ডায়াবেটিক গণসচেতনতা প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

download (1)সৈয়দ সুজাত আলী : ১৪ নভেম্বর- বিশ্ব ডায়াবেটিস সচেতনতা দিবস। প্রতি বছর ১৪ নভেম্বর সারা বিশ্বে ডায়াবেটিস সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টির জন্য দিনটি ‘বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে। বিগত কয়েক বছর থেকে জাতিসংঘ এই দিবসকে বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস হিসেবে পালন করার ঘোষণা দিয়েছে। এবারে বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে-“স্বাস্থ্যসম্মত খাবার ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের অন্যতম উপায়”। বিশ্ব জুড়ে ডায়াবেটিস রোগ ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ব ডায়াবেটিস ফেডারেশন ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই দিনকে বিশ্ব ডায়বেটিস সচেতন দিবস ঘোষণা করে। ডায়াবেটিম একটি অনারোগ্য ব্যাধি এবং এটির প্রতিষেধক কোনো কালে ছিল না। এটি একটি কঠিন রোগ। চিকিৎসায় এটি নিরাময়ের কোন ব্যবস্থা নেই, নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আছে মাত্র। ডায়াবেটিস গ্রীক শব্দ। প্রাচীন গ্রীক চিকিৎসক এরিটিউস এই নামকরণ করেন। অতিরিক্ত পিপাসা ও অতিরিক্ত মূত্রত্যাগ এই রোগের বৈশিষ্ট্য। ডায়াবেটিস মেলিটাস রোগের মূল কারণ ইনসুলিনের অভাব। বেশী বয়স হলে এমনিতেই শরীরের বিপাক ক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে। তার সঙ্গে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ, পরিশ্রমহীন বা নিয়ন্ত্রণহীন জীবনযাপন বিপাক ক্রিয়াকে আরো দুর্বল করে দেয়। এ অবস্থায় ইনসুলিন নামে শরীরের একটি প্রয়োজনীয় হরমোন প্রয়োজন মতো উৎপন্ন হতে পারে না। ফলে খাবারের সঙ্গে গ্রহণ করা কার্বোহাইড্রেট ঠিকমতো বিপাক হয় না। ওই কার্বোহাইড্রেট বা শর্করাই প্রস্রাবের সঙ্গে বার বার বের হয়ে আসে। অবশ্য সব বহুমূত্রই শর্করাযুক্ত নয়। শর্করাবিহীন বহুমূত্রও আছে, যাকে বলা হয় ডায়াবেটিস টাইপ-২। আজকাল জ্ঞানী চিকিৎসকরা রোগের চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে থাকেন। এটি নিঃসন্দেহে উত্তম পরামর্শ। দুশ্চিন্তাহীন থাকলে, পরিশ্রমী হলে বা নিয়মিত ব্যায়াম করলে, সৎ চিন্তা ও শুভবুদ্ধি মাথায় রেখে সুনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন করলে ডায়াবেটিস রোগ হতে পারে না।
ডায়াবেটিস প্রতিরোধে আমরা সবাই #ঃ
২০১৪ সালের হিসাব অনুযায়ী পৃথিবীতে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ৩৯ কোটি। ২০০৩ সালেও যা ছিল ১৯.৪ কোটি। আর এভাবে চলতে থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ পৃথিবীতে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে ৪৩.৯ কোটি। ২০১০ হতে ২০৩০ এই দু দশকে উন্নয়নশীল দেশে ডায়াবেটিস রোগী বাড়বে ৬৯% আর উন্নত দেশে বাড়বে ২০%। অর্থাৎ উন্নয়নশীল দেশসমূহকে বহন করতে হবে ক্রমবর্ধমান রোগীদের বোঝা, যা উক্ত দেশসমূহের সরকারের জন্য বহন করা কঠিন হবে। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের হিসাব মতে, প্রতি ১০ সেকেন্ডে দুজন নতুন করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয় এবং প্রতি ১০ সেকেন্ডে একজন মৃত্যুবরণ করে ডায়াবেটিস ও তার দ্বারা সৃষ্ট জটিলতার কারণে। কাজেই যে কারও পক্ষেই স¤ভব এর ভয়াবহতা আঁচ করা। আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বাড়বে ৫৪%, প্রতি বছরে ২.২% হারে। ৩৬% বৃদ্ধি শুধুমাত্র ভারত ও চীন দেশে। আগামী ২০২০ সাল নাগাদ অর্ধেকের বেশী মার্কিনী নাগরিক ডায়াবেটিকস-এ আক্রান্ত হবে কিংবা ডায়াবেটিসসজনিত কারণে ভুগবে। এর ফলে এক দশকে স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয় বাড়বে ৩ দশমিক ৩৫ ট্রিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যবীমা ইউনাইটেড হেলথ গ্র“প কর্পোরেশন এর প্রকাশিত প্রতিবেদনে একথা বলা হয়েছে। আমাদের বাংলাদেশও পূর্ণবয়স্ক ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির দিক থেকে সারা পৃথিবীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ডায়াবেটিস এসোসিয়েশন এর হিসাব মতে প্রায় ৮৪ লাখ ডায়াবেটিস রোগী থাকলেও আগামী ২০৩০ সালে বাংলাদেশ হবে পৃথিবীর ৭ম বৃহত্তম পূর্ণবয়স্ক ডায়াবেটিস রোগী বসবাসকারী দেশ, যেখানে বসবাস করবে ১ কোটি ১১ লক্ষ পূর্ণবয়স্ক রোগী। তাছাড়া শিশু রোগীর সংখ্যা বর্তমানে ১৫ হাজারের বেশী, যা ক্রমবর্ধমানশীল। উন্নত বিশ্বে যেখানে বেশীর ভাগ ডায়াবেটিস রোগীর বয়স ৬০ বছরের উর্ধ্বে, সেখানে উন্নয়নশীল বিশ্বে সবচেয়ে বেশী রোগীর বয়স ৪০ থেকে ৬০। সংসারের উপার্জনক্ষম ও কর্মক্ষম জনশক্তিরাই মূলত: এ রোগে আক্রান্ত। শহুরে আধুনিক জীবন যাপন পদ্ধতি এর জন্য আংশিক দায়ী। কায়িক পরিশ্রমহীন জীবনযাপন পদ্ধতি ও শরীরের ওজন বৃদ্ধি না থামাতে পারলে ভবিষ্যতে এ রোগ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
জাতিসংঘ ঘোষণা, এ ভয়াবহতা দূর করতে দরকার সবক্ষেত্রে সম্মিলিত উদ্যোগ। সময়োপযোগী এবং যথার্থই জাতিসংঘের ঘোষণা- ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘমেয়াদী, অবক্ষয় ও ব্যয়বহুল রোগ, যা অনেক মারাত্মক জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে এবং এ রোগ এখন পরিবার, রাষ্ট্র ও সারা বিশ্বের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে। ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এ ঘোষণার পক্ষে ৬১/২২৫তম প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। সে অনুযায়ী ২০০৭ সাল থেকে প্রতি বছর ১৪ নভেম্বর বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসকে একটি জাতিসংঘ দিবস হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
ডায়াবেটিস ক্রমেই বাড়ছে পৃথিবীতে এবং এমন অনুমানও হচ্ছে যে, ২০২০ সালে ডায়াবেটিস চিকিৎসায় বর্তমানে যে খরচ হয় এর ৩০% খরচ বেড়ে যাবে। এসব খরচ অনুমান করা হয়েছে ডায়াবেটিস সম্পর্কিত অসুখগুলোকে চিন্তায় রেখে। অর্থাৎ এমন সব অসুখ যেগুলোর ক্ষেত্রে ডায়াবেটিসকে একটি কারণ বা উপাদান হিসেবে বিবেচনায় রাখা হয় যেমন হৃদরোগ, ষ্ট্রোক, চোখের রোগ ও বয়স্কদের অন্ধত্ব, কিডনীর রোগ, প্রজনন অক্ষমতা এবং রক্তপ্রবাহের এমন সব সমস্যা যা বাড়লে অঙ্গচ্ছেদ (বিশেষভাবে পায়ের আঙ্গুল বা পা) প্রয়োজন হয়।
ডায়াবেটিসের সাধারণ লক্ষণ
