সুনামগঞ্জে তিন পরিবারের লড়াই

106946_b1সিলেটের সকাল ডেস্ক : দল নয় মাঠে আগে থেকেই ছিল দুই ‘পরিবার’। তেঘরিয়ার জিয়াউল হক হাজির করেছেন তৃতীয় আরও এক ‘পরিবার’। ২২.১৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে বিস্তৃত সুনামগঞ্জের পৌরসভা নির্বাচন, তাই হয়ে উঠেছে তিন পরিবারের লড়াই। নিজের যোগ্যতা বা দলের পরিচয় ছাপিয়ে প্রত্যেক প্রার্থী পরিবারের পরিচয়েই বড় হয়ে উঠেছেন।
পরিবারের পরিচয়ে সবচেয়ে এগিয়ে দেওয়ান গণিউল সালাদীন। তার পরিচয় দেয়ার মতো তাঁর পরিবারে অনেকেই আছেন। আছেন হাছন রাজা, আছেন মমিনুল মউজদীন। সালাদীন মরমি কবি দেওয়ান হাছন রাজার প্রপৌত্র। আর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত সুনামগঞ্জের জনপ্রিয় মেয়র মমিনুল মউজদীনের ছোট ভাই। এমন পরিচয় থাকায় কোনো দলের মনোনয়নে প্রার্থী না হয়েও লড়াইয়ের মাঠে সরব উপস্থিতি তার। পরিবারের সে পরিচয় পোস্টারেও তুলে এনেছেন তিনি। তার পোস্টারে ‘মনের মাঝে মউজদীন’ স্লোগানের পাশে আঁকা আছেন মমিনুল মউজদীন। সালাদীনের পরিবারে সর্বদলীয় রাজনৈতিক পরিবেশ। আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জাতীয় পার্টি, জাসদ সব দলেরই ছায়া ছিল বা আছে। সালাদীনদের সবচেয়ে বড়ভাই দেওয়ান সামসুল আবেদীন জিয়াউর রহমানের আমলে বিএনপি থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। দল পালটে পরে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচন করেন। তারপর যোগ দেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টিতে। সর্বশেষ এরশাদের সঙ্গ ছেড়ে কাজী জাফর আহমদের নেতৃত্বে আলাদা জাতীয় পার্টিতে অংশ হন। সালাদীনের আরেক ভাই সুনামগঞ্জ পৌরসভারই সাবেক চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা দেওয়ান জয়নুল জাকেরিন সুনামগঞ্জ উপজেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান। তাই চাইলে বা একটু চেষ্টা করলে যে কোনো দল থেকেই মনোনয়ন বাগিয়ে নিতে হয়তো পারতেন গণিউল সালাদীন। তবে তিনি তার জীবিত ভাইদের চেয়ে ‘মৃত’ ভাই কবিতার মানুষ মমিনুল মউজদীনকেই আদর্শ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ১৯৯৩ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত সময়ে টানা তিনবারের চেয়ারম্যান এককালের জাসদ নেতা মউজদীনের বিশাল জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে নির্বাচনী যুদ্ধে নেমেছেন তিনি। পরিবারে যেমন ‘ভরসা’ সালাদীনের তেমনি ভয়ও আছে। তার বড় ভাই জয়নুল জাকেরিন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী থাকায় স্বভাবতই ভাইয়ের সমর্থন পাচ্ছেন না তিনি। অবশ্য সবচেয়ে বড় ভাই সামসুল আবেদীন আছেন সালাদীনের পাশেই।
‘পরিবারে’র পরিচয় আছে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী আইয়ুব বখত জগলুরও। তবে তার সে পরিচয়টা বোধহয় গৌরবের নয়। তার দশ ভাইয়ের পরিবার সুনামগঞ্জের আতঙ্ক জাগানিয়া এক পরিবার। তার দুই ভাই শাহজাহান বখত, মনোনয়ার বখত নেকসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের ভয়ে একসময় কাঁপতো পুরো সুনামগঞ্জ। ভয়ের মন্ত্রে মনোয়ার বখত ১৯৮৫ সালে সুনামগঞ্জ পৌরসভার কর্তৃত্বও হাতের মুঠোয় পুরে নিয়েছিলেন। ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত পৌরসভার চেয়ারম্যান থাকাকালে সুনামগঞ্জে তখন তিনিই ছিলেন ‘শেষকথা’। অবশ্য মনোয়ার বখত নেক সব ভুলিয়ে দিয়েছিলেন তার ‘স্মরণীয় মৃত্যু’ দিয়ে। ১৯৯৪ সালে সুনামগঞ্জের সড়ক ও জনপথ বিভাগের গুদামে আগুন লাগলে নিজেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন উদ্ধারকাজে। অনেককে আগুন থেকে বাঁচিয়ে নিজের জন্য মৃত্যুবরণ করেছিলেন নেক। তার সে সাহসের প্রতিদান হিসেবে পরে ছোট ভাই আইয়ুব বখত জগলুর হাতে পৌরসভার চাবি তুলে দিয়েছিলেন সুনামগঞ্জের মানুষ। মমিনুল মউজদীনের মৃত্যুর পর তাকেই মেয়র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন তারা। অবশ্য আইয়ুব বখত জগলু সে ভরসার প্রতিদান পুরোপুরি দিতে পারেননি। তাকে নিয়ে বিস্তর অভিযোগ পৌরবাসীর মাঝে। বিতর্কিত হয়েছেন ‘কিচেন মার্কেট’ দুর্নীতির ঘটনায়।
পরিবারের পরিচয়ে সবচেয়ে পিছিয়ে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শেরগুল আহমদ। তারও ঘরোয়া পরিচয় আছে। পেশায় শিক্ষক শেরগুল আহমদ বোধহয় সে পরিচয় আড়ালেই রাখতে চাইবেন। তার পরিবারেও এমন ব্যক্তিরা রয়েছেন যাদের নাম বললে একবাক্যে চিনে নেবে পুরো সুনামগঞ্জ। ছোট্ট ও ছিমছাম এ শহরের সুদ ব্যবসার পথিকৃৎ তেঘরিয়ার নূরুল মহাজনের জামাতা তিনি। আর সুনামগঞ্জের আতঙ্ক আওয়ামী লীগ নেতা পরিচয়ধারী জিয়াউল হক তার শ্যালক। পরিবারের পরিচয় হয়তো তিনি দিতে চাইবেন না। দল আর নিজের পরিচয়েই চাইবেন নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে। কিন্তু পরিবারের লোক ঠিকই তার পেছনে ভরসা হয়ে আছেন। অর্থের জোগান দিয়ে ভোটারদের মন ভোলানোর কাজটা ঠিকই করছেন তার শ্যালক সুনামগঞ্জের বালু-পাথর মহালের মহাজন জিয়াউল হক। বাতাসে ভাসছে আগেরবারের নির্বাচনেও শেরগুলের জন্য টাকা ‘বিছিয়ে’ দিয়েছিলেন তিনি।
কে কোন দলের, কার মার্কা কী? ভোটের দিনে বোধহয় সুনামগঞ্জে সেটা খুব বেশি বিবেচিত হবে না। পরিবারের হাওয়ায় যিনি সুনামগঞ্জকে বেশি দোলা দিতে পারবেন কবিতার শহরে বাতি জ্বালার দায়িত্ব বোধহয় তিনিই পাবেন।

শেয়ার করুন