হারানো ধানের খোঁজে মৌলভীবাজারের নাট্যজন শহীদুল

নিজের খেতে ফলানো হারানো জাতের ধানের মাঝে কাজী শাহীদুল ইসলাম। শ্রীমঙ্গলের গন্ধর্বপুর গ্রামের মাঠ থেকে গত ২২ নভেম্বর তোলা ছবি l

নিজের খেতে ফলানো হারানো জাতের ধানের মাঝে কাজী শাহীদুল ইসলাম। শ্রীমঙ্গলের গন্ধর্বপুর গ্রামের মাঠ থেকে গত ২২ নভেম্বর তোলা ছবি 

সিলেটের সকাল ডেস্ক : এই ধানগুলো একটা সময় মাঠজুড়ে লাবণ্য ছড়াত। ধানের নানা বাহারি নাম মুগ্ধ করত মানুষকে। উচ্চ ফলনশীল ধানের দাপটে মাত্র কয়েক যুগে সেই ধানগুলো অতীত হয়ে গেছে। এখন অনেক কৃষকই আর সেই ধান চাষ করেন না। কেউ হয়তো নাম শুনেছেন, চোখে দেখেননি।
সেই ধানগুলোকেই মাঠে ফিরিয়ে আনলেন একজন শহুরে মানুষ, কাজী শাহীদুল ইসলাম। তিনি মূলত নাটকের লোক। আলপথে রোদে পুড়ে হারানো ধানের ফিরে আসার গর্বিত দোলা দেখে মুগ্ধ হবেন, আনন্দে উদ্বেল হবেন; তা কখনো ভাবেননি। সেই তিনিই খুঁজে খুঁজে তাঁর খেতে জড়ো করেছেন আউশ ও আমনের হারানো ২৭টি জাত।
শাহীদুল ইসলাম একসময় প্রচণ্ড পিঠের পীড়ায় ভুগতেন। অনেক ওষুধ-পথ্য খেয়েছেন। তাতে সাময়িক কিছু কাজ হলেও স্থায়ী সমাধান আসেনি। একবার পঞ্চগড়ে কাজ করার সময় খোঁজ পেলেন একজন চিকিৎসকের। এমবিবিএস পাস করা চিকিৎসক। কিন্তু করেন ভেষজ চিকিৎসা। সেই চিকিৎসক তখন মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে থাকতেন। শ্রীমঙ্গলে এসে তাঁর শরণাপন্ন হলেন শাহীদুল। কিন্তু চিকিৎসকের সাফ কথা, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের বিষমাখা খাবার খেলে তাঁর চিকিৎসা কোনো কাজে লাগবে না।
চিকিৎসকের পরামর্শে সুস্থতার জন্য প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে বা অর্গানিক চাষাবাদে নেমে পড়েন ‘পিঠ ব্যথার রোগী’ শাহীদুল ইসলাম। সেটা ২০১০ সালের কথা। শ্রীমঙ্গলের লইয়ারকুল নামক স্থানে স্থানীয় মালিকদের কাছ থেকে জমি বর্গা নিয়ে স্থানীয় কিছু তরুণ নাট্যকর্মীকে নিয়ে নেমে পড়লেন চাষাবাদে। মাঝে মাঝে দলবল নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন গ্রামে, গ্রামের হাটে। তখনই স্থানীয় জাতের অনেক ধানের নাম তাঁর কানে আসে। এসব ধান একসময় মাঠজুড়ে বাতাসে দোল খেয়েছে, ধানের সোনারং চাষির মন জুড়িয়েছে; এখন আর তা মাঠে নেই। উচ্চ ফলনশীল ধানের কাছে হার মেনে হারিয়ে গেছে।
কাজী শাহীদুল ইসলাম বলেন, ‘আমি শুরুতে হারিয়ে যাওয়া ধান চাষ করব বলে মাঠে নামিনি। শারীরিক সুস্থতার কথা চিন্তা করে অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষ করতে গিয়েছি। কিন্তু এক এক ধানের নাম জেনে মুগ্ধ হয়েছি। এরপর বীজধান সংগ্রহে নামি। পরে চাষে হাত দিই।’
দ্রুতই বর্গাচাষি থেকে পুরোদস্তুর কৃষক হওয়ার মনস্থির করেন শাহীদুল। ২০১৩ সালে শ্রীমঙ্গলেরই ভুনবীর ইউনিয়নের গন্ধর্বপুর গ্রামের মাঠে পাঁচ বিঘা জমি কেনেন। একেবারে খুঁটি গেড়ে বসলেন মাঠে। একটি ডেরাও তুললেন সেখানে।
