নতুন বছরের প্রতিটি সকাল হোক শান্তির আলোয় ভরপুর

SHAHID4H_1367289797_1-943368_448435815245050_856929735_nমো. মাহমুদুর রহমান :
ক্যালেন্ডারের পাতায় ২০১৫ সালের কোনো তারিখ আর খুঁজতে হবে না। তারিখগুলো এখন সবার কাছে স্মৃতি। তবে হ্যাঁ, স্মৃতির নুড়িপাথরের কোনো কোনোটি জ্বল জ্বল করবে তারার মতো। আবার কোনো কোনোটির আঘাত মনে থাকবে অনেকদিন। প্রত্যেকেই ব্যক্তি জীবনে অনেককিছু যেমন পেয়েছি বিগত সালে, তেমনি কেউ কিছু হারাইনি তাও নয়। অর্জন বিসর্জন, আনন্দ বেদনা, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের মিশ্র অনুভূতি নিয়ে বিগত বছর অতিবাহিত হয়েছে। তবু প্রত্যাশা, শুধুই আনন্দ আর স্বপ্ন পূরণের বছর হবে ২০১৬ সাল। এ প্রত্যাশা প্রাপ্তিতে রূপান্তরিত করতে চাই আত্মসমালোচনা। পেছনে নির্মোহভাবে ফিরে তাকানো। ব্যক্তি সমাজ বা রাষ্ট্র, সবার ক্ষেত্রেই বিষয়টি সমভাবে প্রযোজ্য।
আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে গত বছর সবচেয়ে আলোচিত নাম ছিল আইএস। সিরিয়া ও ইরাকভিত্তিক জঙ্গি সংগঠনটি নিয়ে আলোচনা সমালোচনার শেষ ছিল না। পশ্চিমা বিশ্ব আইএস কে মুসলিম জঙ্গি সংগঠন হিসেবে চেনে। কারণ তারা সবাই নিজেদের মুসলমান দাবি করে। বিশ্বব্যাপী ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠা তাদের স্বপ্ন হিসেবে প্রচার করে। কিন্তু বেশিরভাগ মুসলমানরা এদেরকে ইসরাইল সৃষ্ট ইহুদি স্বার্থের পক্ষ শক্তি হিসেবে মনে করে। এদের কাজ বিশ্বব্যাপি ইসলামোফোবিয়া বৃদ্ধিতে সহায়ক হচ্ছে। বেসামরিক মানুষ তাদের হামলার শিকার হয়ে প্রাণ দিচ্ছে। বন্দিদের শিরোচ্ছেদ করছে। যৌন জিহাদ নামে ইসলামি বিশ্বাসের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক এক অদ্ভূত বিষয় তারা সংযুক্ত করছে। আইএস দমনের নামেও নিরীহ মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। এক পক্ষের উগ্রতা অপরপক্ষের উগ্রতাকে উসকে দিচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে রিপাবলিকান দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী ডোনাল্ড ট্রাম্প মুসলমানদেরকে আমেরিকায় নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছেন। মূলধরার একজন রাজনীতিকের এরকম সাম্প্রদায়িক বক্তব্য ভবিষ্যত বিশ্বের শান্তির জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে। আইএস উসকে দেবে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প‘দেরকে আবার ওরা তাদের বক্তব্যে আইএসকে শক্তিশালী করবে। ২০১৬ সালের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এ দুষ্টচক্র ভেদ করে বিশ্বকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
প্রতিবেশি ভারতেও চরমপন্থিদের আস্ফালন শুরু হয়েছে। পুরো ২০১৫ সাল ভারতের আরএসএস শিবসেনাসহ কট্টর হিন্দুদের কাছে ভারতের মুসলমানদের চেয়ে গরু অধিক মর্যাদাবান ছিল। গরুর জন্য মানুষের জীবনহানি ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। অবশ্য ভারতের বিবেকবান মানুষ এর বিরুদ্ধে সোচ্চার। এখন দেখার বিষয় ২০১৬ সালে গরুর চেয়ে মানুষের জীবন বেশি গুরুত্ব পায় কী-না!
