নিরাপদ খাদ্য ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

download (4)মো. মাহমুদুর রহমান :
ঘোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু আর পুকুর ভরা মাছ- একটা সময় দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা তথা স্বাচ্ছন্দের বিষয়টি এভাবেই বর্ণনা করা হতো। আজ আর এগুলো শোনা যায় না। এখন ঘোলায় ধান নেই। চালের জন্য ব্যবসায়ির আড়ত রয়েছে। গোয়াল ভরা গরুও নেই, তবুও আমরা আগের চেয়ে অনেক বেশী গরুর মাংস ও দুধ পাচ্ছি। মাছের জন্য আর পুকুর নয়- রয়েছে মৎস্য খামার। পরিবর্তন গুলো ধীরে ধীরে হয়েছে। কিন্তু প্রবাসি কেউ যদি বাংলাদেশে ২৫/৩০ বছর পরে এসে থাকেন তাহলে নিশ্চয়ই তিনি অবাক হবেন। তার পরিচিত বাংলাদেশ আর খুঁজে পাবেন না। এ সময়ের মধ্যে দেশ অনেক এগিয়ে গেছে। মানুষের আর্থিক স্বচ্ছলতার বিষয়টি কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে বুঝানোর দরকার নেই। চারপাশের মানুষের দিকে চোখ তুলে তাকালেই খালি চোখে তা ধরা পড়বে। অতি দারিদ্র্য আজ আর বাংলাদেশের সর্বত্র বিরাজমান নয়। বিশেষ করে খাদ্যশস্য উৎপাদনে অনেক অগ্রগতি হয়েছে।
ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল (উফশী) বিভিন্ন জাতের ধান উদ্ভাবনের পর থেকে দেশের চেহারা পাল্টে যেতে থাকে। একে একে বিভিন্ন হাইব্রিড জাতের ধানের হাত ধরে এখন শোনা যাচ্ছে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংরে মাধ্যমে উচ্চ খাদ্যমান সমৃদ্ধ ‘গোল্ডেন রাইস‘ও কৃষকের হাতে আসার অপেক্ষায় রয়েছে। যদিও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে উদ্ভাবিত জাত নিয়ে বেশ বিতর্ক রয়েছে। বিশ্বের বিজ্ঞানীরা মানবদেহে এসব ফসলের ক্ষতিকর প্রভাবের বিষয়ে এখনও একমত হতে পারেননি। বাংলাদেশে বিটি বেগুনের চাষ নিয়ে এখনও বিতর্ক হচ্ছে। তাই মানের বিষয়টি বাদ দিয়ে শুধু পরিমাণগত দিক বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ এবং ক্রমহ্রাসমান কৃষিজমির চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশ কৃষি উৎপাদনে এক বৈপ্লবিক অগ্রগতি সাধনে সক্ষম হয়েছে। এ উন্নয়নের বর্ণনায় রাজনীতিকদের পরিভাষা হচ্ছে ‘খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা‘। প্রায়ই সভা সমাবেশে বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এ দাবিকে আরও জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য চাল রপ্তানির কথাও বলা হয়ে থাকে। তবে বৈদেশিক বাণিজ্যের এ হিসাব বাংলাদেশের চাল রপ্তানির বিষয়টি সমর্থন করে না। বেশীরভাগের দাবি কোনো বিশেষ চাল কিছু পরিমানে রপ্তানি হলেও আমরা এখনও চাল আমদানিকারক দেশ। এ বিষয়টি পরিষ্কার করতে একটি পত্রিকায় শিরোনাম ছিল ‘চাল রপ্তানি-আমদানির খেলা, দামে উত্তাপ‘ (মানব জমিন, ২৯ অক্টোবর ২০১৪)। এ রিপোর্টে দেখা যায় শ্রীলংকায় ৫০ হাজার টন চাল রপ্তানির ঘোষণা দিলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক বাণিজ্যের হিসাব অনুযায়ী চালের আমদানি বেড়েছে আগের বছরের তুলনায়। ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে চাল আমদানির এলসির বিপরীতে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের একই সময়ে ৫৬ শতাংশ বেশী এলসি খোলা হয়েছে। এছাড়া যে দামে রপ্তানীর কথা বলা হয়েছে এর চেয়ে বেশী দামে অভ্যন্তরীণ বাজারে চাল বিক্রি হচ্ছিল। যাই হোক বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ কি-না বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও দেশে খাদ্য উৎপাদন যে আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে এ বিষয়ে বিতর্কের সুযোগ নেই।
বিশ্ব খাদ্য দিবসে ১৬ অক্টোবর সারাবিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। মিডিয়ায় এ সম্পর্কিত অনেক খবর ও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। দৈনিক প্রথম আলো শিরোনাম করেছে ‘খাদ্যনিরাপত্তায় এগিয়ে বাংলাদেশ‘। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক সংস্থার প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে এসেছে। ‘দ্য ষ্টেট অব ফুড সিকিউরিটি ইন ওয়ার্ল্ড -২০১৫‘ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও বাংলাদেশ, কিউবা, মাদাগাস্কার ও ভিয়েতনাম খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। পুষ্টি নিরাপত্তায়ও বাংলাদেশের অগ্রগতি ভালো। তবে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের খর্বাকৃতি ও অপুষ্টির বিচারে বাংলাদেশ এখনও শীর্ষ ২০ টি দেশের একটি।
একইদিনে বণিক বার্তা একটি খবরের শিরোনাম করেছে- ‘খাদ্যে ভেজাল- অবস্থা এখনো বদলায়নি‘। এ খবরের শুরুতে বলা হয়েছে, ভেজালমুক্ত নিরাপদ খাদ্য নিয়ে আলোচনা চলছে অনেক দিন ধরেই। সরকারের তরফ থেকেও এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। যদিও তথ্য-উপাত্ত বলছে, পরিস্থিতি এখনো আগের মতোই। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বাজার থেকে বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষা করে দেখেছে, এর ৩৬ শতাংশের বেশী এখনো ভেজাল। এই বর্ণনার স্বপক্ষে তারা একটি চার্ট দিয়েছে যা ২০১১ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের নমুনা পরীক্ষার ফলাফল প্রদর্শন করছে। এতে দেখা যায় বিভিন্ন সালে ৩৬ শতাংশ থেকে ৪৩ শতাংশের মতো খাদ্যে ভেজাল রয়েছে। এছাড়া আরেকটি চার্টে নামকরা বিভিন্ন কোম্পানীর কোন কোন পণ্যে ভেজাল পাওয়া গেছে এবং কার বিরুদ্ধে কয়টি মামলা রয়েছে তাও দেয়া হয়েছে।
আসলে দুটি রিপোর্টই খাদ্যনিরাপত্তা বিষয়ক। জাতিসংঘের রিপোর্ট যা প্রথম আলোতে এসেছে, সেখানে খাদ্যনিরাপত্তার পরিমাণগত দিক বর্ণনা করা হয়েছে। অন্যদিকে বণিক বার্তায় খাদ্যনিরাপত্তার সবচেয়ে মৌলিক উপাদান নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে। নমুনা পরীক্ষার ফলাফলের চেয়ে বাস্তব অবস্থা আরও নাজুক অর্থাৎ খাদ্যে ভেজালের পরিমান এর চেয়েও অনেক বেশি বলে পাবলিক পারসেপশন রয়েছে। একজন মানুষের সকাল থেকে রাত পর্যন্ত খাবার টেবিলের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। সকালে সবজি-রুটি নাস্তার আইটেম হিসেবে যাদের পছন্দ তাদের মানসপটে সব সময়ই ভেসে ওঠে সবজি