শ্রীমঙ্গলের লালবাগের রাজীব রায়কে নিয়ে উপজেলার সিন্দুরখান এলাকায় ঘোরার সময় একদিন শাহীদুলের দেখা হলো স্বাস্থ্যকর্মী নজরুল ইসলামের সঙ্গে। ঝাঁকড়া চুল, লম্বা দাড়ি দেখে নজরুল ইসলাম তাঁকে গানের মানুষ ভেবে নিয়েছিলেন। নজরুল জানতে চান, কী খুঁজছেন? শাহীদুল বললেন, ধান। নজরুল শুনলেন, গান। পরে হারানো ধান খোঁজার বিষয়টি স্পষ্ট হলে এলাকারই ইজরা গ্রামের আবদুল মুকিত নামের একজনের খোঁজ দেন তিনি। শাহীদুল ছুটে গেলেন আবদুল মুকিতের কাছে। আবদুল মুকিত তাঁর হাতে তুলে দিলেন সমুদ্রফেনা, ময়না শাইল, গান্ধী শাইল ও গোয়ার শাইল। এক বছর পর পেলেন পর্বত জিরা। শ্রীমঙ্গল উপজেলার আশিদ্রোন ইউনিয়নের ফটকি গ্রামের মোছাব্বির নামের এক ব্যক্তি দিলেন খইরকা বিরইন ও মধু বিরইন। ভুনবীর ইউনিয়নের শাসন এলাকা থেকে পেলেন গড়ানি বিরইন। সিলেটের গোয়ালাবাজার থেকে পেলেন হাওয়াই বিরইন।
আশিদ্রোন ইউনিয়নের ভুজপুরে দোকানে বসে কথা বলার সময় এক বয়স্ক লোক নাম বললেন হরিণাকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ননী গোপাল পালের। তাঁর কাছে আছে হারানো কিছু ধান। ছুটে গেলেন ননী গোপালের কাছে। সেখানে পাওয়া গেল তুলসী মঞ্জরি ও বীরকাজল জাতের ধান।
শাহীদুল ইসলাম বললেন, তুলসী মঞ্জরিতে মিশ্র নতুন জাতের কিছু ধান পাওয়া যাচ্ছে। এগুলো বাছাই করা হবে। বাছাই করা ধানের নাম রাখা হবে ননী শাইল। হরিণাকান্দি গ্রামের বিধুভূষণ চক্রবর্তীর কাছ থেকে মিলল চাপড়া শাইল। হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাটের একডালা গ্রাম থেকে সংগ্রহ করলেন বাদশা ভোগ।
আরও একটি জাত সংগ্রহ-অভিযানের কথা শোনালেন শাহীদুল। অনেকের মুখে তিনি এ ধানের ঔষধি গুণাগুণের কথা শুনছিলেন। পেটের পীড়া, আমাশয় বা ডায়রিয়ায় এ ধানের জাউ বা ভাত খেলে উপকার পাওয়া যায়। কিন্তু কেউ ধানটির নাম বলতে পারছিলেন না। একদিন শ্রীমঙ্গলেরই মীর্জাপুর ইউনিয়নের মীর্জাপুর বাজারের একটি দোকানে বসে বিভিন্ন লোকজনের কাছে ধানটি সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করেন। শেষে উপায় বাতলান দোকানের মালিক-বাজারের কাঁচাবাজার এলাকায় মিয়াধন মিয়া নামে একজন আছেন, তিনিই পারবেন নাম বলতে। ছুটে গেলেন। মিয়াধন মিয়া নিয়ে গেলেন আকলিছ মিয়ার কাছে। আকলিছ মিয়া ধানটির নাম বললেন ‘নি-আলো’। পরদিন দিলেন নি-আলোর বীজ। এভাবে একে একে ২৭টি জাত তাঁর হাতে আসে।
শাহীদুল ইসলাম জানালেন, আমনের এ মৌসুমে তিনি ২৫ জাতের ধান চাষ করেছেন। এগুলো হচ্ছে গোয়ার শাইল, গান্ধী শাইল, ময়না শাইল, নাগরা শাইল, চাপড়া শাইল, মালতি, বালাম, বীরকাজল, তুলসী মঞ্জরি, কালিজিরা, সমুদ্রফেনা, বাদশা ভোগ, বাইঙ্গন বিচি, মধু বিরইন (বিন্নি), কালো বিরইন, কুলটি বিরইন, আইককা বিরইন, পাখ বিরইন, হাওয়াই বিরইন, গড়ানি বিরইন, খইরকা বিরইন, নি-আলো, নি-ধান, পর্বত জিরা ও পাইজম ধান। আউশের সময় করেছিলেন আড়াই ও চেংড়ি ধান। নি-আলো থেকে বাছাই করা হয়েছে আরও ছয় জাতের ধান। একদিন হয়তো প্রতিটি ধানই আলাদা আলাদা জাতপাত নিয়ে কৃষকের আদরে মাঠে মাঠে মাথা তুলে দাঁড়াবে।