বাংলাদেশ ২০১৫ সালকে বরণ করেছিল প্রচন্ড ঘুর্ণিঝড়ের সম্ভাবনা সামনে নিয়ে। ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচনের বর্ষপূর্তিতে ৫ জানুয়ারি থেকে টানা ৯২ দিনের নজিরবিহীন হরতাল-অবরোধ সত্বেও সরকারের পতন হয়নি। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারকে টলাতে ব্যর্থ হয়। এই অবরোধকে সফল ও ব্যর্থ করতে দুই পক্ষের তৎপরতায় জনজীবনে মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসে। একদিকে যানবাহনে পেট্রোলবোমায় দগ্ধ হওয়া মানুষের আহাজারি। অন্যদিকে গুম হওয়া মানুষের স্বজনের কান্না। বিষাক্ত রাজনীতির বিভীষিকাময় স্মৃতি ভুলতে অনেকদিন লাগবে এদেশের মানুষের। র‌্যাব-পুলিশের বুলেটের সামনে বিরোধীদলের কোনো আন্দোলনই সফল হয়নি। যদিও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ভ্যাট বিরোধি আন্দোলন সফল হয়েছিল। গনতন্ত্রের নির্বাসন ও সুশাসনের অভাব সচেতন মানুষকে ব্যথিত করলেও জঙ্গী তৎপরতা সবচেয়ে বিচলিত করেছে। ব্লগার ও বিদেশী নাগরিকদের হত্যার মাধ্যমে উগ্রপন্থীদের সক্রিয় উপস্থিতি শান্তির জন্য হুমকি হিসেবে সামনে এসেছে। এভাবে বিভিন্ন অপশক্তি ও সমস্যার জঞ্জাল দেশের সম্ভাবনার আকাশকে কালো মেঘে ঢেকে দিচ্ছে।
তবে এতকিছুর পরও অনেক পুরনো সমস্যারও সমাধান হয়েছে। ছিটমহলবাসির দীর্ঘ বঞ্চনার অবসান হয় ২০১৫ সালে। মানবিক এ সমস্যাটি সমাধানে সরকারের উদ্যোগ ও দেরিতে হলেও ভারতের সাড়া প্রশংসার দাবি রাখে। অনেক আলোচনা সমালোচনার পর অবশেষে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের অভিযোগ ও তহবিল প্রত্যাহারের পর আদৌ পদ্মা সেতু হবে কি-না তা নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরী হয়েছিল। আজ সব সন্দেহের কুয়াশা কাটিয়ে পদ্মা সেতুর কাজের অগ্রগতি দিনের আলোর মতো পরিষ্কার।
পৃথিবি এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অশান্তি ও অস্থিরতাকে সঙ্গী করে নিয়ে যাচ্ছে। যদিও সারা দুনিয়ার মানুষ উন্নয়নের সঙ্গী হিসেবে শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে পছন্দ করে। কিন্তু বাস্তবে তা পায়না চিন্তা ও কর্মের বৈপরীত্যের কারণে। মানুষ নিজের জন্য যা ভালো মনে করে তা অন্যের জন্য মনে করেনা। নিজে যা পেতে চায় অন্যকে তা দিতে চায় না। মানুষের প্রতারণা, স্বার্থপরতা ও ভন্ডামি আজকের বাংলাদেশসহ সমস্ত বিশ্বের সমস্যা।
মুখে গনতন্ত্র অন্তরে বটবৃক্ষের মতো স্বৈরাচারের ভুত। কন্ঠে ধর্মের শান্তির বাণী অথচ কর্মে সহিংসতা। মানবাধিকারের পক্ষে মুখে জপ। বাস্তবে জাতিয়তাবাদ, ধর্মনিরেপক্ষ মতবাদ কিংবা সমাজতন্ত্রের নামে অন্যের ওপর আধিপত্য বিস্তারের মতলব। মানুষের ঐক্যের বদলে জাতি, ধর্ম ও রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে প্রচন্ড বিভাজন। ভালোবাসার পরিবর্তে হিংসার চাষবাস। আইলান কুর্দির সাগরতীরে পড়ে থাকা মৃতদেহ যদিও সজোরে বিবেকের দরজায় ধাক্কা দিয়ে মানবতাকে জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু প্যারিস হামলা ও ক্যালিফোর্নিয়ায় বন্দুক হামলার পর তা আবার হারিয়ে গেছে।
মজার বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশের কিছু মানুষ নেপাল হিন্দুরাষ্ট্র থেকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত হলে খুশী হয়। ভারতে গরু জবাই নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করে। ইউরোপ-আমেরিকার উদার গনতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার সুবিধা ভোগ করে। কিন্তু বাংলাদেশকে ধর্মীয় রাষ্ট্র বানাতে চায়!
