া হয়ে ইতালিতে ঢুকেছে। গত বছরের প্রথম তিন মাসে ইতালিতে অবৈধভাবে পাড়ি জমানো শরণার্থীদের মধ্যে মাত্র একজন ছিল বাংলাদেশি। ২০১৭ সালে এ সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িছে ২ হাজার আটশ জনে। সংবাদ: দ্য ডেইলি ইন্ডিপেন্ডেন্ট।

ভূমধ্য সাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে ঢোকার অবৈধ পথটি বেশ বিপদসঙ্কুল। সেখানে নৌকাডুবিসহ নানা কারণে এই এবছরই প্রায় ১১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

তবে অবৈধভাবে ইউরোপে পাড়ি জমানো বাংলাদেশিদের এই সংখ্যাধিক্যের পেছনে রোহিঙ্গারাও একটি কারণ বলে মনে করছেন গবেষকরা। সেইসঙ্গে বাংলাদেশে রাজনৈতিকভাবে চাপের মুখে থাকা জামায়াতে ইসলামীর কর্মীরাও এই সংখ্যা বাড়িয়ে তুলেছে বলে তাদের ধারণা।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, ইতালিতে পৌঁছানো রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের ভৌগলিক অবস্থানের পরিবর্তন ঘটছে। কিছুদিন আগ পর্যন্ত সাব-সাহার অঞ্চলের শরণার্থীদের সংখ্যা ছিল বেশি।

আইওএম-র ফ্লাভিও ডি জিয়াকোমো বলেন, “সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো অভিবাসীদের জাতীয়তা এবং বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষের সংখ্যা। গত বছর মার্চ  মাসের শেষ পর্যন্ত মাত্র একজন বাংলাদেশি ইতালিতে পৌঁছান। কিন্তু একই সময়ে এই বছর ইতালিতে পৌঁছা বাংলাদেশিদের সংখ্যা ২ হাজার ৮৩১ জন।’

দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে দুবাই হয়ে লিবিয়ায় পাড়ি জমায় এই শরণার্থীরা, এরপর ভূমধ্য সাগরে নৌকা ভাসায় ইতালির লক্ষ্যে। ইউরোপে শরণার্থীদের রুট ও জনমিতির মানচিত্র বদলের এই তথ্য উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) কর্মকর্তাদের কথায়।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন শরণার্থীদের ঢল সামলাতে কয়েক বছর আগে তুরস্কের সঙ্গে চুক্তির পর আজিয়ান সাগরের রুটটি দিয়ে অনুপ্রবেশ কমে গেলে ভূমধ্য সাগর হয়ে ইতালিতে পাড়ি জমানো বেড়ে যায়। সক্রিয় হয়ে ওঠে যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়ায় মানবপাচারকারীরাও।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ভূমধ্যসাগরে উদ্ধার হওয়া শরণার্থীরা উদ্ধারকর্মীদের জানিয়েছেন, ঢাকা থেকে লিবিয়া বা তুরস্ক পৌঁছানোর একজনকে দশ হাজার ডলারের বেশি অর্থ দিতে হয়। সিসিলি ও আপুলিয়াতে পৌঁছাতে পেরেছেন এমন কয়েকজন বাংলাদেশি অভিবাসী জানিয়েছেন, একটি ‘এজেন্সি’ তাদের লিবিয়া পৌঁছার ব্যবস্থা করে দেয়। কাজের ভিসার (ওয়ার্কিং ভিসা) জন্য এজেন্সিকে ৩ থেকে ৪ হাজার ডলার দিতে হয়।

