মহামানব (সা.)’র আগমন ও প্রত্যাগমন আজ

062_muhammad_saw_-_maribershalনোমান বিন আরমান : আগমনের দিন আর বিদায়ের দিন এক হয়ে গেল সময়ের মোহনায়। সেদিন আজকের দিন। বারোই রবিউল আউয়াল – আনন্দ বেদনার এক যোগল দিন। অশ্রুর দিন। খুশির দিন। মহামানবের জন্ম ও ওফাতের দিন। ৫৭০ সালের রবিউল আউয়ালের এই দিনে সর্বশেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ সালালাহু আলাইহি ওয়াসালাম জন্মগ্রহণ করেন। আবার ৬৩৩ সালের রবিউল আউয়ালের এই দিনে ৬৩ বছর বয়সে দুনিয়া থেকে বিদায় নেন সর্বশেষ নবী। তাই এ দিনে যেমনি আনন্দ আছে। তেমনি বিপুল বেদনাও।

রাসূলের পুরো জীবন মাত্র ৬৩ বছরের। এর মধ্যে নবী জীবন ২৩ বছরের। ৪০ বছর বয়সে তাঁর কাছে প্রথম ওহি আসে, পড়ুন। এইভাবেই পড়ার বারতা নিয়ে ইসলামের আলোক যাত্রা। বিশ্বময় জ্ঞানের আলো ছড়ানোর সর্বাকালীন এক কবিতার উদ্বোধন। এ কবিতা শুধু কাব্য নয়, বর্ণ নয়। জীবনের শাশ্বত এক পয়গাম। উত্তরণের আহ্বান। এই আহ্বানই মরুর উষ্ণ বালুকে ¯স্নিগ্ধ করে কবিতার শুদ্ধজলধারায় পথ হাঁটে পৃথিবীর। সব খরখোটোকে ভাসিয়ে দেয় মুহূর্তে। ধারণ করে শুধু বিশুদ্ধ জল। যে জলের তৃষ্ণায় আকুল ছিল পুরো সৃষ্টি। মানবকুল।

প্রতিবন্ধকতা তাঁকে মোকাবেলা করতে হয়েছে। কিন্তু কখনো প্রতিহিংসা তাঁকে প্রভাবিত করতে পারেনি। সহায়, স্বজন, মাতৃভূমি – ছেড়েছেন সব। আঘাতে আঘাতে রক্তাক্ত হয়েছেন। কিন্তু যখন বিজয়ী হলেন; ফিরে এলেন, তখনো তিনি তাঁর মতই। কোথাও এতটুকু আঘাত করলেন না। কাউকে সন্ত্রস্ত রাখলেন না। ঘোষণা করলেন, মানুষ মাত্রই আজ সকলেই সমান। কেউ কারো উপর কোন অন্যায় করবে না। কেউ কারো কাছে অন্যায়ের শিকার হবে না। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য থাকবে না। কেউ অবৈধভাবে সম্পদের মালিক হতে পারবে না। পুরো সম্পদ কাউকে কুক্ষিগত করে রাখতে দেওয়া হবে না।

বললেন, প্রত্যেকেরই দায়িত্ব আছে। সকলইকেই নিতে হবে দায়িত্ব। কেউ কারো দায়িত্ব পালনে অবহেলা করবে না। শ্রমিক কাজে ফাঁকি দেবে না। মালিক পারিশ্রমিক আদায়ে বিলম্ব, ত্রুটি করবে না। এটা অন্যায়, শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নারীকে নারী বলে অসম্মান করা যাবে না। সেও মানুষ। একজন পুরুষের মতই সেও সম্মান ও মর্যাদায় বেঁচে থাকার অধিকার রাখে। এটা কারো অমান্য করার সুযোগ নেই। সে নারী বলে কোন পুরুষের দাসী নয়। কেউ তাকে কষ্ট দেবে না। যে তার মাকে কষ্ট দেবে, সে জান্নাতে যেতে পারবে না।