অন্যরা মুখে যাই বলুক না কেন বাস্তবে প্রতিপক্ষকে নির্মূলের ফ্যাসিস্ট রাজনীতি চর্চা ছাড়া অন্য কিছুতে খুব একটা আগ্রহী বলে মনে হয় না। পুরো ২০১৫ সাল এরকম বৈপরিত্যের মধ্যে অতিবাহিত করে বাংলাদেশ।
২০১৫ সালের পহেলা জানুয়ারিতে একটি পত্রিকার শিরোণাম ছিল ‘কঠিন সময়ে রাজনীতি‘ (যুগান্তর-১ জানুয়ারি-২০১৫)। সারাদেশে ৩০ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনের ওপর ভিত্তি করে একই পত্রিকায় বছরের শেষ দিন ৩১ ডিসেম্বরে শিরোণাম ছিল ‘প্রশ্নবিদ্ধ ভোট: ইসির ভরাডুবি‘। সময়ের হিসাবে আমরা এক বছর অতিবাহিত করলেও রাজনৈতিক অবস্থার মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি। বাহ্যত দেখা যাচ্ছে সরকারের শক্তি আরও সংহত হয়েছে। বিরোধি জোটের শক্তি খর্ব হয়েছে। ২০১৫ সালের শুরুতে বিরোধিদের আন্দোলনের যে ক্ষমতা ছিল ২০১৬ তে তা আর নেই বলেই মনে হয়। তবুও রাজনীতিতে এক অদ্ভুত অস্বত্বি বিরাজমান।
বছর শেষে ২০১৬ সালের প্রথম দিন সব খবরের কাগজের প্রথম পাতায় ২০১৫ সালে মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজন ছিল বলে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের বরাতে খবর এসেছে। তারা এও জানিয়েছে যে, ২০১৫ সালে ক্রসফায়ারে মৃতের সংখ্যা ছিল ১৪৬ জন।
নতুন বছর শুরু হয়েছে। একটু চিন্তা করুন তো ২০১৭ সালের পহেলা জানুয়ারিতে কেমন শিরোণাম হতে পারে? ‘আসক‘ কী বলতে পারবে ২০১৬ তে মানবাধিকারের আশানুরূপ উন্নতি হয়েছে?
হয়তো পারবে। যদি আমরা সবাই চিন্তায় ও কর্মে স্বচ্ছ হই। মুখে ও বুকে কোনো বৈপরিত্য না থাকে। গনতন্ত্রে বিশ্বাসি হই। ভিন্নমতের প্রতি সহনশীল হতে পারি। নিজেকে বদলে নেয়ার এরকম শপথে আবদ্ধ হলে নতুন বছরে সব অশুভ শক্তি বিদায় নেবে। প্রতিটি সকাল দেশের ১৬ কোটি মানুষের জন্য হবে শান্তি ও শুভ্রতার আলোয় ভরপুর। সবাইকে শুভ নববর্ষ।
লেখক: ব্যাংকার ও কলাম লেখক

শেয়ার করুন