বিশ্বজুড়ে কালোটাকার যত স্বর্গ

51e1a3f987725-Untitled-5আপনি অবৈধ উপায়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হলেন। কর নথিতে কিছুতেই দেখানো সম্ভব হচ্ছে না। আবার দেশে রাখলেও ভয় আছে—কখন কোন ঝামেলায় পড়েন। এমন কালোটাকা রাখার জন্য বিশ্বের অনেক দেশই পরোক্ষভাবে আহ্বান জানায়। এ দেশগুলোকে ‘করের স্বর্গ’ বলা হয়, যেখানে অনেকটা নিরাপদে থাকে কালোটাকা। এ দেশগুলো এমনভাবে আইনকানুন করে রেখেছে, যাতে আপনার টাকার সন্ধান পাবে না কেউ।
উন্নত দেশগুলোই কালোটাকা রাখার স্বর্গ হিসেবে বেশি পরিচিত। আর এর শীর্ষস্থানে রয়েছে সুইজারল্যান্ড। পরের চারটি স্থানে রয়েছে যথাক্রমে হংকং, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর ও ক্যামান আইল্যান্ডস।
২০১৫ সালের বিশ্ব আর্থিক গোপনীয়তার সূচকে এ চিত্র উঠে এসেছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ট্যাক্স জাস্টিস নেটওয়ার্ক (টিজেএন) এ সূচকটি প্রকাশ করেছে। ৯২টি দেশের ওপর এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। তবে বাংলাদেশ এ তালিকায় নেই।
দুটি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে এ সূচকে দেশগুলোর অবস্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। একটি দেশ তাঁদের দেশের রক্ষিত অর্থ ও সম্পদ কীভাবে আইন, বিধিমালা দিয়ে সুরক্ষা দেয়। সেই দেশটি আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থার সঙ্গে কতটা সম্পৃক্ত, দেশটি কতটা আর্থিক সেবা দেয়—সেটাও আরেকটি বিবেচ্য বিষয়। অফশোর ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসই হলো অর্থ পাচারের অন্যতম প্রধান উপায়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বর্তমানে সারা বিশ্বে ২১ থেকে ৩২ ট্রিলিয়ন ডলার রয়েছে, যা কর দেওয়া হয়নি কিংবা স্বল্প কর দেওয়া হয়েছে। এ বিপুল অর্থই কালোটাকা। এর মধ্যে প্রতিবছর গড়ে ১ থেকে ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন টাকা এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাচার হয়।
এবার জানা যাক, কালোটাকা রাখার শীর্ষ পাঁচটি দেশের হালচাল।
সুইজারল্যান্ড: বিশ্ব আর্থিক গোপনীয়তার সূচকের প্রতিবেদনে সুইজারল্যান্ডকে করের স্বর্গের ‘গ্র্যান্ডফাদার’ হিসেবে মন্তব্য করেছে। দেশটির বিভিন্ন ব্যাংকে সাড়ে ৬ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পদ রয়েছে, যার ৫১ শতাংশই অন্য দেশ থেকে পাচার কিংবা অন্য উপায়ে এসেছে। আর সূচকে থাকা দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক যত আর্থিক লেনদেন বা সেবা দেওয়া হয়, তার ৫ শতাংশের বেশি সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে হয়। এ দেশটিতে যেমন অর্থ পাঠানো হয় বেশি, আবার সেই অর্থ সুরক্ষিতও থাকে।
হংকং: দ্বিতীয় স্থানে থাকা হংকংকে বলা হয় বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল করের স্বর্গ। দেশটির ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনায় ২ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ নগদ অর্থ বা সম্পদ রয়েছে। আর সূচকভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে আর্থিক লেনদেন বা সেবার ৪ শতাংশই হয় হংকংয়ের সঙ্গে। শিপিং ও সাধারণ ব্যবসাই (ট্রেডিং) হংকংয়ের অর্থনীতি গড়ে তুলেছে। তাই টাকা পাচারের ক্ষেত্রে হংকংকে বলা হয় এশিয়ার পোস্ট অফিস।
