হাত চেপে শেষ বিদায় জানিয়েছিলেন

লুৎফর রহমানঃ45057_amirসাংবাদিক-আইনজীবী। দুই পরিচয়েই তিনি ছিলেন সফল। সংবাদকর্মী হিসেবে প্রথম পরিচয় অ্যাডভোকেট আমির হোসেনের সঙ্গে। আমার এক চাচার সহকর্মী। প্রবাসী আরেক চাচার বন্ধু। তিনিও ছিলেন আমার প্রিয় চাচা। সন্তানতুল্য স্নেহে কথা বলতেন। সহকর্মীর পরিচয়টি কখনও মুখ্য হয়নি তার সঙ্গে। ২০০৯ সালে একট ঘটনার সংবাদ সংগ্রহে হবিগঞ্জে ছিলাম কয়েকদিন। নিজ জেলায় নিয়মিত যাওয়া-আসা হলেও জেলা শহরে এভাবে কয়েক দিন থাকা হয়নি এর আগে। সহকর্মী হিসেবে আমির হোসেন পুরো সময়টাই থেকেছেন আমার সঙ্গে। বাসায় খাওয়া দাওয়া, বিভিন্ন স্পটে ঘোরাঘুরি। যেখানে যেতে চেয়েছি সেখানে নিয়ে গেছেন। কিন্তু খবরের জন্য তার কোনো মতামত নেই। কেবলই বলেছেন, যে তথ্য মিলবে তার ওপর ভিত্তি করেই রিপোর্ট হবে। সেরকম রিপোর্টও হয়েছিল। রিপোর্টগুলো বেশ আলোচিতও হয়েছিল হবিগঞ্জে। পরে আমাদের অনুমতি নিয়ে স্থানীয় কয়েকটি কাগজ তা পুনঃমুদ্রণ করে। আমির হোসেনের সঙ্গে এর পর থেকে নিয়মিতই যোগাযোগ ছিল। প্রায়ই কথা হতো পেশাগত বা পারিবারিক বিষয়ে। পেশাগত বিষয়ে আলোচনার সময় অনেকটা শিশুসুলভ সারল্য নিয়েই তিনি কথা বলতেন। আমার বয়সের সমান সাংবাদিকতার ক্যারিয়ারের এই মানুষটি কখনও নিজের অবস্থানের দিকে চিন্তা করতেন না। পুরোদস্তুর একজন পেশাদার সাংবাদিকদের যে গুণ থাকার কথা মফস্বলে থেকেও তা অর্জন করেছিলেন তিনি। কোন খবরের বিষয়ে আপডেট জানতে চাইলে বা কোনো খবরের বিস্তারিত পাঠানোর অনুরোধ করলে নিঃসংকোচে তিনি তা করতেন। বিষয়টি তাৎক্ষণিক অবগত না হলে সময় নিয়ে তার বিস্তারিত জানাতেন। কোনো খবর পাঠিয়ে তিনি প্রকাশের জন্য কোনো দিন অনুরোধ করতেন না। বরং মাঝে মাঝে কোন খবর পাঠিয়ে বলতেন এটি প্রকাশ হলে পত্রিকার জন্য ভাল হবে। আবার কখনও বলতেন আর ১০টা কাগজ বা অনলাইন যে খবরটি ছেপেছে তা সত্য নয়, অনুসন্ধান করে তিনি সত্য খবরটি পাঠিয়েছেন।
পক্ষ বা বিপক্ষ সাংবাদিকতায় বিশ্বাস করতেন না তিনি। এ কারণে জেলার সব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ছিল তার সমান সম্পর্ক। সবাই তাকে শ্রদ্ধা করতেন অভিভাবকতুল্য হিসেবে। জেলা প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে তিনি প্রেস ক্লাবের প্রত্যেক সদস্যকে আগলে রেখেছেন পরিবারের সদস্য হিসেবে। নানা সময়ে সংবাদকর্মীদের মধ্যে নানা বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে তিনি হয়ে উঠতেন সমঝোতার দূত। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রেস ক্লাবের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন, ছিলেন ক্লাবের সর্বজন শ্রদ্ধেয় সদস্য। তিনি নিজের মতোই ভালবাসতেন প্রিয় পেশাকে। ভালবাসতেন সহকর্মীদের। পেশা আর সহকর্মীদের প্রতি তার শ্রদ্ধাও ছিল একই রকম। বয়স, যোগ্যতার ধার ধারেননি কখনও। একজন নবীন সহকর্মীর সঙ্গেও তার ব্যবহার ছিল অমায়িক, একান্তই পেশাদারিত্বের। ভালবাসার।
