সুদের জালে সর্বস্বান্ত এক গ্রামের ৭০ পরিবার

habigang-1426609274সিলেটের সকাল ডেস্ক : হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার রামলোহ গ্রামের ৭০ পরিবার সুদ ব্যবসায়ীর খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে। টাকা দিতে না পেরে কয়েকটি পরিবারে সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে। কুসীদজীবী (সুদখোর) আওয়ামী লীগ নেতার খপ্পর থেকে রেহাই পেতে তারা কী করবে তা বুঝতে পারছে না।

ওই গ্রামের বজলু মিয়া জানান, তিনি সৌদি আরবে থাকতেন। বিদেশ থেকে দেশে আসার পর জরুরি প্রয়োজনে কুসীদজীবী আব্দুল মালিকের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। শর্ত মূল টাকা ফেরত দেওয়ার আগ পর্যন্ত মাসে আট হাজার টাকার কিস্তি দিতে হবে। জামানত হিসেবে দেন দস্তখত করা একটি খালি চেক। কিস্তির টাকা দিতে একটু এদিক-সেদিক হওয়ায় বাড়ত সুদের হার। পরে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা দিয়ে সালিস বিচারের মাধ্যমে মুক্তি পান। এ টাকা দিতে গিয়ে পৈতৃক ১৪ বিঘা জমি বিক্রি করেন। সব কিছু হারানোর পরও সুদের খপ্পর থেকে মুক্তির আনন্দে তিনি গরু জবাই করে শিন্নি বিলান এলাকায়। রামলোহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক কৃষ্ণ দেব জানান, অবসরে যাওয়ার পর জরুরি প্রয়োজনে দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। পরে কিস্তির টাকা দিতে গিয়ে পেনশনের টাকায় কেনা সম্পত্তিসহ সর্বস্ব শেষ করেন। ২৫ লাখ টাকা দিয়ে শেষ হয় ঋণের দায়। এই ঋণের টাকার চিন্তায় মেয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা উমা রানী দেব মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে (স্ট্রোক) মারা যান।

রূপালী ব্যাংক সিলেট করপোরেট শাখার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও ওই গ্রামের বাসিন্দা সফিকুর রহমান বলেন, ‘আব্দুল মালিকের কাছ থেকে ঋণ নিতে হলে ফাঁকা চেকে দস্তখত দিয়ে জামানত দিতে হয়। কিস্তির পরিমাণ হয় লাখে মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। কিস্তি না দিতে পারলে সেই টাকা মূলধনে যুক্ত হয়ে চক্রবৃদ্ধি হয়। আবার অনেক সময় আব্দুল মালিক কিস্তি দিতে নতুন করে ঋণ আনতে পরামর্শ দেন তাঁর স্ত্রীর বড় ভাই রাশেদের কাছে যেতে। এভাবে সুদের চক্রে পড়ে যায় সাধারণ মানুষ। এই চক্রের সঙ্গে আরো কিছু লোক জড়িত। আর কিস্তির টাকা সামান্য বাকি থাকলে ১০ হাজার টাকার স্থলে ফাঁকা চেকে তিন লাখ টাকা লিখে মামলা দায়ের করেন তিনি। মালেকের নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট (এনআই) অ্যাক্টে দায়ের করা একটি মামলার আসামি আমি।’ পাশের বনগাঁও গ্রামের জামাল মিয়া জানান, তিনি ঋণ নেন। সিএনজিচালিত অটোরিকশা বিক্রি করে টাকা পরিশোধ করেন। আরো টাকা দিতে হবে বলে চাপ দিলে এলাকা ত্যাগ করেন। তাঁর স্ত্রী বাড়িতে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। পঞ্চম শ্রেণিপড়ুয়া ছেলে রায়হানকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে পারেন না। নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত মেয়ে তাহমিনা টাকার অভাবে বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না। জামাল বলেন, ‘মেয়েটি প্রতিদিন কান্নাকাটি করে।’

