চাই জাতীয় পুঁজি বৃদ্ধির সহায়ক বাজেট

1493825540।। মামুন রশীদ ।।
জাতীয় সংসদের জুন অধিবেশনে উপস্থাপিত হবে বাজেট। কেমন হতে যাচ্ছে আসন্ন বাজেট বা কী ধরনের বাজেট দেখতে চাই— এসব প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলার আগে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতকে অভিবাদন জানানো দরকার। কারণ এটি তার হাতে ধরে আসা এগারতম বাজেট। ১৯৮০’র দশকে দুটি বাজেট উপস্থাপন করেন তিনি। এর সঙ্গে চলতি শাসনামলে (২০১৩-১৪ অর্থবছর ধরে) নয়টিসহ মোট এগারটি। বাজেট যদিও শুধুই সরকারের আয়-ব্যয়ের দলিল নয় তথাপি কোনো যুগে, কোনো দেশে শুধু এক অর্থবছরের বাজেটের সাহায্যে ‘অর্থনৈতিক বিপ্লব’ সংঘটিত হয়নি। বাজেটে সৃজনশীলতা ও স্বাতন্ত্র্য দেখানোর সুযোগ ইদানীং আরো কম। এখনকার বাজেটের ৮০ শতাংশই হলো নিয়মিত অনুশীলন; যেগুলো বলা যায় অনেকটা অন্ধভাবে অনুসরণ করতে হয় সব বিকাশমান দেশেই— কিছুটা বাজেট প্রণেতাদের দুর্বলতা আর কিছু বৈদেশিক সাহায্য নির্ভরতার কারণে। বাজেটে উন্নয়ন অংশীদারদের ভূমিকা কেমন থাকবে আগামী অর্থবছরে— সেজন্য বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর বাজেট বক্তৃতা পড়ুন, আশ্চর্য রকম সাদৃশ্য খুঁজে পাবেন।

বিশ্বায়িত বাস্তবতায় নিজেদের বাজেটের ওপর আলো ফেলার আগে বহির্বিশ্বের বাজেট পরিস্থিতি একটু দেখে নেয়া ভালো। তাতে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি মাথায় থাকবে। দেখা যাচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য সামগ্রীর দাম নিম্নমুখী। যদিও অর্থনৈতিক সংকট থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে আরো কিছুদিন লাগবে যুক্তরাষ্ট্রের। এদিকে ইউরোপ ব্রেক্সিট ছাড়াও বহুবিধ সমস্যায় নিমজ্জিত। অবশ্য আমাদের বাণিজ্য পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক বার্তা দেয়। অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত রপ্তানি বেড়েছে ৪ শতাংশ পর্যন্ত, যদিও রেমিটেন্স আসা কমেছে প্রায় ১৭ শতাংশ। কৌতূহলোদ্দীপক চিত্র হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য হ্রাস পাওয়া সত্ত্বেও স্থানীয় বাজারে মূল্যস্ফীতি খুব একটা কমছে না। এর অর্থ, বাইরে থেকে দেখলে যেমন মনে হয় তেমন সুশৃঙ্খলভাবে কার্যকর নয় অভ্যন্তরীণ বাজার। রাজস্ব আহরণে গত অর্থবছরেও গতিশীলতা ছিল। এবার সেটি কিছুটা হোঁচট খেয়েছে। এলসি খোলার যে হাল দেখেছি, তাতে ভরসা খুব একটা পাচ্ছি না। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধিও দীর্ঘদিন ধরে নিম্নপর্যায়ে। শ্রমে উদ্বৃত্ত একটি দেশে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি যেমনটা হওয়ার কথা ছিল, তেমনটা এখানে নেই। এখানে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি যেন থেমে গেছে জিডিপির ২৫ শতাংশের চক্করে; যার ১৯ শতাংশ বেসরকারি ও ৬ শতাংশ সরকারি খাতের অবদান। বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ সম্ভাবনা বিকাশের অন্যতম অন্তরায় রাজনৈতিক সংঘাত-সহিংসতা কিংবা অনিশ্চয়তা। তাই রিজার্ভ বৃদ্ধি পেলেও বিনিয়োগ মন্দা, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ধীরগতি, আমদানি হ্রাস (মূল্যস্ফীতি কমাতে এর সাফল্যের কথা মাথায় রেখেই বলছি) প্রভৃতি সমস্যায় দেশের বর্তমান পরিস্থিতি যেভাবে চলছে তাতে আসন্ন বাজেট নিয়ে খুব উচ্চাভিলাষী হওয়ার সুযোগ কমই। এক্ষেত্রে কিছু বিষয় ইতিবাচক তাতে সন্দেহ নেই। কথা হলো উন্নতিই যার লক্ষ্য তার তো নিশানা থাকা উচিত দুর্বলতার স্বরূপ উন্মোচন ও অপসারণে।

