বেঁচে থাকবে অনন্ত হৃদয়ে

2সিমিন হোসেন রিমি :

৪০ বছর মহাকালের হিসাবে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সময়ের ক্ষুদ্রতম ভগ্নাংশের অতিক্ষুদ্র এক অংশ।
আজকাল মনে হয় প্রতিটি মানুষের জীবনই তার জন্য একটি মহাকাল। হয়তো কারও উপলব্ধিতে বিষয়টি খুবই স্পষ্ট, কারও অজ্ঞাতেই থেকে যায় চিরদিন। মৃত্যুর সহজ সংজ্ঞা হয়তো বা না-ফেরার অনন্ত অজানায় চলে যাওয়া। শারীরিক উপস্থিতির বিচ্ছেদ। সরাসরি কোনো দিন আর না দেখা হওয়া। অথবা যে আমার সরব উপস্থিতি ছিল, তা এক নিমেষে নীরব হয়ে যাওয়া, চিরতরে।
৪০ বছর আগে সাদা কাফনে জড়ানো মুক্তিযুদ্ধের অনন্য বীর, দেশপ্রেমী বাবার (তাজউদ্দীন আহমদ) রক্তাক্ত নীরব নিথর মৃতদেহ। একপাশে দাঁড়ানো আমি। মানুষের বলা কত রকম শব্দ ভেসে আসে কানে। শুনতে পাই, জেলহত্যার নির্মমতার শিকার বাবার তিনজন মৃত্যুসঙ্গীর একজনের মৃতদেহ রাখা হয়েছে আমাদের বাড়ির পাশেই। বাবাকে রেখে অদ্ভুত মমতায় হেঁটে যাই সেই পথে। সাদা কাপড়ের অনেকটা জুড়ে রক্তে ভেজা। রক্তবর্ণ একটি চোখ খোলা। তাকিয়েই থাকি। প্রশ্নের পর প্রশ্ন আছড়ে পড়তে থাকে আমার ভেতরে। সেই খোলা স্পন্দনহীন রক্তাক্ত চোখকে মনে হয় বাংলাদেশের মানচিত্রে রক্ত দিয়ে লেখা বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন!
সেই প্রশ্নবোধক চিহ্নের বিপরীতে ন্যায়ের পতাকা সগর্বে ওড়ে না ৪০ বছরেও। জোড়াতালিতে অথবা বিরুদ্ধ স্রোতে ন্যায়ের পতাকা নুয়ে পড়ে বারবার। যে মানুষ নিজেকে প্রকাশ করবে বলে হাজার বছর ধরে পাহাড়, অরণ্য, সাগর, মহাসাগর পাড়ি দিয়েছে। কঠিন রুক্ষ মাটিকে করেছে উর্বরা, ছুঁয়েছে আকাশ, ভেদ করেছে অজানা রহস্য—যে মানুষ মুক্ত মানুষ হিসেবে প্রকাশ করেছে নিজেকে তার ভাষার মাধ্যমে, তার কথা বলার অনন্ত স্বাধীনতায়, সেই ভাষার শক্তিকে আজ করা হয়েছে রক্তাক্ত।
আমার ৪০ বছরের প্রশ্নবোধক চিহ্ন আরও বড় হয়ে দেখা দেয়।
ফয়সল আরেফিন দীপন, তুমি আমাদের ভাই। এ সময়ের যোদ্ধা। বিবেককে জাগিয়ে তুলতে নিরন্তর জ্ঞানের সাধনার যে লড়াই, তুমি তার সৈনিক। তোমার মৃত্যু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ গড়ার কঠিন প্রত্যয়ের পথে এগিয়ে যাওয়ার একটি উজ্জ্বল আলোর রশ্মি। তুমি বেঁচে থাকবে অনন্ত হৃদয়ে।
সিমিন হোসেন রিমি: জাতীয় সংসদ সদস্য। লেখক ও সমাজকর্মী।

শেয়ার করুন