চায়ের কাপে ধোঁয়া তুলি ঠিকই, কিন্তু…

598a44503fe43c23054df5f7f9549605চৌধুরী আমীরুল হোসেন :

চা বাংলাদেশ, বিশেষ করে সিলেটে খুব বেশি জনপ্রিয় । প্রায় সকল পরিবারের প্রায় সকল মানুষের, চা না খেলেই নয় । ঘুম থেকে উঠে বিস্কুটের সাথে বা মুড়ির সাথে চা খাওয়া লাগবেই । আমরা নিত্যদিন চায়ের কাপে ধোঁয়া তুলি ঠিকই, কিন্তু আমরা কি জানি, যাদের হাত দিয়া এই চা উৎপাদন হয় তাদের জীবনটা কেমন ! তাদের জীবনে রাজ্যের সুখ-দুঃখের ইতিহাস । অবশ্য এখন, জীবনের মান বাড়াইতে তারা কিছুটা হলেও সুযোগ পাচ্ছে ।

আমাদের এই উপ-মহাদেশে চা আবাদ শুরু হয় ১৮৩৯ সালে আসামে। বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে বৃটিশ কোম্পানিগুলো ভারতো চা উৎপাদনের উদ্যোগ নেয়। বাংলাদেশে চা বাগান স্থাপন করা হয় চট্টগ্রামে ১৮৪০ খৃষ্টাব্দে। ১৮৫৪ খৃষ্টাব্দে এদেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চা-বাগান প্রতিষ্ঠা হয় সিলেটের মালনিছড়ায়। বৃটিশ কোম্পানি ভারতের বিভিন্ন এলাকা যেমন, বিহার, উরিষ্যা, মাদ্রাজ, অন্ধ প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, পশ্চিম বঙ্গ ইত্যাদি জায়গা থেকে দরিদ্র নিন্মবর্ণের জনগোষ্ঠীকে চা-বাগানে শ্রমিক হিসেবে নিয়ে আসে । তাদেরকে বলা হয়, ‘এমন একটি সুন্দর পাহাড় ঘেরা দেশে তাদের নিয়ে যাওয়া হবে, যেখানে গাছের পাতা খাঁটি সোনার। আর যদি কেউেএ গাছে ঝাঁকুনি দেয়, তাহললে সোনার পাতা ঝরে পড়বে।’

১৮৫৪ সালে চা শ্রমিকদের সাথে চার বছর মেয়াদি চুক্তি করে বৃটিশ কোম্পানি । এর পর থেকে চা শ্রমিকদের দাসত্বের জীবন শুরু হয়। বৃটিশ আমল থেকে পাকিস্তান আমল পর্যন্ত শ্রমিকদের সাথে মধ্যযুগীয় ভূমিদাসদের মতো আচরণ করা হতো । চা-বাগান শ্রমিকদের সন্তানদের লেখাপড়া করার কোন সুযোগ ছিলো না। বাগান মালিকরা মনে করতো, চা শ্রমিকরা শিক্ষিত হলে বাগানে শ্রমিক পাওয়া যাবে না। এ অবস্থা ছিলো আশির দশক পর্যন্ত। এখন পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে তাদের জীবনে । চা চাষের শুরুর সময়ের ধারণা থেকে এখনও পুরোপুরি মুক্ত অইতে পারেননি এর সাথে জড়িত কর্তারা । সামন্ততান্ত্রিক চিন্তা বা মনোভাব এখনও পোষণ করেন চা বাগানের কর্তারা। তবে পরিস্থিতি যে দ্রুত বদলি যাচ্ছে , তা চা-বাগান সরজমিনে ঘুরলে বুঝা যায় ।

এখন চা শ্রমিকদের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করে নানা পেশায় যোগ দিচ্ছে। অন্যান্য পেশায় ঢুকতে পারলেও চা-বাগানে তাদের ভালো চাকরি হয় না। চা বাগানের শ্রমিকদের আগে বাগানের মালিক বা ম্যানেজারকে দেবতার মতো কুর্ণিশ করা লাগতো । আশির দশকের গোড়ার দিকেও চা বাগানের মালিক ও ম্যানেজারকে চা শ্রমিকদের মাটিতে উপুর হয়ে প্রণাম করতে দেখা গেছে । এখন আগের পরিস্থিতি নেই। তারা এখন পড়ে বাংলা মিডিয়ায়। চা শ্রমিকেরা তাদের কষ্টে উপার্জিত অর্থে পড়াচ্ছে সন্তানদের । বাংলা মিডিয়ায় লেখা-পড়া করে তারা চাকরি পাচ্ছে সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে । ফলে চা শ্রমিক পরিবারের সচ্ছলতা বাড়ছে ।

চা চাষের উপযোগী সরকারি জমি আগে যা ছিল এখনও তা-ই আছে । বেসরকারি উদ্যোগে পঞ্চগড় জেলায় কিছু জমিতে চা চাষ হচ্ছে। ১৯৬১ সালের তুলনায় চা-উৎপাদন বাড়ছে প্রায় আড়াই শতাশং । অভ্যন্তরীণ বাজারে চায়ের চাহিদা বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে।

