সাদী আর হাফিজের দেশে

18d0c0d9d7aa91940e76b045c81b09b7-Untitled-7ইরান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চাকরি নিয়ে পাড়ি জমালাম শেখ সাদী, হাফিজ ও রুমীর দেশে। সিরাজ নগরীতে এসে মনটা ভরে গেল। কি সুন্দর ফুলের বাগান আর সবুজ গাছের সমারোহ। সারি সারি বাড়িঘর। চারদিকে পাইন ও রাইগাছে ভরা। পাহাড় দিয়ে ঘেরা এক শহর। একটা ট্যাক্সিতে করে শেখ সাদীর সমাধির সামনে এসে নামলাম। ড্রাইভার বললেন, ‘কবি হাফিজের মাজারে যদি যাও তবে আমার গাড়িতেই যেয়ো। আমি অপেক্ষা করব।’
বড় গেট পেরিয়ে আরামগাহে সাদীর মাজার প্রাঙ্গণে মধ্যে প্রবেশ করলাম। ডান পাশে ফারসিতে লেখা ‘আরামগাহে শেখ মোসলেহ্ উদ্দীন আবদুল্লাহ সাদী সিরাজি’ আর নিচে ইংরেজিতে ‘THE TOMB OF SAADI’। প্রধান যে সড়কটি গেট থেকে সাদীর সমাধিতে গেছে তার দুই পাশে নীল স্বচ্ছ পানির ঝরনা। চারদিকে শুধু ফুল আর ফুল। প্রচুর মানুষের সমাগম। বসন্তের আগমনে নারী-পুরুষ ও বাচ্চাদের কলকাকলিতে ভরে আছে আরামগাহের সবুজ চত্বর। ফুলের মাঝ দিয়ে শেখ সাদীর মাজারের গম্বুজের নিচে এলাম। বিভিন্ন রঙের পাথর দিয়ে ফারসিতে ক্যালিগ্রাফির কাজ করা। অপূর্ব সুন্দর করে তৈরি সাদীর আরামগাহ। চারদিকে হাজারো রংবেরঙের ফুলের গাছ। লম্বা বারান্দা পার হয়ে জিয়ারতগাহে প্রবেশ করলাম।
ঘরের মেঝে ও দেয়াল পুরোটাই শ্বেতপাথরে বাঁধানো। তার ওপর খোদাই করে সাদীর বিখ্যাত কবিতার চরণ লেখা। শেখ সাদীর কবরও শ্বেতপাথর দিয়ে মোড়ানো। ওপরে খোদাই করে বুস্তানের একটা কবিতা লেখা। শায়লাকে নিয়ে বেশ কিছু ছবি তুললাম।
এর মধ্যে স্কুলের ছেলেমেয়েরা কবরটি ঘিরে দাঁড়াল। একজন শিক্ষক সাদীর জীবনবৃত্তান্ত ও কর্মের কথা শোনাল। সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। অনেকে আবার আমাদের দিকে কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে থাকলেন। ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষকের সঙ্গে সুন্দর সুর করে সাদীর একটা কবিতা তাল মিলিয়ে আবৃত্তি করল।
কবরের সামনে বসে মনে হলো ছোটবেলায় পড়েছিলাম, সাধারণ পোশাকে কবিকে রাজদরবারে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু পরে ভালো পোশাক পরে আসায় সম্মান পেলেন। তাই তিনি পরিবেশন করা খাবার জামার পকেটে ভরে ছিলেন। রূপকথার মতো সেই গল্প কত শুনেছি, পড়েছি। আজ সেই শেখ সাদীর বাড়ি ও মাজারের সামনে বসে আছি। মাজারের একপাশে সাদীর বাড়ি, যা বর্তমানে জাদুঘর। তাঁর ব্যবহার করা কিছু আসবাব দেখলাম। দেয়ালে শেখ সাদীর অনেক ছবি। তার মধ্যে একটি ছবি বেশ সুন্দর। চার পাশে কাচঘেরা বাক্সে রাখা বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করা ইস্পাহানি কাজ করা পাত্র ও বই। এর মধ্যে শেখ সাদীর বিশ্ববিখ্যাত মহাকাব্য বুস্তান ও গুলিস্তানও দেখলাম।
ফুলে ভরা গোল চত্বরের মাঝে পাথরের ওপর সাদা শেখ সাদীর ভাস্কর্য। সাদা আলখেল্লা ও চাদর গায়ে, পাগড়ি মাথায় মূর্তিটি বই হাতে দাঁড়িয়ে আছে।
মাজারের পেছনে প্রচুর সরু সরু রাইগাছ। সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে হাফিজের সমাধিতে যাওয়ার জন্য বাইরে এলাম। রাস্তার পাশে সেই ড্রাইভার তখনো দাঁড়িয়ে আছেন।

কবি হাফিজের সমাধিসৌধের সামনেহাফিজের সমাধি
কবি হাফিজের সমাধিস্থলেও হাজার রঙের ফুলের বাগান। বাগানের শুরুতেই কবি হাফিজের বুক পর্যন্ত মূর্তি। মাথায় পাগড়ি, লম্বা বাবরি চুল পাগড়ির নিচ দিয়ে ঘাড় বেয়ে পিঠের ওপর গিয়ে পড়েছে। চাপ দাঁড়ি ও গোঁফ। মূর্তিটির পাশ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম।
সাইনবোর্ডে ফারসিতে ‘আরামগাহে খাজে শামস উদ্দীন মোহাম্মদ হাফেজ সিরাজি’ লেখা। এখানকার প্রাকৃতিক শোভা আর ইমারতের কাজ শেখ সাদীর সমাধির চেয়েও সুন্দর। সমস্ত সিঁড়ি ও বারান্দায় বিভিন্ন রঙের ফুলের গাছ। ফুলের মাঝ দিয়ে হাফিজের মাজারের সামনে এলাম। আটটা গোলাকৃতি শ্বেতপাথরের খামের ওপর কালো ছাতার মতো পাথরের গম্বুজ। গম্বুজের ভেতরের অংশে লাল-নীল-সবুজ পাথরের অপূর্ব ইস্পাহানি নকশা। মর্মর পাথরে বাঁধানো কবির কবর। পাথরের ওপর খোদাই করে কবির বিখ্যাত কবিতা লেখা—
‘সমস্ত জাহান সবুজে সবুজে ভরে আছে
এটা তাঁরই (খোদার) কীর্তি
সমস্ত মানুষের মনের মাঝে প্রেম লুকিয়ে আছে
এটা তাঁরই কীর্তি।’
সমাধির সামনের লাইব্রেরিতে প্রচুর পুরোনো বই সাজানো। ছেলেমেয়েরা বসে বই পড়ছে। মাজারের উত্তর দিকে সুন্দর কারুকাজ করা হাফিজের বাড়ি। হাফিজের সমাধি থেকে এবার ইরানের পুরোনো রাজধানী তাখ্তে জামছিদ দেখতে চললাম।-রুহুল কুদ্দুস

শেয়ার করুন