তুরাগ তীরে চলছে পূণ্যযাপন : কাল আখেরি মোনাজাত

3_160070সিলেটের সকাল : ফরজ সালাত আদায়ের পর অব্যাহত জিকির-আজকার, তেলাওয়াত আর বয়ানে এক পূণ্যময় পরিবেশ এখন তুরাগরীতে। দেশের ষোল জেলার লাখো মানুষসহ দেশ-বিদেশের মুসল্লিরা সেখানে এখন যাপন করছেন পূণ্যসময়। আগামীকাল রোববার আখেরী মোনাজাতের মধ্যদিয়ে শেষ হবে এবরের দু’পর্বের বিশ্ব ইজতেমা।

ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ ও ধর্মীয় পরিবেশে টঙ্গীতে গতকাল শুক্রবার বাদ ফজর তাবলীগ জামাতের শীর্ষস্থানীয় মুরব্বি ভারতের মাওলানা আবদুর রহমানের আমবয়ানের মধ্য দিয়ে টঙ্গীর তুরাগ তীরে শুরু হয় ৫১তম বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব। লাখো মুসল্লির অংশগ্রহণে বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে জুমার জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। জুমার নামাজের ইমামতি করেন ঢাকার কাকরাইল মসজিদের খতিব হাফেজ মাওলানা যোবায়ের। ইজতেমার মাঠে জুমার জামাতে অংশ নিতে সকাল থেকেই আশপাশের এলাকা থেকে ইজতেমা অভিমুখী ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা আসতে থাকেন। এ পর্বেও বেলা ১টায় জুমার জামাত মূল ময়দান ছাড়িয়ে পূর্বপাশে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক পর্যন্ত বিস্তৃৃতি লাভ করে। জুমার জামাত শেষে ইজতেমা ময়দানের চারদিকে বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো মুসল্লিরা নিজ নিজ গন্তব্যে রওনা হন। দেশের সর্ববৃহৎ জামাতকে কেন্দ্র করে ইজতেমা ময়দান ও আশপাশের এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। আশপাশের সড়ক ও মহাসড়ক বন্ধ হয়ে যায়। স্থান সংকুলান না হওয়ায় ধর্মপ্রাণ মানুষ রাস্তায়, পরিবহন ও ভবনের ছাদেও জামাতে শরিক হন। তুরাগ নদীতে স্থাপিত ভাসমান সেতু ও বিভিন্ন নৌযানে নামাজের কাতারের মাধ্যমে ইমামের সঙ্গে মূল ময়দানের সংযোগ স্থাপন করা হয়। এবারও দেশি-বিদেশি লাখ লাখ মুসল্লির অংশগ্রহণের মাধ্যমে শুরু হয়েছে দ্বিতীয় পর্বের বিশ্ব ইজতেমা।

দেশ-বিদেশের মুসল্লিদের সার্বিক নিরাপত্তায় নৌ-পথ, আকাশ পথে র‌্যাব’র হেলিকপ্টার টহলসহ, ৫ স্তরের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ১৪টি ওয়াচ টাওয়ারে নজরদারী, সেনাবাহিনীর  তুরাগ নদীর উপর ৯টি ভাসমান ব্রিজে মুসল্লিদের চলাফেরার বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। গাজীপুর জেলা প্রশাসনের ১৩টি ভ্রাম্যমাণ আদালত, ৫৪টি ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, গাজীপুর জেলা সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে সরকারি হাসপাতালসমূহের মেডিকেল টিম, সিটি করপোরেশনের পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, আশপাশের কয়েক কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন, মুসল্লিদের সুবিধার জন্য দ্বিতল টয়লেটগুলোকে তৃতীয় তলায় উন্নীত করণ করা হয়েছে। সর্বোপরি প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুরো ইজতেমা ময়দানকে নেয়া হয়েছে কঠোর নিরপত্তা ব্যবস্থা। মাঠে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সচেষ্ট রয়েছে র‌্যাব, পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যসহ ১০ থেকে ১২ হাজার নিরাপত্তাকর্মী কাজ করছেন।

বয়ান : শুক্রবার বাদ আসর বয়ান করেন তাবলীগ জামাতের শীর্ষ মুরব্বী মরহুম যোবায়েরুল হাসানের ছেলে যোহায়ের আহম্মেদ। বাদ মাগরিব বয়ান করেন ভারতের মাওলানা সা’দ। এর আগে বাদ জুমার বয়ান করেন ভারতের মাওলানা ইসমাইল গোদরাসহ বিশ্ব তাবলীগ জামাতের মুরব্বীরা। ইজতেমা মাঠের জিম্মাদারের দায়িত্বে থাকা তাবলীগের মুরুব্বী গিয়াসউদ্দীন মানবজমিনকে এ তথ্য জানান।

