মোনাজাত ও কাঙাল হরিনাথ

2picঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, মোনাজাতউদ্দিন যখন মারা যান(১৯৯৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর)তখন ছিলেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সভাপতি। মোনাজাতউদ্দিন প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘মোনজাতউদ্দিন ছিলেন উনিশ শতকের হরিনাথ মজুমদারের উত্তরসুরি’। গণযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিকতার গুণী এই শিক্ষকের সেদিনের সেই মন্তব্যে কোনোপ্রকার অতিকথন ছিল না। খাদহীন এক নিরেট সত্য কথা বলেছিলেন তিনি। অবশ্য, ওই সুরে ও স্বরে অনেকেই তাকে মুল্যায়ন করেছেন। মোদ্দা কথায় তাদের অভিমত হল; মোনাজাতউদ্দিন, কাঙাল হরিনাথের গ্রামীণ সাংবাদিকতার ধারাকে নতুন করে শুরু করেছিলেন। প্রায় পৌনে শতবর্ষের ব্যবধানে তিনি কাঙালের দেখানো পথে হেঁটেছেন, এবং সেই পথ ধরে শহরকেন্দ্রীক সংবাদপত্রের নাগরিক সাংবাদিকতার দোর্দণ্ডপ্রতাপের মধ্যেও গ্রামীন সাংবাদিকতায় নিজের স্থান ও সংবাদ মূল্য আদায় করে নিয়েছেন। মোনাজাতউদ্দিনের সাংবাদিকতার টোটাল জার্নিটা যদি আমরা লক্ষ্য করি, তাহলে দেখা যাবে, উপর্যুক্ত মূল্যায়ন-মন্তব্য মোটা দাগে যথার্থ ও গ্রহণযোগ্য মনে হলেও সুক্ষ্ণ ও প্রকৃত বিচারে নয়। মোনাজাতউদ্দিন, অবশ্যই গ্রামীণ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের উত্তরসুরি, তবে অন্যরকমের। যা একান্তই মোনাজাতের আপন সৃষ্ট পথ।  তাদের লড়াই, সাংবাদিকতার ধরণ, সংবাদ লিখন-সংগ্রহ অনেকাংশেই একরকমের ছিল না। এ কথন যে শুধু সময়-সমাজ-রাষ্ট্র আর স্বাধীনতা-পরাধীনতা বিবেচনায় তা নয়। কাঙাল হরিনাথ ছিলেন মালিক-সম্পাদক-প্রকাশক-সাংবাদিক। শাদাচোখে আমরা যদি এই বিষয়টাকেই একটু তলিয়ে দেখি তাহলেই দুজনের স্বতন্ত্রতা স্পষ্ট হয়। কেননা, মোনাজাত ছিলেন শুধুই সাংবাদিক(কিছুদিনের জন্য মোনাজাত অবশ্য সম্পাদক-সাংবাদিক হয়েছিলেন, কিন্তু মালিক নয়। রংপুর থেকে প্রকাশিত ওই পত্রিকাটির নাম ছিল ‘দৈনিক রংপুর’, এতে একটি সাহসী প্রতিবেদন প্রকাশ করায় মালিকপক্ষ পত্রিকাটি বন্ধ করে দেন। তাছাড়া যে মোনাজাতউদ্দিন আমাদের চিরপ্রণম্য ও সাংবাদিকতার পূণ্যনাম সেটি তিনি হয়েছিলেন শুধুই সাংবাদিকতা দিয়ে, অন্য কোন পরিচয়ে নয়।) সাংবাদিকতার অন্দরমহলের যারা খোঁজ-খবর রাখেন তারা জানেন, একটি সংবাদ কত হাত ঘুরে আসে, কত তার গেটকীপার। কাঙাল হরিনাথের ক্ষেত্রে এসবের কোন বালাই ছিল না। তিনি সাহস করে, সাংবাদিকতার দায় ও দায়িত্ব থেকে যে সংবাদ পরিবেশন করতে চেয়েছেন, তাই-ই ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’য় প্রকাশ করেছেন। হ্যাঁ সংবাদ প্রকাশের দায়ে তাকে অনেকেরই কোপানলে পড়তে হয়েছে, শারীরিক আঘাত থেকে কোনোক্রমে রেহায় পেলেও মানসিক আঘাতে ধ্বস্ত