স্থানীয়রা অভিযোগ করে, আব্দুল মালিকের সহযোগী ও তাঁর স্ত্রীর বড় ভাই রাশেদের সঙ্গে রয়েছেন আরো কয়েকজন সুদের ব্যবসায়ী। ফিরোজ মিয়ার কাছ থেকে ৯ হাজার টাকার ঋণ নিয়ে অটোরিকশা বিক্রি করে ৩০ হাজার টাকা দেন বনগাঁও গ্রামের রুহেল মিয়া। এর পরও রুহেলকে টাকার জন্য মারধর করেন ফিরোজ। বাড়ি ঘেরাও করে রুহেলের স্ত্রী ও সন্তানকে অপহরণের চেষ্টা করেন। স্থানীয়রা তাদের রক্ষা করে। প্রাণ ভয়ে রুহেল, বাবা সাধন মিয়া, মা দুদু বিবি ও স্ত্রী রত্না আক্তার সন্তানকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন।

স্থানীয়রা জানান, অভিযুক্ত আব্দুল মালিক ২৫ বছর সৌদি আরবে ছিলেন। সাত-আট বছর আগে দেশে এসে সুদের ব্যবসা শুরু করেন। প্রথমে ছিল অল্প পরিমাণে। তবে সেই টাকা বৃদ্ধি পেয়ে এখন তাঁর মূলধন হয়েছে কয়েক কোটি টাকা।

সরেজমিনে ওই এলাকায় গেলে আব্দুল মালিককে পাওয়া যায় একটি মুরগির খামারে। খামারটিও সুদের টাকা না পেয়ে দখল করা জায়গায় তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। জমির মালিক রামলোহ গ্রামের হারুনুর রশিদ বলেন, ‘এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে কয়েক কিস্তি দেওয়ার পর আর টাকা দিতে পারিনি। ফলে আমার মায়ের নামে রেজিস্ট্রি করা সাড়ে চার লাখ টাকা মূল্যের ১০ শতক জমি দখলে নিয়ে মুরগির খামার গড়ে তুলেছেন মালিক।’ ওই মুরগির খামারে তাঁর সঙ্গে পাওয়া যায় সুদের ব্যবসার সহযোগী ও তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর বড় ভাই রাশেদকে। গজনাইপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি আব্দুল মালিক সুদের বিষয়টি বারবার পাশ কাটিয়ে বলেন, ‘আমি তিনটি ফার্মের মালিক। আমার তিন ভাই বিদেশ থাকেন। বড় বড় নেতা ও সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক।’

গজনাইপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবুল খায়ের গোলাপ বলেন, ‘আব্দুল মালিকের সুদের ব্যবসার কথা জানি। মানুষ বিপদে পড়লে তাঁর কাছে যায়। তবে পরিশোধের সময় ঝামেলা হলে আমার কাছে আসে। এ ব্যাপারে কয়েকটি সালিস বিচার করেছি।’ এ সুদের ব্যবসাকে নিন্দনীয় কাজ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

হবিগঞ্জের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান বলেন, ‘এ ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের বিষয়টি জানা নেই। এ ব্যাপারে কোনো অভিযোগও আসেনি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ ব্র্যাক হবিগঞ্জের ব্যবস্থাপক মো. ফিরুজ ভূঁইয়া বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে যাঁরা সুদের ব্যবসা করেন তাঁরা বেআইনিভাবে তা করেন।’ হবিগঞ্জ উন্নয়ন সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহিন বলেন, ‘ব্যক্তিগত পর্যায়ে সুদের ব্যবসা বেআইনি। এ ব্যাপারে গেজেট আছে এবং আইন আছে।’ হবিগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সফিউল আলম বলেন, ‘সুদের ব্যবসা ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ। সরকারিভাবেও বেআইনি। দিনারপুরে ব্যক্তি উদ্যোগে উচ্চ সুদের যে ব্যবসা করা হচ্ছে তা আমাদের জানা নেই। তবে পুলিশ অথবা জেলা প্রশাসনকে কেউ এ ব্যাপারে অভিযোগ করলে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালক ফজলুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘ব্যক্তি পর্যায়ে সুদের ব্যবসার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনুমোদন নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মাইক্রোক্রেডিট পরিচালনা করা যাবে। তবে তার সুদ হবে সুনির্দিষ্ট। গ্রামে যারা সুদের ব্যবসা করেন এটি এক ধরনের মহাজনি ব্যবস্থা।’

শেয়ার করুন