টি-টোয়েন্টিতে জয়ে শুরু বাংলাদেশের

tamim 31স্পোর্টস রিপোর্টার : উৎসব-আনন্দের বর্ণিল আলোর ঝরণাধারায় ভাসছে মিরপুর। অথচ তখনও জয়ের পথে ৩২ রান বাকি। ৮৩ বলে বাংলাদেশের সংগ্রহ ১০০/৫। উইকেটে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ-লিটন দাস। ঠিক ওই সময়ে বাংলাদেশকে অনুপ্রাণিত করতে প্রায় সব দর্শক একযোগে মোবাইলের ফ্লাশ লাইটের আলো প্রজ্জ্বলিত করেছেন। শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের গ্যালারিময় আলোর সেই দ্রুতি মোমবাতির সিন্ধ আলোকেও হার মানিয়েছে। সেই আলোক বিচ্ছুরণের ছায়াতলে যেন ম্লান হয়ে পড়েছিল মিরপুরের ঝলমলে ফ্ল্যাড লাইটগুলোও। না, সেই প্রেরণার আলো নিভে যায়নি। একটুও ভাটা পড়েনি সেই উচ্ছ্বাসে। মাহমুদউল্লাহ-মাশরাফির ব্যাটের বিচ্ছুরণে নিভে গিয়েছে জিম্বাবুয়ের সব প্রতিরোধ। সব সমীকরণে এগিয়ে থাকা বাংলাদেশ প্রথম টোয়েন্টি২০ ম্যাচে জিতেছে ৪ উইকেটের ব্যবধানে। তখনও হাতে ছিল ১৪ বল।

আগের সব হিসেবে অনেকটাই এগিয়ে ছিল বাংলাদেশ। জিম্বাবুয়েকে ১৩১ রানে বেঁধে ফেলার পর; ম্যাচটি মনে হচ্ছিল সহজ-সরল পরিণতির দিকেই যাচ্ছে। কিন্তু এক ক্রেমারেই বিপাকে পড়েছিল বাংলাদেশ, ধাক্কাও খেয়েছিল। ধারাবাহিক উইকেট পতনে ম্যাচের বাঁকে বাঁকে দর্শকের নাভিশ্বাসও উঠেছিল। তবে শীত ছুঁয়ে যাওয়া মিরপুরে শুক্রবার বাংলাদেশের কোনো বিপদ হয়নি। জয়ের বন্ধুর পথ শেষমেষ সহজেই জিতেছে। অথচ জিম্বাবুয়ের ১৩১ রানে অলআউটের পর বড় স্বপ্ন দেখেছিল গ্যালারি উপচে পড়া সমর্থকরা। টোয়েন্টি২০ ম্যাচে বাংলাদেশের থিতুটা এখনও বাকি রয়ে যাচ্ছে। বিকাল-সন্ধ্যা-রাতের প্রথম প্রহরে অনুষ্ঠিত সিরিজের প্রথম ম্যাচটি জিতে জিম্বাবুয়েকে আরেকটি বাংলা ধোলাইয়ের পথেই ঠেলে দিয়েছেন মাশরাফি-তামিমরা। রবিবার শেষ ম্যাচ। সেখানে জিতলে ব্যাক টু ব্যাক হোয়াইটওয়াশের প্রতিশোধও নেওয়া হয়ে যাবে। জিম্বাবুয়ে প্রথম ২ সিরিজে ব্যাক টু ব্যাট হোয়াইটওয়াশ করেছিল বাংলাদেশ। বাংলাদেশ এখন সেই স্পর্ধিত হোয়াইটওয়াশের স্বপ্ন দেখতেই পারে।

জয়ের জন্য ১৩২ রানের টার্গেট হলেও শুরুটা সুবিধার হয়নি বাংলাদেশ। একটি বাজে রান আউটের শিকার হয়ে সাজ দেখেছেন দীর্ঘ প্রতীক্ষায়র পর একাদশের ফেরা এনামুল। অথচ ইনফর্ম ইমরুল কায়েসকে তার দলে ফিরাতে কাট করতে হয়েছিল নির্বাচকদের। তামিমের ব্যাটে বলটি কাভার অঞ্চলে যেতেই নন স্ট্রাইক প্রান্ত ছেড়ে এনামুল রানের জন্য ছুটতে গিয়ে আউট হয়েছেন বোকামোর জন্য। প্রথম ওভারেই পানিয়াঙ্গারার বলে রান আউট। তামিম-সাব্বিরে বড় যুগলবন্দি হতে হতে হয়নি। ৩৯ রানের পার্টনারশিপ গড়ে কিছুটা হলেও ধাক্কা সামলে ওঠেছিলেন তারা। চিসোরো ১৮ রানের সাব্বিরের উইকেট তুলে নিয়েছেন বটে। তবে ওই উইকেটের ৭০ ভাগ ভাগীদার আরভিন। সাব্বিরের পুলটি শর্ট মিডঅনে বাতাসে ভেসে বাঁ দিকে ঝাপিয়ে ক্যাচবন্দি করেছেন দর্শনীয় ভঙ্গিমায়। দলীয় ৫৪ রানে ইনফর্ম মুশফিকও (২) ফিরে যাওয়ায় কিছুটা হলেও চাপে পড়েছিল বাংলাদেশ। নাসিরও ব্যর্থ হয়েছেন নিশ্চিত জয়ের পথ রচনায়। ফিরে গেছেন ১৭ রানের মাথায়। এক রান পর তামিমের (৩১) পতনের পরে একটু শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছিল। সেখানে থেকেই দলকে ম্যাচে ফিরাতে মাহমুদ উল্লাহ-লিটন দাস মরিয়া হয়ে ওঠেছিলেন। পেরেছেনও। কিন্তু একটি অনাহূত শট খেলতে গিয়ে লিটনের ফিরে যাওয়াটা অনেকেরই ভাল লাগেনি। লিটন দাস আউট হয়েছেন ব্যক্তিগত ১৭ এবং দলের ১১৮ রানের মাথায়। ম্যাচ উইনার খ্যাত মাহমুদ উল্লাহ অধিনায়ক মাশরাফিকে নিয়ে সব শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে জয় নিশ্চিত করেছেন। জয় উইনিং শটটি ছিল ছক্কার। মেরেছেন মাশরাফি (১৫*)। হুটহাট যেভাবে ব্যাট চালান, শুক্রবারও তাই করেছেন। প্রয়োজনে দামী ব্যাটার বনে যাওয়া মাহমুদ উল্লাহ ২২*) তখন নন স্ট্রাইকে।