আইওএম কর্মকর্তা ফ্লাভিও দি গিয়াকোমোর বরাত দিয়ে ইন্ডিপেন্ডেন্ট জানায়, গত বছর মার্চ নাগাদ তিন মাসে ইতালিতে ঢোকা বাংলাদেশির সংখ্যা ছিল একজন। এই বছরে ওই সময়ে এই সংখ্যাটি দাঁড়িয়েছে ২৮৩১ জনে। এই তথ্যটি শরণার্থীদের জাতীয়তার পরিবর্তনের বিষয়টি মেলে ধরে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের লিবিয়া বিষয়ক গবেষক হানান সালেহ ইন্ডিপেন্ডেন্টকে বলেন, “আমার জানা মতে দুবাই থেকে ত্রিপলির (লিবিয়ার রাজধানী) কোনো সরাসরি ফ্লাইট নেই। দুবাই থেকে তিউনিস হয়ে আসতে হয়।”

ইতালির সিসিলি ও অ্যাপুলিয়ায় পৌঁছনো বেশ কয়েকজন মানবাধিকারকর্মীদের বলেছেন, ওয়ার্কিং ভিসার জন্য তাদের ৩ থেকে ৪ হাজার ডলার দিয়েছেন ‘এজেন্টকে’।

হানান সালেহ বলেন, “আমার কাছে তথ্য আছে যে লিবিয়ায় বিমান থেকে নামার পরপরেই এই শরণার্থীদের অনেকের কাছ থেকে সব কাগজপত্র নিয়ে তাদের একটি স্লিপ ধরিয়ে দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে তাদের কাছ থেকে আরও অর্থ নেওয়ার পথ তৈরি করে।”

ইতালিতে যেতে নৌকায় ওঠার আগে বাংলাদেশ থেকে দুবাই কিংবা তুরস্ক হয়ে লিবিয়ার মাটিতে নামা বিমানেই হয়।

এজন্য ১০ হাজার ডলারের বেশি অর্থ পাচারকারীদের দিতে হয়েছে বলে ডুবে যাওয়া নৌকা থেকে উদ্ধার বাংলাদেশি কয়েকজন দাতব্য সংস্থা ও মানবাধিকার কর্মীদের জানিয়েছেন। এর মধ্যে ১০ হাজার ডলারের মতো দিতে হয় লিবিয়া পৌঁছানো পর্যন্ত, এরপর নৌপথের জন্য ৭০০ ডলার।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক গবেষক নিকোলাস ম্যাকগিহান ইন্ডিপেন্ডেন্টকে বলেন, ঢাকা থেকে দুবাই পর্যন্ত রুটটিতে অসাধু জনশক্তি রপ্তানিকারকদের দৌরাত্ম্য রয়েছে। তারা (জনশক্তি রপ্তানিকারক) অনেক যুবকের কাছে স্বপ্ন বিক্রি করে, কিন্তু সেই যুবকদের স্বপ্ন বেশিরভাগ সময় খান খান হয়ে যায়।

রেমিটেন্সে আশায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সরকার জনশক্তি রপ্তানিতে এই অনিয়মের বিষয়ে উদাসীন বলে তার মন্তব্য।

ইন্ডিপেন্ডেন্টের ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, উত্তর আফ্রিকা ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে বাংলাদেশি কম ও অদক্ষ শ্রমিকরা ধনী দেশের শ্রমিকদের তুলনায় খুব কম মজুরি ও খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে। চাথাম হাউসের এশিয়া

উল্লেখ্য, ইউরোপ প্রবেশে লিবিয়া হয়ে নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়া শরণার্থী ও অভিবাসীদের জন্য সহজ রুটে পরিণত হয়েছে। তবে এই বিপদসঙ্কুল পথে পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতি বছর মৃত্যু হচ্ছে কয়েক হাজার মানুষের। আইওএম জানিয়েছে, চলতি বছর ৪২ হাজার ৯৭৪ জন মানুষ সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ প্রবেশ করেছে। আর নৌকাডুবিতে প্রাণ হারিয়েছে ১ হাজার ৮৯ জন। গত বছর সাগর পাড়ি দিতে মৃত্যু হয়েছিল ৫ হাজার ৯৮ জনের। এবছর প্রায় ১১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

শেয়ার করুন