চাষে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণের সময় মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর কেমিক্যালের ব্যবহারের বিষয়টি। এছাড় আটা বা ময়দা যা দিয়ে রুটি বানানো হয় তার উৎস গম। ব্রাজিলের পোকায় খাওয়া গমের চিত্র মনে হলে এদিনের নাস্তা করা আর হবে না। তবুও কোনো রকম নাস্তা গলার নিচে নেয়ার জন্য মন্ত্রী মহোদয়ের সেই অমর বাণী- ব্রাজিলের গম দেখতে খারাপ হলেও মানে ভালো, কথাটি মাথায় রাখতে হয়। এভাবে দিনের অন্যান্য খাবারের মধ্যে সংরক্ষিত চালে পাউডারজাতীয় কেমিক্যালের গন্ধ, মাছে ফরমালিন, গরুর মাংশে মোটাতাজাকরণে ব্যবহৃত ক্ষতিকর ওষুধ তো রয়েছেই। সব মিলিয়ে পরীক্ষাগার ছাড়া সাধারণ মানুষের পর্যবেক্ষণে দৈনন্দিন খাবারের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই ভেজাল ধরা পড়ে।
দেশের মানুষের নিরাপত্তাহীনতার ক্ষেত্রে গুম, বন্দুকযুদ্ধ ও চাপাতির কোপ সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও সামগ্রিক নিরাপত্তাহীনতা বিবেচনায় অনিরাপদ খাদ্য মোটেও কম গুরুত্ত্বপূর্ণ নয়। ধীরে ধীরে পুরো জাতিকে ভয়ানক ব্যাধি ও মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাচ্ছে ভেজাল খাবার। অথচ যতটুকু গুরুত্ব পাওয়ার কথা বিষয়টি ততটুকু পাচ্ছে না। উন্নত বিশ্বে নিরাপদ খাদ্যের ব্যাপারে কোনো ধরনের আপোষ করা হয়না। কিছুদিন আগে বাংলাদেশের দুটি ওষুধ কোম্পানী স্কয়ার ফার্মা ও বেক্সিমকো ফার্মা যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিষ্ট্রেশন‘র অনুমোদন পেয়েছে। দীর্ঘ পক্রিয়ার পর এ অনুমোদন পেতে হয়েছে। অথচ দেশে এ দুটি কোম্পানীকে ঘুমের মধ্যেও মানুষ নিরাপদ ভাবে। ভাবনার বিষয় হলো আমাদের এত উচ্চ কোয়ালিটি সম্পন্ন দুটি কোম্পানীকে বিদেশি অথরিটি অনুমোদন দিতে যত সতর্কতা অবলম্বন করেছে আমরা কী তার কিঞ্চিৎ পরিমাণ নাগরিকদের ওষুধ ও খাবারের মান নিয়ে চিন্তিত?
কিছুদিন আগে আমার পূর্বপরিচিত একজন ব্যাংকে এসে তার বোনের জন্য লন্ডন, আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়া প্রবাসি পাত্র দেখতে অনুরোধ করে। বোনটিও সাথে ছিল। আমি তাকে কেন প্রবাসি পাত্র চাচ্ছে জানতে চাইলে বলে, যেহেতু তার পরিবারের কেউ দেশে থাকবে না, তাই সেও বাইরে যেতে চায়। তখন আমি জানতে চাই, পরিবারের সদস্যরা থাকেন একটি দেশে, সে কেন অন্য দুটি দেশ পছন্দ করছে। মেয়েটি আর জবাব দেয়নি। তার ভাই বলল, এ দেশে নিরাপত্তা নেই। আমি ভাবলাম রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা বলছে। আবার জানতে চাইলাম, তোমরা যেহেতু রাজনীতি করছ না, তাহলে তোমাদের সমস্যা কোথায়? তখন সে বলে, আইন-আদালত, পুলিশ বা সন্ত্রাস-জঙ্গী তৎপরতার কথা সে বলছে না। তার সমস্যা ভেজাল খাবার। চাইলেও এদেশে টাকা খরচ করে নিরাপদ খাদ্য পাওয়া যায় না। বেশিরভাগ খাবারেই ভেজাল। এই ভেজাল খাবার খেয়ে সুস্থ জীবনযাপন করা কঠিন। তাই তারা দেশত্যাগ করতে চায়। এরপর তার কথার কোনো উত্তর আমি আর দিতে পারিনি। কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো সদুত্তর কী আছে?
লেখক: ব্যাংকার ও কলাম লেখক

mahmudpukra@gmail.com

শেয়ার করুন