রেমিটেন্স ও প্রতারিত প্রতিবন্ধী নারী

Openion-1জান্নাতুল ফেরদৌস আইভী

নরসিংদীর আয়েশা খানম (ছদ্মনাম)। ছোটবেলায় পোলিও আক্রান্ত হয়ে আয়েশার একটি হাত প্রতিবন্ধী হয়ে যায়। সেই সময়ে প্রতিবন্ধী শব্দ কেউ বুঝত না, সবাই বলত পঙ্গু। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে আয়েশা পঞ্চম। তার বাবার আর্থিক অবস্থা ও সহায়-সম্পত্তি ভালই ছিল। কিন্তু ভাল হলে কী হবে, শারীরিক প্রতিবন্ধিতার কারণে অন্যান্য ভাই-বোনের চেয়ে পড়ালেখার দিক থেকে সে পিছিয়ে পড়ে। তার তিন ভাইয়ের মধ্যে একজন ডাক্তার, একজন উকিল ও অন্যজন ব্যবসা করে। আর অপর দু’বোনের মধ্যে বিএ পড়ার সময় একজনের বিয়ে হয়ে যায়। সবার ছোট বোনটি এখন আইন বিষয়ে পড়ছে।

তবে শারীরিক প্রতিবন্ধিতা নিয়েও আয়েশা এসএসসি পাস করেছিল। তারপর তার বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর আর পড়ালেখা করা হয়নি। আয়েশা যখন ক্লাস নাইনে পড়ত তখন তাদের পাশের গ্রামের একটা ছেলের জন্য ওই ছেলের পরিবার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে। পাত্র এসএসসি পাস করেনি, ছোটখাটো ব্যবসা করে। আয়েশার বাবা প্রথমে কিছুতেই এ বিয়েতে রাজি ছিলেন না। তারপরও দুই বছর ধরে নাছোড়বান্দার মত ছেলের পরিবার আয়েশাকে পুত্রবধূ করে নিয়ে যাওয়ার জন্য লেগে থাকে। পরবর্তী সময়ে আয়েশার আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে তার বাবাকে বিয়েতে রাজি করানো হয়।

বিয়ের পর আয়েশার স্বামী আর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা সবাই তাকে অনেক আদর করত। বিয়ের পর আয়েশা তার বাবার মুখে শুনতে পায় যে, তার স্বামীকে ইতালি পাঠানোর খরচ দেবে- এই আবদার ছিল তার শ্বশুরবাড়ি পক্ষের। অন্যদিকে আয়েশা শ্বশুরবাড়ির সবার আন্তরিকতায় কোনো ঘাটতি পায়নি বলে সে নিজেও তার বাবা ও ভাইদের মাঝে মাঝে বিষয়টা আরও মনে করিয়ে দিত। সব মিলিয়ে ১০ লাখ টাকা লাগবে, তাই জোগাড় করতে কিছুটা সময় লেগেছিল। বিয়ের পর দু’বছর সময় লেগেছিল তার স্বামীর ইতালি যাওয়ার সব ব্যবস্থা হতে। এই দু’বছরে শ্বশুরবাড়ির কেউ তার সাথে কোনো খারাপ ব্যবহার তো করেই নাই বরং সবার ভালবাসায় আয়েশা যেন ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।

আয়েশার স্বামী ইতালি যাওয়ার পর আজ ৭ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। প্রথম ৫ মাস সে ১২/১৩ বার ফোনে যোগাযোগ করেছে। তবে কখনোই খুশি মনে কথা বলেনি। সব সময় বলেছে যে, অবৈধভাবে বিদেশে গিয়েছে বলে ওয়ার্ক-পারমিট পায়নি। ফলে ভাল কোনো কাজ পাচ্ছে না। তারপর হঠাৎ করেই যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। আর কোনো ফোন করে না। এর বছরখানেক পর থেকে শ্বশুবাড়ির লোকদের ব্যবহারে পরিবর্তন ঘটতে থাকে। এক পর্যায়ে দুর্ব্যবহারের মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে আয়েশা তার বাবার বাড়িতে চলে আসে। তারপর সর্বোতভাবে চেষ্টা করেও স্বামীর সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ করতে পারেনি সে। তবুও আয়েশা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে যে, একদিন তার স্বামী ফিরে আসবে।

এক সময় প্রতিবন্ধীদের অধিকার বিষয়ে সচেতন করার কাজ করে- এমন একটি সংস্থার সদস্য হয় আয়েশা। ওই সংস্থার কাজে ঢাকায় এসে তার যোগাযোগ হয় হাবিবা (ছদ্মনাম) নামের এক নারীর সঙ্গে।