যুক্তরাষ্ট্র: কালোটাকার আরেক স্বর্গ যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির কোনো ব্যাংকে একজন বিদেশি টাকা রাখলে, এর মুনাফার ওপর কর দিতে হয় না। এমনকি সেই অর্থ বিনিয়োগও করতে পারেন ওই বিদেশি। ১৯৬৬ সাল থেকে এ সুবিধা তুলে দেওয়ার কথা শুরু হলেও এখন পর্যন্ত তা করেনি যুক্তরাষ্ট্র সরকার। বরং সিনেটের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের সুবিধা তুলে দেওয়া হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের ব্যালান্স অব পেমেন্টের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এ প্রসঙ্গে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় ব্যালান্স অব পেমেন্টে নেতিবাচক প্রভাবের উদাহরণ টানা হয় প্রতিবেদনে।
গোপনীয়তার সূচকটিতে বলা হয়েছে, কর সুবিধা পাওয়াই মূলত পাচার করে আনা অর্থের মালিককে উৎসাহিত করে। এ ছাড়া শিল্পোন্নত দেশগুলোর সংগঠন ওইসিডির সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক আর্থিক লেনদেনের তথ্য-উপাত্ত বিনিময়ের চুক্তি রয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এ চুক্তিতে সই করেনি। এটাও টাকা পাচার হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সারা বিশ্বে যত আর্থিক লেনদেন বা সেবা বিনিময় হয়, এর প্রায় এক-পঞ্চমাংশই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হয়।
সিঙ্গাপুর: অর্থ পাচারের সুযোগ নিয়ে সিঙ্গাপুর সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘আমরা তোমার অর্থ চুরি করব না, কিন্তু তুমি যদি কারও অর্থ চুরি করে আনো, তবে আমরা তোমার পক্ষে অন্ধভাবে থাকব।’ এতেই বোঝা যায়, সিঙ্গাপুর কালোটাকা রাখার জন্য কতটা সহায়ক। কালোটাকা রাখার সুযোগ-সুবিধায় চতুর্থ স্থানে রয়েছে দেশটি। সিঙ্গাপুরকে বলা হয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থ পাচারের ‘গেটওয়ে’। সিঙ্গাপুরে যত ব্যাংক রয়েছে, এর ৯৫ শতাংশই বৈদেশিক বাণিজ্যিক লেনদেন করে থাকে। আর সিঙ্গাপুরে প্রায় ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ ব্যবস্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ সিঙ্গাপুরের নিজস্ব সম্পদ। বাকিটা বিদেশিদের।
বিশ্বের ৬১টি দেশ ওইসিডি কমন রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড সনদে সই করেছে। কিন্তু সিঙ্গাপুর এখনো করেনি। সত্তরের দশক থেকে সিঙ্গাপুরে কালোটাকা রাখার সুযোগ প্রসারিত করা হয়। সেই সময়ে সিঙ্গাপুরকে এশিয়ার অন্যতম বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়।
ক্যামান আইল্যান্ডস: ক্যারিবীয় অঞ্চলের একটি ছোট দ্বীপ। আয়তন মাত্র ২৬৪ বর্গকিলোমিটার। এ দ্বীপটিতে মানুষের চেয়ে কোম্পানি বেশি। যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রণাধীন এ দ্বীপের জনসংখ্যা মাত্র ৫৬ হাজার ৭৩২ জন। কিন্তু এ দ্বীপটিতে নিবন্ধিত কোম্পানি রয়েছে ৯৫ হাজার। আর ব্যাংক রয়েছে ২১০টি। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপির) ৫৫ শতাংশ আসে ব্যাংকিং সেবা থেকে। এতেই বোঝা যায়, এ দ্বীপটির আর্থিক লেনদেন সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে কতটা লোভনীয়। পাচার করা অর্থ রাখার ক্ষেত্রে এ দেশটি পঞ্চম স্থানে রয়েছে।
২০১৫ সালের বিশ্ব আর্থিক গোপনীয়তার সূচকে বা কালোটাকা রাখার ক্ষেত্রে ষষ্ঠ থেকে দশম স্থানে রয়েছে যথাক্রমে লুক্সেমবার্গ, লেবানন, জার্মানি, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। অন্যদিকে উন্নত দেশগুলোর মধ্যে ফিনল্যান্ডে কালোটাকা রাখা বা পাচার করা সবচেয়ে কঠিন। ৯২টি দেশের মধ্যে ফিনল্যান্ডের অবস্থান ৯০তম।

শেয়ার করুন