বয়ানে যা বলা হলো- বয়ানে বলা হয় গরিরেব জন্য ঈদের নামাজের পর অতি উত্তম ইবাদত হলো শুক্রবারের জুমার নামাজ। জুমার নামাজ আদায়ের লক্ষ্যে অজু-গোসল করে নতুন জামা-কাপড় পরে এবং গায়ে খুশবু লাগিয়ে মসজিদের উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর থেকে তার আমলনামায় নেকি লেখা শুরু হয়ে যায়। বয়ানে আরও বলা হয়, জুমার জামাতে শরিক হতে রওয়ানা দেয়ার পর প্রতি কদমে কদমে নেকি লেখা হয়। আর প্রতিটি নেকি সাত আসমান ও সাত জমিন হতেও উত্তম।

বাদ জুমা ভারতের মাওলানা ইসমাইল গোদরা বলেন, দুনিয়ার জিন্দেগিকে আল্লাহ্‌ তা’য়ালা শানহু খেলাধুলার জিন্দেগি বলেছেন। দুনিয়ার জিন্দেগি হলো খেলাধুলা জিন্দেগী, যার কোন হাকিকত নাই, বাস্তবতা নাই। উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, ছোট বাচ্চারা খেলাধুলার জন্য ঘরের সমানের ধুলাবালি দিয়ে ঘর বানায়। তার মধ্য থেকে পাকানোর জন্য চুলা বানায়। আবার কেউ মিছে মিছে বাবা হয়, মা হয়। এতক্ষণ পর্যন্ত বাচ্চারা খেলাধুলা করে, যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের পেটে ক্ষুধা লাগে। তাদের পেটে যখন ক্ষুধা লাগলে তখন তারা সবকিছু ফেলে দিয়ে মায়ের কাছে চলে যায়। তিনি বলেন, দুনিয়ার সব কিছুই অস্থায়ী। দুনিয়ায় যা কিছু আছে একদিন সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে। দুনিয়ার ক্ষুধা আসল ক্ষুধা নয়, দুনিয়ার পিপাসা আসল পিপাসা নয়, দুনিয়ার ইজ্জত আসল ইজ্জত নয়, দুনিয়ার জিল্লত আসল জিল্লত নয়। আসল ক্ষুধা হলো আখেরাতের ক্ষুধা, আসল পিপাসা হলো আখেরাতের পিপাসা। তিনি আরও বলেন, মানুষের আসল জিন্দেগি হলো আখেরাতের জিন্দেগি। তিনি আরও বলেন, দুনিয়ার জিন্দেগি দিয়ে আখেরাতের জিন্দেগিকে হাসিল করতে হবে। প্রত্যেক মানুষকে মেহনত করে আমলে সালেহা অর্জন করতে হবে। দাওয়াতি কাজে মেহনতের মাধ্যমে যারা ইমান ও আমলকে হাসিল করে, আল্লাহ্‌তায়ালা তাদের আখেরাতের জিন্দেগি ও দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জিন্দেগিকে সহজ করে দিবেন।

বয়ানের তাৎক্ষণিক অনুবাদ- বিশ্ব ইজতেমায় বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের তাবলীগ মারকাজের ১৫-২০ জন শূরা সদস্য ও বুজুর্গ বয়ান পেশ করছেন। মূল বয়ান উর্দূতে হলেও বাংলা, ইংরেজি, আরবি, তামিল, মালয়, তুর্কি ও ফারসি ভাষায় তাৎক্ষণিক অনুবাদ করা হচ্ছে। বিদেশী মেহমানরা মূল বয়ান মঞ্চের উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বপাশে হোগলা পাটিতে বসেন। বিভিন্ন ভাষাভাষীর মুসলিমরা আলাদা আলাদা বসেন এবং তাদের মধ্যে একজন মুরব্বি মূল বয়ানকে তাৎক্ষণিক অনুবাদ করে শুনান।