মূল্যস্ফীতি বাড়লেও নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের এখনও নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। নিকট অতীতে যখন মারাত্মকভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়া শুরু করল, সঠিকভাবেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শরণাপন্ন হন সচেতনরা। তারা চাইছিলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিক এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে হাতে থাকা সকল অস্ত্র প্রয়োগ করুক। এ আবেদনে যথাযথভাবেই সাড়া দিয়েছে তারা। সমস্যা হলো, প্রয়োগবিধিতে অসতর্কতার জন্যই হয়তো কিছু অস্ত্র ফিরে এসেছে বুমেরাং হয়ে। এতে বেড়ে গেছে সুদের হার, ভুল বার্তা পেয়েছে পুঁজিবাজার। মড়ার ওপর খাড়ার ঘা-টা গিয়ে পড়েছে ঐসব সত্ ব্যবসায়ীর ওপর যারা এমনিতেই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছিলেন। স্নাতক পর্বে আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতি পড়াতে গিয়ে বলা হয়েছিল, পুঁজিবাজারে তারল্যের জোগানদাতা হিসেবে বড় ভূমিকা রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। লেখক পশ্চিমা বলেই হয়তো বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা তার জানা ছিল না। থাকলে আত্মবিশ্বাসের সুরে এমন কথা বলতে পারতেন না, বললেও নিদেনপক্ষে দুবার ভাবতে হতো। যাহোক এরই মধ্যে ব্যাংকিং খাতে তারল্য পরিস্থিতির বেশ উন্নতি হয়েছে। তবে এটি যে ‘হলমার্ক’, ‘বিসমিল্লাহ’ বা ‘বেসিক ব্যাংক’ কেলেঙ্কারি দ্বারা আর্থিক ও অনার্থিক উভয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ খলনায়কদের অপকর্মের খেসারত দিতে হচ্ছে অন্য ব্যবসায়ীদের। তারা ব্যাংকে গেলেই ব্যাংকাররা অন্য দৃষ্টিতে তাকান তাদের দিকে; ঋণ দিলেও কিছু ক্ষেত্রে আগের উষ্ণ সম্পর্ক নেই। তাদের আরো বিপদ হলো, ব্যবসায় পরিচালন খরচ বেড়েছে এরই মধ্যে। পুঁজিবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও রয়েছেন এক ধরনের বিভ্রান্তির মধ্যে। ফলে এ বাজারে যতটুকু আছে তাও সবসময় বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নিতে পারছে না। এছাড়া আরো একটি বিষয় রয়েছে, আমাদের প্রাক্কলিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস প্রায় ০.৬০ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক বলছে— চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। কারো কারো ধারণা, অতিকায় হস্তিসদৃশ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে এক ধরনের সন্তুষ্টি রয়েছে সরকারের মাঝে। তবে রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনার অন্যান্য দিক চিন্তা করলে এ অর্জন নিয়ে উল্লসিত হওয়ার কিছু নেই। আমি বলব, বিদ্যুত্ উত্পাদন পরিস্থিতি বেশ কিছুটা সামলাতে পেরেছে বর্তমান সরকার; অবশ্য সাময়িকভাবে। একটি ভাবনা মাঝে-মধ্যে ঘুরপাক খায়। ধরুন, হঠাত্ সিংহভাগ বিদ্যুত্ উত্পাদনকারী (আইপিপি, রেন্টাল প্রভৃতি) মিলে সিদ্ধান্ত নিলো, তারা আর এ ব্যবসা করবে না। তখন কী অবস্থা দাঁড়াবে আমাদের বিদ্যুত্ পরিস্থিতির? এও তো খতিয়ে দেখা দরকার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায় অতিরিক্ত বিদ্যুত্ উত্পাদন জাতীয় ব্যালেন্সশিটে কী পরিমাণ বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশের কৃষিখাত। ভুল বুঝবেন না কেবল নিন্দা করছি। সবকিছু সত্ত্বেও তাই বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন— আমাদের কৃষির অগ্রগতি সরলরৈখিক নয় তো? শুধুই বোরো-আলু উত্পাদন বাড়াচ্ছি না তো আমরা? এক্ষেত্রে গুণগত ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্জন আসলে কতটুকু? কৃষিপণ্যের মূল্য পরিস্থিতি কেমন এখানে? ভোক্তারা কততে কিনছেন? কেমন দাম পাচ্ছেন কৃষক? রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কী হাল? এর অধিকাংশই নাকি ঋণভারে জর্জরিত অথবা দেউলিয়া হওয়ার পথে। আফসোস হয়, সেভাবে নজর দেয়াই গেলো না বলে রাজনৈতিক দলবাজদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে এগুলো।

দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য পদ্মা সেতু হওয়াটা জরুরি। সেজন্য আসন্ন অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) এর জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ থাকবে স্বভাবতই। প্রশ্ন হলো, এ বাড়তি বরাদ্দ দেয়া হবে কোত্থেকে? এটি কি অন্য কর্মসূচি ছেঁটে দেয়া হবে, নাকি সরকার ধরেই নিয়েছে, তারা পুরোপুরিভাবে টাকা ব্যয় করতে পারবেন না? উল্টো আরো কিছু জিজ্ঞাসা আছে। পদ্মা সেতু বা সমপর্যায়ের ব্যয়ের জন্য বিদ্যুত্ খাত থেকে বরাদ্দ কমাবেন? সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কি তা সহ্য করবে? যদি কৃষিখাত থেকে চাওয়া হয়? কৃষিমন্ত্রী এ ছাড় দিতে রাজি হবেন বলে মনে হয় না। শিক্ষামন্ত্রী ভদ্রলোক; তাই মুখ ফুটে হয়তো কিছু বলেন না উনি। কিন্তু তারও তো বাড়তি বরাদ্দ প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান শিক্ষায় উত্সাহিতকরণ, মাদ্রাসা ব্যবস্থাকে মূলধারায় ফেরানো প্রভৃতি কর্ম সম্পাদনের জন্যও তো বরাদ্দ বৃদ্ধি দরকার তার। আছে জেলা বাজেট ইস্যুও। এত বছরে একটিমাত্র জেলায় গেছে জেলা বাজেট। অথচ স্থানীয় পর্যায়ে আর্থিক ব্যবস্থাপনা মজবুত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য এটি প্রয়োজন বৈকি। এরই মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি খাত চালকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে বললে ভুল হবে না নিশ্চয়ই। এদিকে সরকারি উদ্যোগে বাড়ছে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ, রাজনীতিতে বাড়ছে মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা। বেসামরিক প্রশাসনের তেজ কিছু ক্ষেত্রে ম্রিয়মাণ। এসব দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না, জাতীয় পুঁজি গঠনের ওপর ফোকাস সরে গেছে বাংলাদেশের। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আর কোনো দ্বন্দ্ব নয়। আমাদের এমন পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, যাতে সরকারি বিনিয়োগ অনুপ্রেরণা পেয়ে আরো বিকশিত হয় বেসরকারি খাত; সৃষ্টি করে কর্মসংস্থান। সরকারি খাত আরো শক্তিশালীকরণের দুর্ভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে নীতিনির্ধারকদের। বরং এখন ভাবা উচিত, বেসরকারি খাতকে কীভাবে টেকসই ও লাভবান করে তোলা যায়; কীভাবে বেসরকারি খাতের উন্নয়নে ক্রমাগতভাবে যোগ করা যায় অধিক সংখ্যক মানুষকে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি খাতকে অধিক দৃষ্টি দিতে হবে দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে; নিজের আকার বৃদ্ধির প্রতি নয়।

কাঙ্ক্ষিত হারে প্রবৃদ্ধি নিশ্চিতকরণের জন্য বেসরকারি খাতের ওপর প্রত্যক্ষ নির্ভরশীলতা যেমন অপরিহার্য, তেমনি উন্নয়নের সুফল তথা বণ্টনমূলক ন্যায্যতা ক্রমে দেশের সব মানুষের দোরে পৌঁছে দিতে সরকারি খাতে দক্ষতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোরও বিকল্প নেই। বাজেট শুধু সামাজিক সুরক্ষা বৃদ্ধি নয়, জাতীয় পুঁজির সংবর্ধনেও অধিকতরভাবে কাজ করুক।

লেখক :অর্থনীতি বিশ্লেষক

-দৈনিক ইত্তেফাক-এর উপ সম্পাদকীয়তে প্রকাশিত

শেয়ার করুন