তেলের নিম্নমূল্যে মধ্যপ্রাচ্যের কোন দেশ কদিন টিকতে পারবে?

1সিলেটের সকাল ডেস্ক : ব্যারেলপ্রতি ৫০ ডলারের কাছাকাছি থাকলে মধ্যপ্রাচ্যের বেশির ভাগ দেশই ৫ বছর বা তারও কম সময়ের মধ্যে দেউলিয়া হয়ে যাবে। এ সপ্তাহে এমন প্রতিবেদন দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এ তালিকায় তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য সৌদি আরবসহ ওমান ও বাহরাইনের মতো দেশও রয়েছে। আইএমএফ জানিয়েছে, তেলের নিম্নমূল্যের কারণে এক বছরেই মধ্যপ্রাচ্য প্রায় ৩৬০০০ কোটি ডলার হারাবে। দেশগুলোর বাজেটে বিশাল পরিমাণ উদ্ধৃত্ত থাকতো। আর তেলের দাম গত বছর আকস্মিকভাবে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার থেকে ৪৫ ডলারে নেমে যাওয়ায় এখন
ওই বাজেটে বিশাল ঘাটতি থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আইএমএফ নিজেদের প্রতিবেদনে লিখেছে, রাজস্ব স্থায়িত্ব নিশ্চিতে ব্যয় ও আয়ের নীতি ঠিক করতে হবে তেল বিশেষজ্ঞদের। তেলের দাম এমন সময়ে কমলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো আঞ্চলিক সহিংসতা, অস্থিরতা মোকাবিলা এবং সংঘাতে জড়িত হওয়ায় তাদের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। আইএমএফের ওই তথ্যের বরাতে মধ্যপ্রাচ্যের কোন দেশ তেলের এ পড়তি দামে কদিন টিকে থাকতে পারবে, তা নিয়ে একটি প্রতিবেদন ছাপিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন।
সেখানে বলা হয়েছে, বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ সৌদি আরব ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। দেশটির বাজেট ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে হলে, আইএমএফের মতে, তেল বিক্রি করতে হবে ব্যারেলপ্রতি ১০৬ ডলারে। পাঁচ বছর ধরে যদি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৫০ ডলার থাকে, তবে দেউলিয়া হতে হবে দেশটিকে। এজন্যই নগদ অর্থ সংরক্ষণে হন্যে হয়ে উঠেছে সৌদি আরব। এ বছরের শুরুর দিকে বন্ড বিক্রি করে ৪০০ কোটি ডলার সংগ্রহ করেছে দেশটি, যা আট বছরে প্রথম ঘটলো। ব্ল্যাকরকের মতো বিভিন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান থেকে গত ছয় মাসে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ৭০০০ কোটি ডলার উঠিয়ে নিয়েছে। বহু বছর ধরে বাজেটে বিশাল উদ্ধৃত্ত ছিল সৌদি আরবের। অথচ, দেশটির বর্তমান ঘাটতি এ বছরেই মোট জিডিপির ২০ শতাংশে উন্নীত হওয়ার পথে রয়েছে। এখনও সৌদি আরবের কাছে ৭০ হাজার কোটি ডলারের অর্থ রয়েছে। কিন্তু এ অর্থ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। এখনই দেশটির নাগরিকদের ওপর করের বোঝা চাপানো হবে না। কিন্তু ব্যয় সংকোচননীতি কিছুটা গ্রহণ করবে কর্তৃপক্ষ। যদিও সামাজিক ও সামরিক খাতে ব্যয় কিছুতেই কমানো হবে না। কেননা, দেশটির নেতারা আবারও ২০১১ সালের আরব বসন্তের মতো সরকারবিরোধী বিপ্লবের আশঙ্কা করছেন।
আইএমএফ জানিয়েছে, ইরানের বাজেট ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে হলে তেলের দাম থাকতে হবে ব্যারেলপ্রতি ৭২ ডলার। বর্তমান তেলের নিম্নমূল্যের ফলে ১০ বছরেরও কম সময় টিকবে ইরান। প্রতিবেশীদের চেয়ে ইরানের অবস্থা কিছুটা ভালো। কিন্তু ইরানের বিষয়টি নির্ভর করছে পারমাণবিক চুক্তির ফলে পাওয়া অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি ও পরিণতিতে ব্যবসা-বাণিজ্যে বৃদ্ধি পাওয়া ও তেল উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর। এর কোনোটিই এখন পর্যন্ত ঘটতে শুরু করেনি।
আইএমএফের মতে, ইরাকের কার্যত কোনো অতিরিক্ত অর্থ মজুদ নেই। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে দেশটি বিধ্বস্ত। বিশাল অঞ্চল হারিয়েছে আইএসের কাছে। সহিংসতা বৃদ্ধির ফলে আত্মবিশ্বাস ও প্রত্যাশায় ধ্বস নেমেছে, যা অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। বাহরাইনও ব্যাপক চাপে আছে। ৫ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে এ দেশটিরও কোনো উপায় থাকবে না। ইতিমধ্যেই ঋণের দায়ে ধুঁকছে দেশটি। টানা কয়েক বছর ধরে বাজেটে আছে ঘাটতি। মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিবিদ জ্যাসন টুভে বলেন, এ দেশগুলো তুলনামূলকভাবে চাপে আছে বেশি। তাদের আরও শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে।
তবে ব্যতিক্রম হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও কাতার। ঝড়ের মুখেও এ দেশগুলো ভালো অবস্থানেই আছে। শীর্ষে আছে কুয়েত, এরপর কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। কারণ, নিজেদের বাজেটে ভারসাম্য আনার জন্য দেশগুলো তেলের ওপর অতটা নির্ভরশীল নয়। কুয়েতের টিকে থাকতে হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪৯ ডলার হলেই চলবে। কাতারের বেলায় ৫৬ ডলার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বেলায় ৭৩ ডলার দামে তেল বিক্রি করতে হবে। কিন্তু এ দেশগুলো ইতিমধ্যেই তেল বিক্রির টাকা দিয়ে কার্যত অর্থের পাহাড় বানিয়ে রেখেছে। যাতে করে দুর্দশার সময় কাতরাতে না হয়। আইএমএফ জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ৫০ ডলার প্রতি ব্যারেল তেল বিক্রি করলেও জমানো অর্থ দিয়ে ৩০ বছর চলতে পারবে! অন্যদিকে কাতার ও কুয়েত পারবে প্রায় ২৫ বছর।

শেয়ার করুন