ইজতেমায় বিদ্যুৎ বিপর্যয় : শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত ইজতেমা ময়দানে বিদ্যুৎ বিপর্যের কারণে মুসল্লিদের পানি সংকটে পড়তে হয়। এতে মুসল্লিদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ইজতেমা এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে নিয়োজিত ঢাকা ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) কন্ট্রোলরুম-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা জানান, গ্রিডফেল করায় ইজতেমা এলাকায় এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। গ্রিড ফেল করার কারণে বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটে। এ সময় প্রায় একঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় মুসল্লিদের নিরাপত্তাকাজে ব্যবহৃত সিসি টিভিসহ বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি অচল হয়ে পড়ে। এছাড়াও বিদ্যুৎচালিত মনিটরিং কাজ ও পানি উত্তোলনে সাময়িক বিঘ্ন ঘটে। তবে ইজতেমা মাঠের জিম্মাদার ইঞ্জিনিয়ার গিয়াস উদ্দিন জানান, ইজতেমা ময়দানের ভেতরে বিশেষ ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ সচল ছিল বলে  সেখানে কোনো সমস্যা হয়নি। গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বলেন, সিসিটিভি পরিচালনা সাময়িক বিঘ্নিত হলেও নিরাপত্তার কাজে বড় কোনো সমস্যা হয়নি। সব জায়গায় পোশাকে ও সাদা পোশাকে আমাদের পুলিশ নিয়োজিত রয়েছে।

এক মুসল্লির মৃত্যু : গত বৃহস্পতিবার রাতে বগুড়া জেলার গাবতলী থানার মাঝবাড়ি গ্রামের ইউনুস প্রামাণিক (৭০) নামের এক মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে।

দুই বিদেশী মেহমান অসুস্থ : ইজতেমায় আগত মালয়েশিয়ার নাগরিক সিয়াম (৪৬) পাতলা পায়খানা ও কম্বোডিয়ার নাগরিক সৌম (৭০) পেটব্যথা নিয়ে টঙ্গী সরকারি হাসপাতালে গতকাল ভর্তি হয়েছেন।

র‌্যাব-এর প্রেস ব্রিফিং : শুক্রবার সকালে র‌্যাব’র মহাপরিচালক বেনজীর আহম্মেদ ইজতেমা ময়দান পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে তিনি বলেন, আমরা প্রথম পর্ব যেমন শান্তিপূর্ণ ভাবে শেষ করেছি। দ্বিতীয় পর্বেও শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার্থে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছি। ইজতেমা ময়দান ও আশপাশের এলাকাজুড়ে মোটরসাইকেল পেট্রোল, রিভার পেট্রোল, ওয়াচ টাওয়ার, সিসি টিভি ক্যামেরা, আকাশে হেলিকপ্টার টহল, মেটাল ডিটেক্টর, নাইট ভিশন গগলস ও সাদা পোশাকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

আখেরি মোনাজাত সামনে রেখে লাখ লাখ মুসল্লির নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় র‌্যাব’র পক্ষ থেকে সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়াও জেলা পুলিশের সাথে আমাদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে। মুন্নু মাঠে স্থাপিত র‌্যাব’র ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের মাধ্যমে ইজতেমায় আগত ছয় হাজার পাঁচশত মুসল্লিকে ফ্রি চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে। প্রথমপর্বের মোনাজাতের ন্যায় দ্বিতীয় পর্বেও আখেরি মোনাজাতের দিন র‌্যাব’র পক্ষ থেকে মুসল্লিদের ফ্রি বাস সার্ভিসের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন র‌্যাব’র মিডিয়া উইংয়ের প্রধান মো. মুফতি মাহমুদ, স্থানীয় কাউন্সিলর গিয়াস উদ্দিন প্রমুখ।

ইজতেমায় আটক : শুক্রবার ইজতেমার প্রথমদিনে ময়দানের আশপাশ থেকে বিভিন্ন অপরাধে ৩২ জন হকারও ৭ জন পকেটমারকে আটক করেছে পুলিশ।

জুমার নামাজে মুসল্লিদের ভোগান্তি : জুমার নামাজ আদায় করতে রাজধানী ও এর আশপাশ থেকে আসা মুসল্লিদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ইজতেমায় প্রতিবার জুমার নামাজের জন্য দুই ঘণ্টা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ করে রাখা হয়। যাতে মুসল্লিরা মহাসড়কে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতে পারে। গতকাল মহাসড়ক আগে থেকে বন্ধ না করায় নামাজের সময় পরিবহনের জটলা লেগে যায়। এতে জুমার নামাজে আসা মুসল্লিদের এলাকার অলিগলিতে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতে দেখা গেছে।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানা : শুক্রবার বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে টঙ্গীর আশপাশে এলাকায় জেলা প্রশাসনের পরিচালনার  দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা ভেজালবিরোধী অভিযান চালিয়ে নগদ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেন। এগুলো হচ্ছে- স্থানীয় মরকুন এলাকার আলামিন সুইটস, বিসমিল্লাহ্‌ হোটেল ও আজমেরী হোটেলকে তাদের বিভিন্ন অনিয়মের কারণে জরিমানা আদায় করা হয়।

শেয়ার করুন