হতে হয়েছে বারংবার। মোনাজাতউদ্দিনকেও এসবের মুখোমুখি হতে হয়েছে, এমনকি জীবন দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন প্রকৃত সাংবাদিকতায় ঝুঁকির কোন বিকল্প নাই। কিন্তু জীবদ্দশায় মোনাজাতকে সামাল দিতে হয়েছে দুটি পক্ষকে। সংবাদ সংগ্রহ এবং সংবাদ প্রকাশ উভয়ের ক্ষেত্রে তাকে প্রতিনিয়ত সুতোর ওপর দিয়ে হাঁটতে হয়েছে। এই চলার ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা শাদা-কালোয় মিশ্রিত, ব্যক্তি জীবন নানান ভাবে ক্ষতাক্ত, আশাহত এমনকি অভূক্তও। কিন্তু আমরা মনে করি, সাংবাদিক মোনাজাত এখানে সফল ও দ্ব্যার্থহীনভাবে সবার জন্য অনুকরণীয় এক আদর্শ। যদিও ওই পথে ফুলের সৌরভ ছিল না, ছিল কাঁটা আর কঙ্করের প্রাবল্য। বিশিষ্ট সাংবাদিক ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়েনের একাংশের সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুলকে লেখা একটি চিঠি পাঠ করলে মোনাজাতের দুঃখ-কষ্ট ও লড়াইয়ের জমিনটা জানার পাশাপাশি চেনাও যায়। ‘আপনার বা আপনার মতো প্রগতিশীল সাংবাদিকের কল্যাণে সাংবাদিকতা অনেকদূর এগিয়েছে। কিন্তু অপর একটি শ্রেণী, তাকে পেছন থেকে টেনে রাখতে চায়। আমি জানি আমার কাজ আপনার কাছে অবমূল্যায়িত হয় না। সে কারণেই বলি, একবার আপনি বলূন, কেজি মুস্তাফা সাহেব (সংবাদ সম্পাদক, পরবর্তিতে মুক্তকণ্ঠের সম্পাদক হন, বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় তার প্রভূত অবদান অনস্বীকার্য।) ঐ খবরটি ৫-এর পাতায় দেবার সিদ্ধান্ত জানিয়ে কি ঠিক করেছেন? …আমাকে আপনি যে মূল অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছিলেন, তা সম্পণ্ন করার পর এটা ছিল একটা নিজের আগ্রহে তৈরি করা বিশেষ প্রতিবেদন। চোখের সামনে দেখেছি, সারের অভাবে ধানক্ষেত শুকিয়ে খড় হয়ে যাচ্ছে। সেটা লিখবো না? ঐ খবরটি তৈরি করতে কতো রক্ত পানি হয়েছে সেখবর কেজি মুস্তাফা সাহেব বুঝবেন না। বুঝবেন না বলেই গত খরা মৌসুমের সময় আমন ধান যখন নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, তখন আমার লেখা ‘ক্রপিং প্যাটার্ন পরিবর্তনের সুপারিশ, এই প্রতিবেদনটি ডিসি হয়ে ৫-এর পাতায় ছাপা হয়েছে! যে অঞ্চলে মোটা পরিমাণ আমন আবাদ হয়, সেই দিনাজপুর- রংপুর-বগুড়া-রাজশাহী অঞ্চলে আজ ‘ক্রপিং প্যাটার্ন’ পরিবর্তনের সুপারিশ এসেছে। বিষয়টির গুরুত্বই তিনি দেননি। … যে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে প্রধান ৩ টি ফসলের একটি হলো তামাক, অর্থনীতি নির্ভর করে তামাকের ওপর, তামাকের দাম না পেলে কৃষক-মজুর সংকটে পড়ে যায়, অনাহার-অর্দ্ধাহার শুরু হয়ে যায়, সেই রংপুর অঞ্চলে তামাকের মন ৬০ টাকা, এখবরও তারই কল্যাণে ৫-এর পাতায় যায়?’ মোনাজাত আর কাঙাল হরিনাথের সাংবাদিকতায় লড়াইয়ের পার্থক্য বুঝতে সহায়ক হবে একই প্রেরককে লেখা অন্য আরেকটি চিঠির অংশবিশেষ পাঠে। মোনাজাত লিখেছেন, ‘ঐ ৫ ই এপ্রিল। আমার এক অনাহারি দিন, আমার এক বঞ্চনার দিন। … সন্ধ্যায় বসে আছি নয়নের (সংবাদ পত্রিকার টেলিফোন অপারেটর)সামনের চেয়ারে, একটু আগে পেটে পড়েছে নয়নের আনা তিন-চার খণ্ড বিস্কুট আর চা, শরীর খু্ব দুর্বল, ভেতরে উদ্বেগ, এখান থেকে বের হয়ে যাব ডাক্তারের কাছে। … হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল, মৃদু গুঞ্জন উঠলো, ঠিক এই সময়ে হাজির হলেন বাংলাদেশের প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব অ. (পুরো নাম তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনার্থে প্রকাশ করা হলো না, শুধু নামের আদ্যা্ক্ষর ব্যবহার করা হল।), সংবাদের শিফট ইনচার্জ, বহুল আলোচিত ব্যবসায়ী মোখতারুর রহমানের সাক্ষাৎকার গ্রহণকারি এবং আরো অসংখ্য গুণের অধিকারী (সেসমস্ত দলিল প্রমাণসহ পরে)। আমার তো আবার কুকুরের স্বভাব। লেজ নাড়ানোর স্বভাব। ঐ যে বললাম নিদারুণ মানসিক অবস্থা, তা সত্বেও তাঁকে নমস্কার জানিয়ে বললাম কেমন আছেন? … তা অতি প্রগতিশীলরা আবার আদবকায়দার ধার ধারেন না, কেউ নমস্কার জানালে তার জবাবও দেন না। এক্ষেত্রেও তাই হলো। বরং তিনি ব্যাঙ্গের সুরে কথা বললেন। কলজেটা কেটে কেটে ফালা ফালা হয়ে যায় এভাবে সবাইকে শুনিয়ে বললেন : ‘এইতো এসে গেছে মোনাজাত, এবার আলো এসে যাবে।’ একবার নয় তিনবার একই কথা রিপিট করলেন তিনি, তারপর বার্তাবিভাগে চলে গেলেন! মানুষ এমনও হয় বুলবুলভাই? এই প্রগতিবাদীর প্রতিটি দিনের কথা গভীর দাগে লেখা আছে ডায়রীর পাতায়। সেসব জানতে পারবেন আগামীতে, যে কোনে সময়ে।’ মোনাজাতের চিঠিতে এরকম অজস্র লাইন রয়েছে, যা পাঠে পাঠক হতবাক ও বিস্মিত হবেন। কিন্তু সংবাদপত্রের ভেতরের যারা খবর রাখেন তারা হয়তো ততোটা আশ্চর্য হবেন না, কেননা রয়েছে শকুন প্রজাতির কিছু মানুষ। মোনাজাতে লিখেছেন, অন্যায়ভাবে তার কত স্টোর ছাপা হয়নি। খাম খোলার আগে, সংশ্লিষ্ট বিভাগে না যেতেই স্টোরি গায়েব হয়ে যাওয়ার ভূরিভূরি অভিজ্ঞতা রয়েছে তার জীবনে। কিন্তু এই সব বাধা আর প্রতিকূল পরিবেশ-পরিস্থিতি ও নোংরা খেলার অচলায়তনের মধ্যেও মোনাজাত গ্রামীন সাংবাদিকতাকে অন্যমাত্রায় উন্নীত করেছেন। কাঙাল হরিনাথের গ্রামীন সাংবাদিকতায় বাধা ছিল বাইরের, ভেতরের নয়। মোনাজাতকে ভেতর-বাইরে, ‍দ্বিবিধ বাধায় মোকাবেলা করতে হয়েছে। যোগ্যতা, পরিশ্রম, মেধা আর কৌশল দিয়ে পেরোতে হয়েছে নষ্ট বৃত্তের পরিধি। বাস্তবতা হলো, কাঙাল ও হরিনাথ কেউই জীবদ্দশায় এবং মৃত্যু পরবর্তি সময়ে স্বদেশ-স্বজাতি-স্বসমাজের কাছে মূল্যায়িত হননি। কাঙাল হরিনাথ গভীর বেদনায় দুঃখ-ক্ষোভের সঙ্গে লিখেছেন, ‘গ্রামের একটি কুকুর কোন প্রকারে অ্ত্যাচারিত হইলেও গ্রামের লোক তাহার জন্য কিছু করে, কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, ও আমার এতদূরই দুর্ভাগ্য যে আমার জন্য কেহ কিছু করিবেন, এরূপ একটি কথাও বলিলেন না। যাঁহাদের নিমিত্ত কাঁদিলাম, বিবাদ মাথায় করিয়া বহন করিলাম, তাঁহাদিগের এই ব্যবহার!’ অন্যদিকে, মোনাজাতের চিঠিতেও একই ক্ষোভ, আক্ষেপ আর অব্যক্ত কান্নায় শুনতে পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন, ‘চোখের জ্যোতি হৃত-প্রায়, লিখতে গেলে হাত কাঁপে, হাতের পেশীতে দারুণ ব্যথা, নানান ব্যাধি ভর করেছে শরীরে, তা সত্বেও একের পর এক সংবাদ লিখে গেছি, মানুষের কথা লিখে গেছি, সমস্যা আর সম্ভাবনার কিথা লিখে গেছি, কিন্তু আজ ১৯ বছরে প্রায় ৮ সহস্র প্রতিবেদনের এই আমি অভূক্ত থাকি কেন? কেন আমি অপমানিত হই।’ কাঙাল হরিনাথ ও মোনাজাতউদ্দিনের যে অবদান তার মূল্যায়ন আজও হয়নি। আমরা কাঙালকে ‘গ্রামীন সাংবাদিকতার পথিকৃৎ’ এই তকমা লাগিয়ে এবং মোনাজাতকে উত্তরসুরির অভিধা দিয়ে দায় ও দায়িত্ব শেষ করেছি। ব্যাপক পরিসর ও বিস্তৃত দৃষ্টিকোণ থেকে বৃহৎ অবদানের আলোকে তাদেরকে আবিস্কার ও অনুকরণীয় আদর্শ করে তোলার জন্য ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য কোন কাজ হয়নি আজও। ধীমান গবেষক আবুল আহসান চৌধুরীর কাঙাল হরিনাথকে নিয়ে যা করেছেন, তাই-ই আমাদের একমাত্র পাথেয়। তিনি মনে করেন, ‘উনিশ শতকে এই মানুষটি নিস্তরঙ্গ গ্রামবাংলার সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনে এক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিলেন। নাগরিক নবচেতনার প্রেরণায় দূর মফস্বলেও রচনা করতে পেরেছিলেন জাগৃতির বাতাবরণ’। অথচ সেই জাগৃতি পুরুষকে আমরা ভুলতে বসেছি ব্যক্তি-সমাজ-রাষ্ট্রের প্রায় সকলস্তরে। মোনাজাতউদ্দিন সম্পর্কে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের মূল্যায়ন এখানে প্রাসঙ্গিক, ‘সংবাদ অনুসন্ধান করতেন তিনি বিশাল বাংলার জনজীবনের ভেতরে, সংবাদের পেছনে অবিরাম তিনি অনুভব করতেন বাংলার মুখহীন কোটি কোটি মানুষের উপস্থিতি, সেই মানুষকে তিনি স্থাপন করতেন সংবাদের সবচেয়ে বড় অ্ক্ষরের শিরোনাম স্থলে।’ একারণে গ্রামীন সাংবাদিকতার যোগ্য উত্তরসুরি বলে আমরা যদি মোনাজাতকে আড়াল করে রাখি কিংবা ভুলে যায়, তাহলে তা হবে সংবাদ শিক্ষার্থী ও সংবাদকর্মিদের জন্য আত্মঘাতি এক পন্থা। কেননা, গ্রামীন সাংবাদিকতাতো বটেই সামগ্রিক সাংবাদিকতাতেই মোনাজাতের অবদান আলোকবর্তিকাস্বরূপ। মোনাজাতকে যথার্থ ভাবে পাঠ করলেই কাঙাল হরিনাথকে বোঝা যাবে। একারণে গ্রামীণ সাংবাদিকতার দুই মহীরুহ, মোনাজাতকে ‘যোগ্য উত্তরসুরি’ আর কাঙালকে ‘পথিকৃৎ’ নামের চমৎকার শব্দ তকমা দিয়ে আমরা যেন শেষ না করি আমাদের দায়, দায়িত্ব ও পূর্বজ স্মরণ করার পবিত্র কর্তব্যবোধ।

ড. কাজল রশীদ শাহীন : সাংবাদিক ও গবেষক

Kazal123rashid@gmail.com

শেয়ার করুন