বছরজুড়ে আলোচিত

Saltamami-2015-sm20151218141549বিশেষ প্রতিবেদক : বিদায়ী ২০১৫ সালে বাংলাদেশে বেশ কিছু আলোচিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। এ নিয়ে সমালোচনা-বিতর্ক হয়েছে নানা মহলে। তেমন কিছু আলোচিত বিষয় নিয়েই সালতামামি।

বছরজুড়ে জঙ্গি বিতর্ক
২০১৫ জুড়ে প্রায় সবার মুখে মুখে ছিল এক বিতর্ক। আইএস আছে নাকি নেই? বছরজুড়েই আইএস নিয়ে সরকারের একেক মহল থেকে একেক ধরণের বক্তব্য পাওয়া গেছে। কখনো বলা হয়েছে, দেশে আইএসের অস্তিত্ব রয়েছে। কখনো বা আইএস ‘সন্দেহ’। তাই বছর শেষ হলেও পিছু ছাড়েনি এ বিতর্ক। দেশে ব্লগার ও বিদেশি খুন, শিয়া-কাদিয়ানি মসজিদে বোমা হামলা, শিয়ার তাজিয়া মিছিলে হামলাসহ বেশ কিছু ঘটনায় আইসের নামের ‘দায় স্বীকারের’ বার্তা নিয়ে জোর বিতর্ক হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্ট করে বলেছেন, দেশে আইএসের কোনো তৎপরাতা নেই। আইএস আছে, এমন স্বীকারোক্তি দিতে তার ওপর চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে।

ঘটনাবহুল জানুয়ারি
২০১৫ সালের জানুয়ারি মাস নানা কারণে ছিল ঘটনাবহুল। অবরোধ আর আন্দোলনে উত্তাল ছিল রাজনীতির ময়দান। ১ জানুয়ারি হরতাল দিয়ে শুরু হয় নতুন বছর। জামায়াতের ডাকা ৪৮ ঘণ্টার হরতালের দ্বিতীয় দিন ছিলো ১ জানুয়ারি। ৫ জানুয়ারি সংঘাতে অশান্ত হয়ে পড়ে দেশ। নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ হন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। ৬ জানুয়ারি আটক করা হয় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে। ১২ জানুয়ারি ক্রিকেটের তিন ফরমেটে বিশ্ব সেরা নির্বাচিত হন বাংলাদেশের ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান। ১৭ জানুয়ারি কালজয়ী গান ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’গানের লেখক গোবিন্দ হালদার মারা যান। ১৯ জানুয়ারি অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত হন খালেদা জিয়া। ২৪ জানুয়ারি মারা যান বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো।

বাস্তবের পথে ডিজিটাল বাংলাদেশ
সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে গত সাড়ে ছয় বছরে দেশে তথ্যপ্রযুক্তি উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটেছে। দেশে ইন্টারনেট ব্যবহার বেড়েছে অনেক। শহরাঞ্চলে ঘরে ঘরে ইন্টারনেটের উপস্থিতি ছাড়াও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও এর উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি থেকে শুরু করে রেজিস্ট্রেশন এবং ফল নিজেরাই কম্পিউটার বা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে জানতে পারছে। বিদেশে যাওয়ার ভিসার আবেদনপত্র ঘরে বসেই পূরণ করছেন অনলাইনে। দেশের ৯৯ ভাগ এলাকা মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতায় এসেছে। দেশে থ্রি-জি প্রযুক্তির মোবাইল নেটওয়ার্ক চালু করা হয়েছে। ফোর-জি প্রযুক্তি অচিরেই চালু করা হবে। তরুণ তরুণীদের হাতের মুঠোয় ইন্টারনেট। পৃথিবীটা তাদের হাতের মুঠোয় এসেছে ইন্টারনেটের কল্যাণে। এখন গ্রামাঞ্চলের তরুণরা ইন্টারনেট ব্যবহারে অনেক এগিয়ে গেছে, যা গত কয়েক বছর আগেও কল্পনা করা যায়নি।

সাকা, মুজাহিদ ও কামারুজ্জামান
বছরের শুরু থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত আলোচনায় ছিল মানবতাবিরোধী অপরাধী জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামান। বছরের শেষ দিকে জামায়াতের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনালের আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিচারকার্যক্রম ও ফাঁসির রায় কার্যকরও ছিল সুপ্রিমকোর্ট তথা দেশের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়।