১৯৯৭-৯৮ অর্থ বছরে যেখানো দেশে মাথাপিছু চায়ের চাহিদা ছিল ২৩০ গ্রাম, এখন তা বেড়ে হয়েছে মাথাপিছু প্রায় ৪৫০ গ্রাম। কিছুদিন আগে এক রিপোর্টে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, অভ্যন্তরীণ চাহিদা যদি এ-হারে বাড়তে থাকে, তা হলে ১৯১৫ সালে অর্থাৎ চলতি বছরের পর বাংলাদেশকে চা আমদানি করতে হবে। তাছাড়া চা বাগানে আবাদ হচ্ছে রাবার, লেবু, আনারস ইত্যাদি। এভাবে চলতে থাকলে এদেশ থেকে চা রপ্তানি বন্ধ যাবে।

সরকারিভাবে চা-বাগান লিজ দেওয়া হয় ২৯ টা শর্তে। শর্ত ভঙ্গ করে রাবারসহ অন্যান্য ফসল আবাদ করা হচ্ছে। এর জন্য কোন শান্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়না। জাতীয় সম্পদ চা বাগান রক্ষা আর চা শ্রমিকদের জীবনের মান বাড়াতে সরকারি বেসরকারি উদ্যোগ নেয়া দরকার।

অন্যদিকে, চীন এবং ভারতের পাশাপাশি ভিয়েতনাম, আর্জেন্টিনা, অস্টেলিয়া এবং কেনিয়াতে চায়ের আবাদ ও উৎপাদন বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। আমাদের জমি কম। তবে মাটি উর্বর। এর জন্য বিকল্প চিন্তা ভাবনা দরকার । যেমন, শ্রীলঙ্কায় চা বাগানকে সমবায় ভিত্তিতে শ্রমিকদের মাঝে বন্টন করে দেয়ায় চায়ের উৎপাদন বেড়েছে। চা নিয়ে আরও নিবিড় গবেষণা দরকার ।

চৌধুরী আমীরুল হোসেন

চৌধুরী আমীরুল হোসেন

চা শ্রমিকদের বর্তমান মজুরি কাঠামো বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় এখনও চা-শ্রমিকেরা ন্যায্য মজুরি পায় না। প্রতিদিন একজন শ্রমিককে অবশ্যই ২৩ কেজি চা-পাতা উত্তোলন করতে হয়। মজুরি মিলে ৮৫ টাকা। মজুরি ও রেশন মিলিয়ে একজন শ্রমিক দিনে সর্বোচ্চ দেড়’শ টাকা পায়। যেখানো একজন মাটি শ্রমিক বা ক্ষেত মজুরের বর্তমান আয় তিন’শ টাকা। একজন রিক্সা চালকের আয় প্রায় ৪শ টাকা। আমরা চায়ের চটকদার বিজ্ঞাপন চিত্রে একজন চা শ্রমিকের যে সুন্দর চেহারা এবং চকচকে পোষাক দেখি, প্রকৃত চিত্র তার উল্টো । মাঝে মাঝে লাক্কাতুড়া, মালনীছড়া চা বাগানো ঘুরতে যাই। চা শ্রমিকদের দেখলে মনে হয় তারা তারা অপুষ্টির শিকার। পুষ্টিকর খাবার দূরের কথা তারা দু-বেলা পেটভরে খায় কিনা ঠিক নাই । চা শ্রমিকরা নৈমত্তিক ছুটি পায় না। ভারতে ১৮ দিন কাজ করার পর একদিন ছুটি পাইলেও বাংলাদেশের চা বাগানে এই নিয়ম মানা হয় না। চা শ্রমিকদের কাজ না থাকলে রেশনও পায় না।

অবশ্য বিভিন্ন এনজিও চা বাগানো অনেক স্কুল করেছে । বাগানের নিকটবর্তী জনপদে সরকারি স্কুল আছে । আগে বাগানের আশে-পাশে জন বসতি ছিলো না । এখন ওই সব এলাকায় জনবসতি হয়েছে। তাই সরকারি স্কুল স্থাপন হচ্ছে ,রাস্তা পাকা হয়েছে । যান চলাচল করে। চা-বাগানের শ্রমিকদের সন্তানেরা প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে বাগানের স্কুলে । আগে চা শ্রমিকদের ঘৃণার চোখে দেখতো সাধারণ জনগণ। এখন অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। চা-শ্রমিকদের সন্তানেরা এখন সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠে পড়ার সুযোগও পায় ।

আমরা আশা করি, দিনে দিনে চা শ্রমিকদের অবস্থার আরো উন্নতি হবে । সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থা তাদের সহযোগিতায় আরো বেশি এগিয়ে আসবে ।

শেয়ার করুন