অকাল বন্যায় হাওরাঞ্চলে ১১লক্ষ ৩৪ হাজার ৬০০ পরিবার ক্ষতির শিকার

unnamedসিলেটের সকাল ডেস্ক ।। সাম্প্রতিক অকাল বন্যায় হাওরাঞ্চলে ১১ লক্ষ ৩৪ হাজার ৬০০ পরিবার ক্ষতির শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা।  রোববার ঢাকার রিপোটার্স ইউনিটিতে ‘হাওরে ফসলহানিতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমান ও হাওর সমস্যার সমাধানে সুপারিশ’ বিষয়ে সাংবাদিক সম্মেলন এতথ্য জানিয়েছেন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা।

লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘হাওর ঘুরে ,তাদের সংস্থার সদস্য ও প্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী সাম্প্রতিক অকাল বন্যায় হাওরাঞ্চলের সাতটি জেলায গড়ে ৭৫ ভাগ হাওরের বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। হাওরের ৭টি জেলায় মোট ১১লক্ষ ৩৪হাজার ৬০০ পরিবার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। সবচেয়ে বেশী ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে সুনামগঞ্জ জেলা।

এই জেলায় প্রায় ৯৮ ভাগ ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এ বছর সুনামগঞ্জে ২ লক্ষ ২৩ হাজার ৮৭ হেক্টর জমিতে বোরো ফসল চাষ হয়। তন্মধ্যে প্রায় ২ লক্ষ ১৮ হাজার হেক্টর জমির ফসল অকাল বন্যায় তলিয়ে যায়। যা থেকে প্রায় ৯ লক্ষ টন ধান পাওয়া যেত। সাতটি জেলায় এবছর মোট ২২ লক্ষ টন ধান হারালো হাওরের কৃষক।

সমগ্র হাওরাঞ্চলে দুই হাজার টন মাছ মারা যায়। প্রায় এক হাজার টন সব্জির ক্ষতি হয়। প্রায় ৩০ হাজার হাঁস মারা গেছে। এতে মোট ১৩ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে আমরা মনে করি। মাছের মড়কে অনেক বিলুপ্ত প্রজাতির মাছ বিলীন হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। যা প্রকৃতি ও পরিবেশের এক অপূরণীয় ক্ষতি।

পানিতে ধান তলিয়ে যাবার পর অনেকেই উপার্জনের বিকল্প হিসেবে মাছ শিকার করতেন, কিন্তু আকস্মিক দেখা দিল মাছের মড়ক এতে উপার্জনের বিকল্প পথটাও বন্ধ হয়ে গেল। মড়কে ডিমসহ মা মাছ মারা যাওয়ায় মাছের পরিমান ও প্রজাতি নষ্ঠ হতে পারে। অনেক মাছ মারা যাওয়ায় আগামী কয়েক বছর মাছের সংকট দেখা দিতে পারে। হাওরে কিছু বিলুপ্ত প্রায় মাছ রয়েছে। এসব মাছ মারা গেলে অনেক প্রজাতি ধ্বংস হয়ে যায়। কমে যাবে জীববৈচিত্র্য।

এর প্রভাব বছরের আগামী মাসগুলোতে গভীর থেকে গভীরতর হবে। বাচাঁর তাগিদে হাওরের দরিদ্র কৃষকরা আজ ভিটা বাড়ি ফেলে শহরমূখী হচ্ছেন। তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজোয়ানা হাসান, এ এল আরডির প্রধান ননির্বাহী শামসুল হুদা, সংস্থার সাধারণ সম্পাদক পিযুষ পূরকায়স্থ টিটু।

বক্তারা বলেন, হাওরবাসী আজ স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগের সম্মুখীন। দেশের মোট জনসংখ্যার আট ভাগের এক ভাগ বসবাস করেন হাওরাঞ্চলে। এই হাওরাঞ্চলের অর্ধেকের বেশি মানুষের উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন বোরো ফসল বানের পানিতে তলিয়ে গেছে। একের পর এক হাওরের ফসল যখন তলিয়ে যাচ্ছে ঠিক তখনই ‘মরার উপর খরার ঘা’ হয়ে দেখা দিল মাছের মড়ক। উপার্জনের দ্বিতীয় যে উপায়টি দরিদ্র হাওরবাসীর সামনে খোলা ছিল তা-ও বন্ধ হয়ে গেল। হাওরাঞ্চল ফসলহানিত হয়েছে অনেকবার।

এবার যখন বন্যা এলো তখন ধান গাছে ধান আসেনি। তাই যে হাওর তলিয়ে গেছে সেই-হাওরে থেকে কোনো ধানই আর সংগ্রহ করা যায়নি, তাই এই ফসলহানীর প্রভাব খুব বেশী। গত বছরও ৬০ ভাগ হাওরে ফসল তলিয়ে গিয়েছিল। তাই এবছর কৃষকদের ঋণ করে ফসল ফলাতে হয়েছে। এদের কেউ কেউ আগের বছরও ঋণ করেছিলেন। সেই ঋণও এখনও পরিশোধ হয়নি। এই ঋণের বড় অংশই গ্রাম্য মহাজন, দোকানদারসহ নানা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত থেকে নেওয়া। বারবার এসব ঋণ পরিশোধ না হওয়া এবং অর্থেও অভাবের ফলে সমাজে হানাহানি ও বিশৃঙ্খলা বেড়ে যাবে। অভাবের তাড়নায় বেড়ে যাবে চুরি- ডাকাতির ঘটনাও। সর্বোপরি এই ফসলহানীর ফলে হাওরাঞ্চলে বিরাজ করছে এক মানবিক বিপর্যয়।

শেয়ার করুন