গন্ধর্বপুরের কৃষক হরি দেবনাথ (৬০) বললেন, ‘ইরি আসার পর এসব ধানের চাষ সবাই ছেড়ে দিছে। তবে সার-ওষুধ (কীটনাশক) ছাড়াও যে ভালো ফসল হয়, এটা ওনার (শাহীদুল ইসলামের) খেত দেখে বুঝতে পারছি। গোবর দিয়েই ভালো ফলন পাওয়া যায়।’
গত ২২ নভেম্বর গন্ধর্বপুরে শাহীদুল ইসলামের ধানের খেত ঘুরে দেখা গেছে, একই খেতে এক ধানের পাশে আলাদা চেহারা নিয়ে দোল খাচ্ছে অন্য ধান। শাহীদুল ইসলাম ও তাঁর সহকর্মীরা এক এক করে ধানের জাত চেনালেন। কোন ধানের কোন গুণ—তারও বর্ণনা দিলেন। সেদিন ছিল ধান কাটার দিন।
শাহীদুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় জাতের অনেক ধান ছিল। হয়তো কৃষি বিভাগের কাছে কিছু সংরক্ষিত থাকতে পারে। থাকলে তা আটকে না রেখে মাঠে ছড়িয়ে দেওয়া দরকার। তাঁর ধারণা, নানা কায়দাকানুন করে কৃষিকে ব্যয়বহুল করে ফেলা হয়েছে। এখন লক্ষ্য হওয়া দরকার, উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনা।
শাহীদুল তাঁর খেতে কোনো রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করেন না। পোকা দমনে গরুর চনা কলসে ভরে মাটির নিচে ১৪ দিন রেখে তা পানির সঙ্গে মিশিয়ে খেতে স্প্রে করা হয়। তাতেই কাজ হয়। ফলন যা হয়েছে, তা ভালোই। বিঘাপ্রতি সাত-আট মণ ধান পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, কৃষক এই ধান চাষ করলে লাভবানই হবেন। কারণ উৎপাদন খরচ অনেক কমে যাবে। জমিও ভালো থাকবে।
শাহীদুল ইসলামের এই চাষাবাদকে যাঁরা সাফল্যের দিকে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন তাঁরা হলেন মো. আমির উদ্দিন, মোবারক মিয়া, অনির্বাণ চৌধুরী, রাজীব রায়, সারওয়ার পরাগ, রুহুল আমীন, মুর্শেদ, দিদার, মোশাররফ, মিলন, সঞ্জয় প্রমুখ। এঁরা নাটক, পথনাটকের সূত্রে তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। শুধু নুরু মিয়া নামে সার্বক্ষণিক একজন কর্মী আছেন।
আমির উদ্দিন শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের বিবিএস দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র, বাড়ি শ্রীমঙ্গলের উত্তরসুরে। মাথায় গামছা বেঁধে মাঠে ঘাম ঝরানোই তাঁর শখ। তিনি বলেন, ‘আমি মূলত পথনাটকের কর্মী। নাটক করতে এসে এখন চাষি। ভালোই লাগছে।’
কাজী শাহীদুল ইসলাম হারানো জাতের ধান চাষের একটা নামও দিয়েছেন—‘মুক্ত কৃষি আন্দোলন’। এর মূল লক্ষ্য, নিজেদের খাবারের ধান নিজেরা ফলাব। অন্যের ওপর নির্ভর করব না। বীজও নিজেরা সংরক্ষণ করব। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকে উৎপাদিত খাদ্যের নামে বিষ খাব না। শাহীদুল মজা করেই বললেন, ‘আমি এখন ২৫ রকম ধানের ভাত খাই। অনেক সুস্থ আছি।’-সৌজন্যে প্রথম আলো

শেয়ার করুন