এডভোকেট আমির হোসেন চাচার সঙ্গে সর্বশেষ জেলা বারের ছোট এক অনুষ্ঠানে কিছু সময় কাটিয়েছিলাম। আমার চাচাতো ভাই বার এ্যাট ল করে দেশে ফিরেছেন। বন্ধুর ছেলে হিসেবে নিজের সন্তানের মতোই ভালবাসতেন তিনি। তার হবিগঞ্জ যাওয়ার খবর পেয়ে আমীর হোসেন চাচা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। জানান, জেলা বারে ব্যারিস্টার তালহা আহমেদকে পরিচয় করিয়ে দেবেন অন্য সদস্যের সঙ্গে। সেই অনুযায়ী বারে গিয়ে তো অবাক। রীতিমতো এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। জেলা বারের সিনিয়র আইনজীবীদের প্রায় সবাই উপস্থিত। সবাই ব্যারিস্টার তালহাকে অভিনন্দন জানালেন। পরামর্শ দিলেন। একজন আইন নবিশের জন্য, বন্ধুর সন্তানের জন্য এমন ভালবাসা দেখে আমি নিজেও অভিভূত হয়েছিলাম সেদিন।
আমির হোসেন চাচা চিকিৎসার জন্য প্রায়ই ঢাকা আসতেন। আসলেই ফোনে কথা বলতেন। চিকিৎসার বিস্তারিত জানাতেন। সম্ভব হলে অফিসে আসতেন। এবার ঢাকার আসার আগে তার সঙ্গে কথা হয়নি। তার হাসপাতালে ভর্তির খবরটি দিয়েছিলেন সহকর্মী আবুল ভাই। তাকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলাম রাতের কাজ শেষে। তখন প্রায় ১১টা। ক্যাবিনে শুয়ে ছিলেন। আলো কম। দরজায় দাঁড়িয়ে দেখছিলাম তাকে। আমীর হোসেন চাচার ভাইয়ের ছেলে জাকিরের সঙ্গে কথা বলছিলাম নিচু স্বরে। এর মধ্যে তিনি নিজের সঙ্গে কি যেন বলছিলেন। এপাশ-ওপাশ করছিলেন। জাকির কানের কাছে মুখ নিয়ে আমার কথা বলতেই তিনি বললেন, লাইট জ্বালাও। আমাকে বসতে বললেন। আমি না বসে পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। তিনি নিজেই কথা বলতে শুরু করলেন। অসুস্থ হওয়ার বর্ণনা দিলেন। বললেন, আল্লাহ হয়তো বাঁচিয়ে দিয়েছেন। ডাক্তার বলেছে, আজ দেখে কোন সমস্যা না হলে কাল বাসায় পাঠিয়ে দেবে। তিনি এও বললেন, তুমি আমাকে দেখতে আসবে এই অপেক্ষায় ছিলাম। ঘুমের সময় বলে আমি খুব বেশি কথা বলিনি। পরে আসবো বলে বিদায় নিতে চাইলাম। তখন মতি ভাইয়ের (মানবজমিন প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী) খবর নিয়ে অনেকটা আনমনা হয়ে গেলেন। বললেন, আগের বার আমি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলাম। মতি ভাই এসে শিশুর মতো আমার পাশে বসেছিলেন। দীর্ঘ সময় বসেছিলেন। বুঝলাম মতি ভাই বিদেশে বলে তাকে খুব মনে করছেন আমির হোসেন চাচা। আমি তার হাত ধরে বিদায় নেয়ার সময় তিনি আমার হাতটি অনেকক্ষণ চেপে ধরেছিলেন। কে জানতো চাচা আমাকে হাত চেপেই শেষ বিদায় জানিয়ে দিয়েছিলেন। তার মৃত্যুর সংবাদটি প্রথমে আমাকে ঘোরে ফেলে দিয়েছিল। যে মানুষটি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি আর নেই। বিশ্বাস হচ্ছিল না। তার অসুস্থ হওয়ার খবরটি প্রথম দিয়েছিলেন সহকর্মী আবুল ভাই। মৃত্যুর সংবাদটিও তিনিই প্রথম দেন। আবুল ভাই এক সময় মফস্বল বিভাগে কাজ করতেন। সেই থেকে এডভোকেট আমীর হোসেনের সঙ্গে তার পরিবারের সঙ্গে হৃদ্যতা। আমির হোসেন চাচা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকে সার্বক্ষণিক খবর রাখছিলেন আবুল ভাই। মৃত্যুর সংবাদ শুনে সময় না নিয়ে হাসপাতালে ছুটে যাই। পরিবারের সদস্যদের আহাজারি। তিনি আর নেই কেউ মানতে পারছেন না তা। একজন অভিভাবক হারানোর কষ্টে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। সামনে ভেসে উঠে একের পর এক স্মৃতি, একজন অভিভাবক, একজন সহকর্মী, একজন পিতৃতুল্য নিরহংকার মানুষের সরল হাসিমাখা মুখখানা। (সংকলিত, দৈনিক মানবজমিন)

শেয়ার করুন