বললেন, মানুষে মানুষে বর্ণ বৈষম্য চলবে না। কালো বলে কাউকে অসম্মান করা যাবে না। ত্বকের রঙের বিচারে কাউকে শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া যাবে না। সম্মানের নিক্তি হবে তার কাজ। যে ভালো কাজ করবে, সেবা করবে, জ্ঞান বিতরণ করবে, আর্থমানবতাকে সহযোগিতা করবে, অন্যায়কে প্রতিহত করবে, ন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রাণপণ চেষ্টা করবে- সেই সফল। কেবল সেই শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী।

বললেন, প্রতিবেশীকে ক্ষুধার্ত রেখে যে নিজে পেট পুড়ে খাবে, মানুষকে কষ্ট দেবে, ওজনে কম দেবে, পণ্যে ভেজাল মেশাবে, পঁচা পণ্য বাজারজাত করবে, দাম বাড়ানোর ফন্দিতে মজুদ বাড়াবে- সে বিশুদ্ধ মানব (মুমিন) হতে পারবে না। তার জন্য কোন কল্যাণই অবশিষ্ট থাকবে না। অপেক্ষা করবে অন্তহীন দুর্ভোগ, অসহনীয় যন্ত্রণা। আর অপরাধীদের শাস্তি দিতে ‘তিনি’ মোটেও কৃপা করেন না।

বললেন, তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সে-ই, যে শিক্ষা দেয় এবং শিক্ষা গ্রহণ করে। একজন মানুষকে যে অনুগ্রহ করবে, আল্লাহ তাকে অনুগ্রহ করবেন। সৃষ্টিকে যে সেবা দেবে, পুরো সৃষ্টিকে তার সেবায় নিয়োজিত করা হবে। একটি প্রাণ যে রক্ষা করবে, পুরো বিশ্বকেই সে রক্ষা করবে। একটি প্রাণ যে কেড়ে নিবে, পুরো বিশ্বকেই সে হত্যা করবে।

এইভাবে ২৩ টি বছর মানুষে মানুষে ব্যবধান কমাতে তিনি কাজ করে গেলেন। মানুষকে ‘মানুষ’ করে তুলতে নিরন্তর প্রয়াস চালালেন। একসময় তাঁর ডাক পড়ল। তিনি তৈরি হলেন চলে যাবার জন্য। সকলকে ডাকলেন, স্বভাব নরম ও স্পষ্ট কণ্ঠে তিনি বললেন, আমি হয়ত তোমাদের মধ্যে আর থাকবো না। তোমরা সাক্ষী থেকো, আমি আমার দায়িত্ব পালন করে গিয়েছি। পরিবর্তন ও উত্তরণের বারতা পৌঁছে দিয়েছি। যে প্রভু এবং আমার বারতা অবলম্বন করবে, সে কৃপা পাবে। যে এর অন্যথা করবে, তাকে শুধু দুর্ভোগই দেওয়া হবে। তোমাদের জন্য অবৈধ করা হল নিরপরাধের রক্ত, অকারণ হত্যা। আগের সব রাস্তা থেকে তোমাদের ‘সীরাতে মুস্তাকিমে’ উত্তরণ করানো হল। আজ থেকে এই পথই পথ। আর সব কিছুকে তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হল। তোমরা কাউকে ঠকাবে না। কারো সাথে প্রতারণা করবে না। কাউকে সুদ দেবে না। কারো সাথে ভ্যাবিচার করবে না। কোন নারীকে অন্যায় ঈঙ্গিত করবে না। আমার এই আহ্বান তোমরা এখানে যারা আছো তারা অনুপস্থিতদের কাছে পৌঁছে দিয়ো। দলে দলে মানুষ তার আহ্বানে সাড়া দিল। তাঁর পরশে ধন্য হলেন মানবেরা।

৬৩৩ সালের ১২ রবিউল আউয়াল ২৩ বছরের জীবনের দায়িত্বভার দিলেন মানুষের হাতে। কামনা করলেন, মানুষের ‘মানুষ’ হয়ে ওঠার। বিদায় নিলেন মহামানব।

শেয়ার করুন