হাবিবা লম্বায় বেশ খাট, ৪ ফুটের মত হবে উচ্চতায়। তাকে ১১ বছর আগে বিয়ে করেছিল অত্যন্ত সুদর্শন একটি ছেলে। বিয়ের পর ১ বছর সংসার করেছে। সেই ১ বছরের একটা দিনও হাবিবার স্বামী ওর উচ্চতা নিয়ে ওকে কোনো খারাপ কথাও বলেনি অথবা নিজেও আক্ষেপ করেনি। হাবিবা অবাক হয়ে যেত, এত ভাল মানুষ এই পৃথিবীতে আছে! হাবিবার স্বামীর ইতালি যাওয়ার খরচ দিয়েছিল তার বাবা আর মামারা। কিন্তু ইতালি যাওয়ার পর থেকে আর কোনোরকম কোনো যোগাযোগ করেনি ওর স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির লোকেরা। এমনিতেই হাবিবার শ্বশুরবাড়ির পরিবারের কেউ তাকে পছন্দ করত না। তাকে তার স্বামী অনেক বেশি ভাল জানত, আর বলত যে, শ্বশুরবাড়ির সবাইও ঠিক হয়ে যাবে যখন যে ইতালি গিয়ে অনেক টাকা উপার্জন করবে।

কিন্তু ঘটল ঠিক তার উল্টো। হাবিবার স্বামী নিজেই কোনো যোগাযোগ করেনি। একদিন, দুইদিন করে মাস, বছর গড়িয়ে গেল। এক এক করে ১০ বছর হয়ে গেল হাবিবার স্বামী একটা দিনের জন্যেও যোগাযোগ করেনি। তিন বছর আগে হাবিবার মামা খবর নিয়ে আসেন যে, তার স্বামী তিন মাসের জন্য দেশে ফিরে আবার বিয়ে করেছে। অনেক টাকা-পয়সা খরচ করে দুই মাসের মধ্যে নতুন বউকে নিয়ে সে বিদেশেও চলে গেছে।

আয়েশা আর হাবিবার মত বাংলাদেশে আরও অনেক প্রতিবন্ধী মেয়ে আছে, যাদের বিয়ের জন্য তাদের পরিবারকে জামাইয়ের বিদেশ যাবার সব খরচ জোগাতে হয়। কিন্তু প্রায় সব প্রতিবন্ধী মেয়ের পরিবারের সাথে জামাই এবং জামাইয়ের পরিবার প্রতারণা করে। ‘যৌতুক’ বললে অন্যায় শোনায়, তাই ‘যৌতুক’ শব্দটা না বলে তারা বলে থাকে ‘বিদেশ যাওয়ার খরচ’।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের ব্যাখ্যা এত আন্তরিক শোনায় যে, প্রতিবন্ধী মেয়েদের পরিবার বিভ্রান্ত না হয়ে পারে না। যেমন : মেয়ের যেহেতু একরকম প্রতিবন্ধী, সে তো সংসারের সব কাজ করতে পারবে না। প্রতিবন্ধী স্ত্রীর সুবিধার জন্যই বিদেশ থেকে অনেক টাকা উপার্জন করা প্রয়োজন। যাতে দুই/একজন কাজের লোক রেখে প্রতিবন্ধী স্ত্রী-কে রাজরানী করে রাখতে পারে। মেয়ের পরিবারের মন দুর্বল থাকে বলে তারা এমন সব মন ভুলানো কথা সহজেই বিশ্বাস করে থাকে, আর প্রতারণার শিকার হয়। এভাবেই এক একটি প্রতিবন্ধী মেয়ের পরিবারের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে শত শত ছেলের পরিবার বিদেশগামী হয়।

এ সব প্রতারক প্রবাসীরা বিদেশ থেকে যে টাকা পাঠায় এতে দেশে রেমিটেন্স বাড়ে ঠিকই কিন্ত এর আড়ালে থাকে এক একটি প্রতিবন্ধী নারীর নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হওয়ার করুণ আর্তনাদ। বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায় য়ে, এ সব মেয়েদের স্বামীকে বিদেশ পাঠাতে যে অর্থ মেয়ের পরিবার দেয়, তা তার পৈত্রিক সম্পত্তির অংশ হিসেবেই তাকে দেওয়া হয়েছে বলে পরবর্তী সময়ে তাকে জানানো হয়। একে তো কন্যা সন্তান এবং তার ওপর প্রতিবন্ধী এ কারণে এ সব মেয়েরা পড়ালেখা বেশি শিখতে পারে না বলে সামগ্রিকভাবে তারা হয়ে পড়ে নিঃস্ব।

অন্যদিকে পারিবারিক ও সামাজিকভাবেও এ সব মেয়েরা হয়ে পড়ে ভীষণ অবহেলিত। স্বামী দীর্ঘকাল কোনো যোগাযোগ করে না, সে ফিরবে কি না, তাও জানায় না। এমন অবস্থায় বেশিরভাগ প্রতিবন্ধী নারীর আর বিয়ে করা হয় না। ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বামী পরিত্যক্তা ও সন্তানহীন হয়ে বেঁচে থাকতে হয় এই নারীদের।

এ ধরনের অনিশ্চিয়তার জীবন ও ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার চেয়ে অনেক বেশি ভাল হতো যদি জামাইকে বিদেশে যাওয়ার জন্য টাকা না দিয়ে সেই টাকা দিয়ে প্রতিবন্ধী কন্যা সন্তানটিকে তার পরিবার পড়ালেখা শেখাতো। আয়েশা কিংবা হাবিবা দেশে থেকে পড়ালেখা শিখে নিজেরা যদি উপার্জন করত, তাহলে সেই উপার্জন নিশ্চিতভাবে ওই রেমিটেন্সের থেকে বেশি অর্থবহ হতো।

লেখক : লেখক ও ফিল্মমেকার

শেয়ার করুন