ঘন ঘন প্রস্রাব, স্বল্প সময়ে ওজন কমে যাওয়া, অধিক তৃষ্ণা এবং মুখ শুকিয়ে যাওয়া, চোখে ঝাপসা দেখা, অতিশয় দুর্বলভাব, অতিরিক্ত ক্ষুধা ও ক্ষত না শুকানো। অধিকাংশ টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে ওপরের উপসর্গগুলো নাও থাকতে পারে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও উপসর্গহীনতা বা অসচেতনতার কারণে প্রায় ৫০% রোগীই জানেন না যে তাদের ডায়াবেটিস আছে। ক্ষেত্র বিশেষে অনেক দেশে এমন রোগীর সংখ্যা ৮০%।
যাদের ডায়াবেটিস হয় এদের মধ্যে শতকরা ৯০ জনেরই টাইপ ২ ডায়াবেটিস। এ ধরণের ডায়াবেটিস প্রতিরোধযোগ্য এবং পদক্ষেপ নিলে এ রোগকে অনেক বিলম্বিত করা যায়। এজন্য বড় কোনো আয়োজন প্রয়োজন নেই। সহজ কিছু টিপ্স রয়েছে রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণের জন্য।
* প্রতি বেলার খাবার খেতে হবে সময়মতো আস্তে আস্তে। তাড়াহুড়ো করে খাবার খাবেন না।
* কি পরিমাণ খাওয়া হচ্ছে, এও গুরুত্বপূর্ণ। বড় আয়তনের তৈরী খাবার না খেয়ে ছোট আয়তনেরও তো খাওয়া যায়। বলা হলো ওবেলা ভাত না খেয়ে রুটি খাবেন। এখন ভারি ভারি ছ’টা রুটি খেলে তো আর কাজ হলো না। উল্টো ফল হলো।
* আঁশ, তুষ, গোটা শস্য বেশি বেশি খেতে হবে। ময়দার রুটি আর মিলে ছাটা চালের বদলে লাল আটার রুটি বা ঢেঁকি ছাটা চালের ভাত খেলে ভালো। যাদের সামর্থ্য আছে তাদের জন্য বাশমতি চালের ভাত ও নতুন আলুর ভাজি ভালো খাবার। তবে পুরনো আলুর ভর্তা বা আলু চপ বেশী না খাওয়াই ভালো।
* অতিরিক্ত লবণ ও চর্বিজাতীয় খাবার যথাসম্ভব পরিহার করুন। প্রতিদিন কিছু পরিমাণ শাক-সবজি ও ফলমূল খান।
* ফাস্টফুড এবং কোল্ড ড্রিংকস পরিহার করুন। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ আর্সেনিক মুক্ত পানি পান করুন।
* বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে পরিবেশিত রিচফুড যথাসম্ভব পরিহার করুন।
* ওজন নিয়ন্ত্রণের চমৎকার একটি উপায় হচ্ছে হাঁটা। তাই কম দূরত্বের জায়গাগুলোতে হেঁটে চলাচল করুন।
* লিফট এর বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করুন।
* একটানা অধিক সময় বসে কাজ করবেন না। কম্পিউটার ব্যবহার ও কাজের ফাঁকে উঠে দাঁড়ান। একটু পায়চারি করুন ও গেম খেলা কমিয়ে দিন। টিভি দেখতে দেখতে চিপ্স খাবেন না। বেশী ক্ষুধার্ত হলে শসা খান।
* অলসতা দূর করতে সংসারের টুকিটাকি কাজ নিজেই করুন। সুযোগ থাকলে বাগান করুন, খেলাধুলা করুন। টিভির রিমোট কন্ট্রোল ব্যবহার কমিয়ে নিজে উঠে গিয়ে চ্যানেল পরিবর্তন করুন।
* ব্যায়াম শুরু না করে থাকলে জীবনে যোগ হোক শরীর চর্চা। সপ্তাহে তিন/চার দিন কিছু সময় ব্যায়াম করুন। সাঁতার কাটা একটি ভালো ব্যায়াম। নিয়মিত সাইক্লিং ও দ্রুত হাঁটা খুবই ভালো (যদি আপনার ডাক্তার নিষেধ না করেন)।
* ধূমপান বর্জন করুন, কেননা ধূমপান ডায়াবেটিসের একটি কারণ।
* ডায়াবেটিস আক্রান্ত হয়ে থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শমত চিকিৎসা গ্রহণ করুন। ঔষধ, ব্যায়াম, খাদ্যগ্রহণ তথা সার্বিক জীবনযাপন সংক্রান্ত তার সুনির্দিষ্ট এবং বিজ্ঞানসম্মত উপদেশ (যা শুধুমাত্র আপনার জন্য প্রযোজ্য) মেনে চলুন।

লেখক : কার্যকরী কমিটির সদস্য, সিলেট ডায়াবেটিক সমিতি।

শেয়ার করুন