বাউলসম্রাট করিমের জন্মশতবর্ষে বছরব্যাপী আয়োজন

শাহ আব্দুল করিমনোমান বিন আরমান : কালজয়ী গান ‘গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান/ মিলিয়া বাউলা গান আর মুরশিদি গাইতাম’, ‘বসন্ত বাতাসে সই’, ‘বন্দে মায়া লাগাইছে, পিরিতি শিখাইছে’, ‘গাড়ি চলে না’, ‘আমি কূলহারা কলঙ্কিন ‘, ‘কেমনে ভুলিবো আমি বাঁচি না তারে ছাড়া’ ‘কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু’ এমন হাজারো হৃদয়স্পর্শী জনপ্রিয় বাউল গান ও গণসংগীতের রচয়িতা একুশে পদকপ্রাপ্ত বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিম। আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি তাঁর জন্মের শতবর্ষ। এ উপলক্ষে বছরব্যাপী অনুষ্ঠানমালা আয়োজন করেছে শাহ আবদুল করিম জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন জাতীয় কমিটি। উৎসব উপলক্ষে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে সভাপতি করে ১০২ সদস্যের জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে থাকছেন আরও দুই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও দেশের বিশিষ্টজনেরা। কমিটিতে উপদেষ্টা হিসেবে আছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান, সাবেক তত্ত্ব্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল ও সংগীতজ্ঞ সুজেয় শ্যাম।

এসব তথ্য নিশ্চিত করে কমিটির আহ্বায়ক সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ জানান, আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় একটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুরু হবে এ উৎসব। এর পরের দিন ১৭ থেকে ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সিলেটে অনুষ্ঠিত প্রথম উৎসব। এরপর থেকে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় এ উৎসব হবে। শাহ আবদুল করিম জন্মশতবর্ষের শুধু দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে না। সাধকের মহাবাণী বিশ্বময় ছড়িয়ে দেশের বাইরের বিভিন্ন স্থানেও উৎসবের আয়োজন করা হবে। প্রাথমিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান ও কলকাতা, আসামের শিলচর ও করিমগঞ্জে উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। ২০১৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় বড় ধরনের সমাপনী উৎসবের আয়োজনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে বছরব্যাপী অনুষ্ঠানমালা।

বাউল গানের কিংবদন্তী শাহ আবদুল করিম (জন্ম ১৬ ফ্রেব্রুয়ারি ১৯১৬, মৃত্যু ১২ সেপ্টেম্বর ২০০৯) সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।  দারিদ্র ও জীবন সংগ্রামের মাঝে বড় হওয়া বাউল শাহ আবদুল করিমের সঙ্গীত সাধনার শুরু ছেলেবেলা থেকেই। বাউল সম্রাটের প্রেরণা তার স্ত্রী আফতাবুন্নেসা। তিনি তাকে আদর করে ডাকতেন ‘সরলা’।

ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবনের সুখ প্রেম-ভালোবাসার পাশাপাশি তার গান কথা বলে সকল অন্যায়, অবিচার, কুসংস্কার আর সাম্প্রদায়িকতার বিরূদ্ধে। তিনি তার গানের অনুপ্রেরনা পেয়েছেন প্রখ্যাত বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ, পঞ্জু শাহ, এবং দুদ্দু শাহ’র দর্শন থেকে। দারিদ্রতা তাকে বাধ্য করে কৃষিকাজে তার শ্রম ব্যায় করতে। কিন্তু কোন কিছু তাকে গান সৃষ্টি করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তিনি আধ্যাত্নিক ও বাউল গানের দীক্ষা লাভ করেছেন কামাল উদ্দিন, সাধক রশীদ উদ্দিন, শাহ ইব্রাহিম মাস্তান বকশ  এর কাছ থেকে। তিনি শরীয়তী, মারফতি, নবুয়ত, বেলায়াতসহ সবধরনের বাউল গান এবং গানের অন্যান্য শাখার চর্চাও করেছেন।

কালনীর তীরে বেড়ে উঠা শাহ আব্দুল করিমের গান ভাটি অঞ্চলে জনপ্রিয় হলেও শহরের মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পায় মাত্র কয়েক বছর আগে। এখন তার সৃষ্টি দেশ ও সময়ের সীমা অতিক্রম করে পেয়েছে বিশ্বজনীন প্রীতি। হয়েছে কালোত্তীর্ণ।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবঞ্চিত বাউল শাহ আব্দুল করিম প্রায় দেড় সহস্রাধিক গান লিখেছেন এবং সুরারোপ করেছেন। বাংলা একাডেমী  তাঁর ১০টি গান ইংরেজিতে অনূদিত করে প্রচার করেছে। ২০০১ সালে তিনি লাভ করেন ‘একুশে পদক’। এছাড়া দ্বিতীয় টিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে এই বাউল সম্রাটকে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। ২০০০ সালে কথা সাহিত্যিক আবদুর রউফ চৌধুরি পদকসহ বিভিন্ন সম্মানে তাঁকে ভূষিত করা হয়েছে।

শেয়ার করুন