শিশু রাজন ও রাকিব হত্যাকা-
রাজন হত্যা : সিলেটের জালালাবাদ থানার বাদেয়ালি গ্রামের আজিজুর রহমান ও মা লুবনা আক্তারের ১৩ বছর বয়সী ছেলে সামিউল আলম রাজন। সবজি বিক্রেতা শিশু রাজনকে গত ৮ জুলাই নগরীর কুমারগাঁওয়ে চুরির অভিযোগ তুলে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে নির্মমভাবে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে সৌদি প্রবাসী কামরুল ইসলাম ও তার সহযোগীরা। রায়ে আসামিদের মধ্যে কামরুল ইসলাম, ময়না চৌকিদার, তাজউদ্দিন আহমদ বাদল ও জাকির হোসেন পাভেল আহমদের ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। রাজনকে নির্যাতনের দৃশ্য ভিডিওধারণকারী নূর মিয়াকে যাবজ্জীবন সাজার রায় দেন আদালত।
রাকিব হত্যা : ৩ আগস্ট খুলনার দিনমজুরে আলমের ছেলে ১২ বছরের শিশু রাকিব হাওলাদারকে পেটে হাওয়া দিয়ে খুন করা হয়। শিশু রাকিব টুটপাড়া কবরখানা এলাকায় শরীফের মোটরসাইকেল ওয়ার্কশপ ‘শরীফ মটর্সে’কাজ করত। রাকিব মৃত্যুর কিছুদিন আগে ঐ গ্যারেজ ছেড়ে পিটিআই মোড়ে আরেকটি গ্যারেজে কাজ নিলে শরীফ মটর্সে মালিক মিন্টু মিয়া ক্ষুব্ধ হয়ে মলদ্বার দিয়ে বাতাস ঢুকিয়ে তাকে হত্যা করে। পরে মামলার তিন আসামির মধ্যে শরীফ মটর্সের মালিক শরীফ ও মিন্টু মিয়াকে মৃত্যুদ- দেন আদালত। আর শরীফের মা বিউটি বেগমকে খালাস দেওয়া হয়।
বছরজুড়ে আলোচিত ছিল ব্লগার হত্যা
বছর জুড়ে জঙ্গি সংগঠনগুলোর প্রধান টার্গেটে ছিল মুক্তমনা লেখক ও ব্লগাররা। জঙ্গি হামলায় এ বছরটিতে নিহত হয় ৫ জন ব্লগার। একে একে ৫ ব্লগার ও লেখকের হত্যার পর নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টিও জোর আলোচনায় ওঠে আসে।
ব্লগার হত্যার বেশ কয়েকটিতে দায় স্বীকার করে ঘটনায় বিবৃতিও দেয় জঙ্গি সংগঠনগুলো। তবে ব্লগার হত্যাকা-ে জঙ্গি হামলার পাশাপাশি একটি ছাত্র সংগঠনকেও দায়ী করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।

নির্যাতনের শিকার ৩৩৩৬ নারী ও কন্যাশিশু
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুসারে, ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ধর্ষণের ঘটনাসহ মোট ৩ হাজার ৩৩৬ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন মোট ৮২৬ জন, গণধর্ষণের শিকার ১৫৮ জন এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭১ জনকে।

সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা
বিদায়ী এ বছরটিতে আলোচিত ছিল সীমান্ত হত্যার বিষয়টি। চলতি বছরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে ও শারীরিক নির্যাতনে ৫৭ বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। অপহরণের শিকার হয়েছেন ৮৭ জন। অপহরণের পর ফিরে আসতে পেরেছেন মাত্র ২৭ জন। এছাড়া গুলি ও নির্যাতনে আহত হয়েছেন শতাধিক বাংলাদেশি নাগরিক। হত্যার ঘটনাগুলোতে বরাবরের ন্যায় বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে গরু পাচারের অভিযোগ তুলেছে বিএসএফ।

আলোচিত বিদেশি হত্যাকান্ড
তাবেলা সিজার হত্যা : ২৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা। গুলশান-২ নম্বরের গভর্নর হাউজের পাশের সড়কে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন ইটালিয়ান নাগরিক তাবেলা সিজার। সিজার ঢাকায় নেদারল্যান্ডস ভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আসিসিও-বিডি এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ঘটনার প্রায় ১ মাস পর ২৬ অক্টোবর সিজার হত্যাকা-ের রহস্য উন্মোচন হয়। সন্দেহভাজন চার হত্যাকারীকে গ্রেফতার করে মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ।
জাপানি নাগরিক হত্যা : ৩ অক্টোবর রংপুরের আলুটারি গ্রামে জাপানি নাগরিক হোশি কুনিওকে হত্যা করে মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা। হত্যাকা-ের দিন বিকেলে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয় হোশি কুনিওর ব্যবসায়িক সহযোগী হুমায়ুন কবির হীরা ও রংপুর মহানগর বিএনপি নেতা রাশেদুন্নবী খান বিপ্লবকে। পরে তাদের গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। অবশেষে জেএমবির মাসুদ রানাকে গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এই হত্যাকা-ের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এছাড়াও রংপুরে সহিংসতা ও হামলার প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথাও স্বীকার করে রানা।

পাদ্রি পিয়েরোকে হত্যা চেষ্টা : দিনাজপুরের মির্জাপুরে ১৮ নভেম্বর সকালে ইতালীয় নাগরিক পিয়েরো পারোলারি সামিওকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। ঐ ঘটনার পর আহত অবস্থায় প্রথমে দিনাজপুরে এবং পরবর্তীতে ঢাকার সিএমএইচে চিকিৎসা শেষে বর্তমানে তিনি আশংকামুক্ত।

জাপানি নারীর রহস্যময় মৃত্যু ও দাফন : আগস্ট মাসে জাপানি নাগরিক হিরোয়ি মিয়াতোকে অপহরণ করে জাকির পাটোয়ারী রতন নামে তার ব্যবসায়িক পার্টনার। ১৯ নভেম্বর তাকে খুন করা হয়। পড়ে জাকিরকে ভারত থেকে আটক করে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনে সিআইডি।
সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা
বিদায়ী এ বছরটিতে আলোচিত ছিল সীমান্ত হত্যার বিষয়টি। চলতি বছরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে ও শারীরিক নির্যাতনে ৫৭ বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। অপহরণের শিকার হয়েছেন ৮৭ জন। অপহরণের পর ফিরে আসতে পেরেছেন মাত্র ২৭ জন। এছাড়া গুলি ও নির্যাতনে আহত হয়েছেন শতাধিক বাংলাদেশি নাগরিক। হত্যার ঘটনাগুলোতে বরাবরের ন্যায় বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে গরু পাচারের অভিযোগ তুলেছে বিএসএফ।

শেয়ার করুন