দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এক কোটি ২০ লাখ

techshomadhan-1450528529-0090620_xlargeসিলেটের সকাল ডেস্ক : সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখন ৫ কোটি ৩৯ লাখ। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নিয়ে সরকারের এমন হিসাবের সঙ্গে দ্বিমত জানিয়ে বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৯২ শতাংশ বা ১৪ কোটি ৮০ লাখ মানুষ ইন্টারনেট সেবাবঞ্চিত। সংস্থাটির ভাষায়, ‘বাংলাদেশের ওই পরিমাণ মানুষ অফলাইনে থাকে’।
এমন তথ্য উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের ‘ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০১৬: ডিজিটাল ডিভিডেন্ডস’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে। এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রকৃত ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১ কোটি ২০ লাখ, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ। আর ইন্টারনেট-বঞ্চিত একক জনগোষ্ঠীর দেশ হিসাবে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ৫ নম্বর।
তবে এ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের দুটি ইতিবাচক দিকও উঠে এসেছে। বাংলাদেশে মুঠোফোনে কথা বলার খরচ বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়, আর প্রথম স্থানে শ্রীলঙ্কা। বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কায় মুঠোফোন ব্যবহারের মাসিক খরচ ২ ডলারের কম। মুঠোফোনে কথা বলার ব্যয় সবচেয়ে বেশি ব্রাজিলে, ৪৮ ডলার। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের লোকবল সরবরাহের সম্ভাবনায় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সম্ভাবনার বিষয়টিও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।
ব্যবহারকারীর এ সংখ্যা নির্ধারণে বিশ্বব্যাংক ইন্টারনেট ব্যবহারকে অনলাইন ও অফলাইন—দুটি শ্রেণিতে ভাগ করেছে। সব সময়ই ইন্টারনেট ব্যবহার করে বা ব্যবহারের সুযোগ আছে, এমন ব্যবহারকারীদের অনলাইন শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। আর কখনো ইন্টারনেট ব্যবহার করেননি, এমন ব্যবহারকারীদের অফলাইন শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের মোট জনসংখ্যা ৭৪০ কোটি। এর ৭০০ কোটিই মোবাইল প্রযুক্তির আওতায় আছে। সারা বিশ্বে অনলাইনে যুক্ত ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩২০ কোটি। এর মধ্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যবহার করে ১১০ কোটি মানুষ। আর ইন্টারনেট-বঞ্চিত ‘অফলাইন’ জনগোষ্ঠী ৪০০ কোটি। এর মধ্যে একক দেশ হিসেবে ভারতে সবচেয়ে বেশি ১০৬ কোটি মানুষ অফলাইন বা ইন্টারনেট-বঞ্চিত। চীনে এ সংখ্যা ৭৫ কোটি, ইন্দোনেশিয়ায় ২১ কোটি, পাকিস্তানে ১৬ কোটি ৫০ লাখ আর বাংলাদেশে ১৪ কোটি ৮০ লাখ। অফলাইন জনগোষ্ঠীর হিসেবে শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে রয়েছে নাইজেরিয়া, ব্রাজিল, ইথিওপিয়া, মেক্সিকো ও কঙ্গো।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে চাইলে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ বলেন, ‘ইন্টারনেট সেবাদাতা সব প্রতিষ্ঠানের তথ্য নিয়ে বিটিআরসি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর পরিসংখ্যান প্রতি মাসে প্রকাশ করে। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর এ পরিসংখ্যানে কোনো ভুল নেই। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশের জন্য বিশ্বব্যাংককে উল্টো প্রশ্ন করা উচিত।’
প্রতিমন্ত্রীর মতো ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর এমন পরিসংখ্যানের সঙ্গে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনও (বিটিআরসি) দ্বিমত পোষণ করেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির সচিব সরওয়ার আলম বলেন, বাংলাদেশের মানুষ প্রয়োজন অনুযায়ী ইন্টারনেট প্যাকেজ কিনে ব্যবহার করেন। এ ব্যবহারকারীদের অনেকেই সব সময় ইন্টারনেটে যুক্ত থাকেন না, তার মানে এই নয় যে ওই সব ব্যবহারকারী ইন্টারনেট ব্যবহার করেন না।
সক্রিয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নির্ধারণে বিটিআরসির নিয়ম হলো, ৯০ দিন বা তিন মাসের মধ্যে একজন ব্যক্তি একবার ব্যবহার করলেই তিনি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী হিসেবে চিহ্নিত হবেন। বিটিআরসির সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫ কোটি ৩৯ লাখ, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশ।
তবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ কায়কোবাদ বলেন, ‘আইসিটি খাতে ৩০ বছর আগেও ভারত ও বাংলাদেশের অবস্থানে খুব একটা পার্থক্য ছিল না। আজ ভারত ১০০ বিলিয়ন ডলার আয় করছে, আমরা এখনো মিলিয়নের ঘরেই পড়ে আছি। এ খাতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়ার মূল কারণ সরকারের ভুলনীতি। প্রকল্পের নামে ইচ্ছেমতো টাকা খরচ করা হলেও জিডিপি ও মাথাপিছু আয়ের উন্নতিতে আইসিটি খাতের অবদান সামান্য।’
মোহাম্মদ কায়কোবাদ আরও বলেন, ‘যত পরিসংখ্যানই দেখানো হোক না কেন, আইসিটিতে আমরা দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, এমনকি যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনামের মতো অগ্রগতিও অর্জন করতে পারিনি। ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রকৃত লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে।’
ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর পাশাপাশি বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের জোগানের ক্ষেত্রে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতের অবদান কম বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। এ সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মোট কর্মসংস্থানের মাত্র দশমিক ৪ শতাংশ আইসিটি খাত থেকে আসে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আইসিটি খাতের কর্মসংস্থানের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিক থেকে ৫ নম্বরে। নিচের দিক থেকে এ তালিকার শীর্ষ দেশ লাওস। কর্মসংস্থান তৈরিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে আছে মঙ্গোলিয়া। দেশটির মোট কর্মসংস্থানের ২ দশমিক ৭ শতাংশের জোগান আসে আইসিটি থেকে।
প্রতিবেদনটি সম্পর্কে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা ব্যাপক। এ খাতে অর্থায়নেরও ঘাটতি নেই। তবে ব্যবস্থাপনার ঘাটতি ও দুর্নীতির কারণে এই বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগানো যায়নি।
ইন্টারনেট ব্যবহারে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর পিছিয়ে থাকার কারণ হিসেবে আইসিটি খাতে অবকাঠামোগত দুর্বলতার বিষয়টিও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। আইসিটি অবকাঠামো উন্নত না হওয়ার কারণে এসব দেশে ইন্টারনেটের গতি কম, যেটিকে বিশ্বব্যাংক বলছে ‘দ্বিতীয় শ্রেণির ইন্টারনেট’।
মুঠোফোনসহ ডিজিটাল প্রযুক্তির বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে উচ্চকরের বিষয়গুলোও উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে। মুঠোফোন আমদানিতে সবচেয়ে বেশি কর দিতে হয়, এমন ১৫টি উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। এ তালিকার শীর্ষ দেশ হলো ফিজি।
প্রতিবেদনটি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিং বলেন, সারা বিশ্বে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা এক দিনে ৪০০ কোটি বিভিন্ন বিষয়ের খোঁজ করেন, আবার একই সময়ে ৪০০ কোটি লোক ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ডিজিটাল প্রযুক্তির সুফল সবার কাছে পৌঁছাতে হলে ইন্টারনেট ও প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের এই অসমতা দূর করতে হবে।

শেয়ার করুন