শুরুটা করেছিলেন অধিনায়ক মাশরাফি নিজেই। প্রথম ওভারের ৫ম বলেই সিকান্দার রাজাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন উইকেট থেকে। অফস্ট্যাম্পের বাইরে স্লোয়ারে বোনা বনেছেন সিকান্দার। তুলে দিয়েছেন মিডঅফে। লিটন ছিলেন ক্যাচ নিতে প্রস্তুত। জিম্বাবুয়ে দলীয় ৪ রানের মাথায় প্রথম উইকেট হারিয়েছে। আল-আমিনও ঠিক সেই পথেই হেঁটেছেন। নিজের তৃতীয় বলেই চাকাভাকে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেছেন। কিপার মুশফিক অসাধারণ এক ঝাপে লুফে নিয়েছেন চাকাভার উইকেট। আল-আমিনের শর্ট লেন্থের বলে স্কুপ খেলার চেষ্টা করেছিলেন চাকাভা। ব্যক্তিগত দ্বিতীয় ওভারের তৃতীয় বলেই আবার মাশরাফি ম্যাজিক। এবারের শিকারের নাম চিগাম্বুরা। বড় উইকেট। মাশরাফিরি নিখুঁত নিশানার বলটি মিডলস্ট্যাম্পের উপরের শেষ প্রান্তে লেগে ছিল। ১০ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ধুকতে থাকা জিম্বাবুয়ের ইনিংস শেষ পর্যন্ত ১৩১ ছুঁয়ে দেখেছে ম্যালকম ওয়েলারের বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে। জিম্বাবুয়ের এই ব্যাটসম্যান আউট হয়েছেন তাদের ইনিংসের শেষ সীমানায়। ওয়েলার ৪২ বলে ৬টি ছক্কা এবং ৪টি চারের মারে ৬৮ রান করেছেন। নাসির হাত ঘুরিয়ে তুলে নিয়েছেন উইলিয়ামসের (১৫) উইকেট। ফাঁক গলিয়ে উইকেট তুলে নিয়েছেন মাহমুদ উল্লাহও। তার উইকেটটিকে ব্রেক থ্রু বলা যায়। আরভিন-ওয়েলারে ১০০ রানের গণ্ডি অতিক্রম করেছিল জিম্বাবুয়ে। উইকেটে কিছুটা হলেও থিতু হয়ে ওঠেছিল ওই যুগল। শুরুর ধাক্কা সামলিয়ে ৬৭ রানের গুরুত্বপূর্ণ পার্টনারশিপও পড়েছিলেন। রেখেছিলেন দলকে রানে সচল। সেখানেই চোখ রাঙিয়েছেন মাহমুদ উল্লাহ। নিয়েছেন আরভিনের (২০) উইকেট। ১০৫/৫ জিম্বাবুয়ে। সব হারিয়েও একাই দাঁড়িয়েছিলেন ওয়েলার। কিন্তু অপর প্রান্তে তখন বাংলাদেশের বোলারদের উইকেট তুলে নেওয়ার উচ্ছ্বাস। ২ রান ব্যবধানে জুবায়ের তুলে নিয়েছেন ২ উইকেট। জংউইকে ফিরিয়ে দেওয়ার পর মাদজিভার উইকেট। তবে জিম্বাবুয়ের সবেচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উইকেটে ভাগ বসিয়েছেন মুস্তাফিজ; নিয়েছেন ওয়েলারের উইকেট। জিম্বাবুয়ের শেষ লেজও কাটা পড়েছে অফকাটারে। ১৯.৩ ওভারে জিম্বাবুয়ে অল আউট হয়েছে ১৩১ রানের মাথায়।

বাংলাদেশের ৪ বোলার মাশরাফি, আল-আমিন-মুস্তাফিজ এবং জুবায়ের ২টি করে উইকেট নিয়েছেন। একটি করে নামের পাশে রেখেছেন মাহমুদ উল্লা এবং নাসির।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

জিম্বাবুয়ে : ১৩১/১০, ১৯.৩ (ওয়েলার ৬৮, আরভিন ২০, উইলিয়ামস ১৫; মুস্তাফিজ ২/১৬, মাশরাফি ২/২০, আল-আমিন ২/২০, জুবায়ের ২/২০, মাহমুদ উল্লাহ১/১৮ ও নাসির ১/২৯।)

বাংলাদেশ : ১৩৬/৬, ১৭.৪ ওভার (তামিম ৩১, মাহমুদ উল্লাহ ২২*, সাব্বির ১৮, লিটন ১৭, নাসির ১৬, মাশরাফি ১৫*; ক্রেমার ৩/২৯, চিসোরো ২/১৫।)

ফল : বাংলাদেশ ৪ উইকেটে জয়ী।

শেয়ার করুন