জাতীয় ৪ নেতার উত্তরসূরীরা কে কোথায় কেমন আছেন?

2-lidear-family-1১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর। ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয় জাতীয় ৪ নেতা— মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এবং মন্ত্রিসভার সদস্য ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে।

ওই ৩ নভেম্বর থেকেই অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে সময় পার করতে হয়েছে জাতীয় ৪ নেতার পরিবারের সদস্যদের। তবে এমন দুঃসহ ঘটনার পরও জাতীয় চারনেতা উত্তরসূরীরা সংগ্রামময়-জীবনে নিজ নিজ ক্ষেত্রে সফলতার পথ থেকে পিছপা হননি। তারা ভাল আছেন।

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ডের ৪০ বছর পর জাতীয় ৪ নেতার উত্তরসূরীদের বর্তমান অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক—

সৈয়দ নজরুল ইসলামের পরিবার
সৈয়দ নজরুল ইসলামের বড় ছেলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। বর্তমানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০০৯ সালে দলের জাতীয় সম্মেলনে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০০৯ সালে গঠিত ১৪ দলীয় জোট সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১২ সালের ২৯ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের সম্মেলনে পুনরায় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর ৭ জানুয়ারি গঠিত সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। ২০১৫ সালের ৯ জুলাই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। একই বছর ১৬ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান তিনি।

সৈয়দ নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় পুত্র ড. মঞ্জুরুল ইসলাম। সপরিবারে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। তার তৃতীয় পুত্র মেজর জেনারেল (অব.) শাফায়াতুল ইসলাম বাংলাদেশ সেনা বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। চতুর্থ পুত্র শরীফুল ইসলাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সৈয়দ নজরুল ইসলামের বড় মেয়ে ডা. লিপি যুক্তরাজ্যে চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন এবং তার ছোট মেয়ে রোপা যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন।

তাজউদ্দীন আহমদের পরিবার
১৯৭৫ পরবর্তী আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে ১৯৭৭ সালে দলের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সহধর্মিণী সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন। ১৯৭৮ সালে দলটির জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। তবে সেই সময় থেকে ২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর আমৃত্যু আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তাজউদ্দীন আহমদের বড় মেয়ে শারমিন আহমদ শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। বর্তমানে তিনি ইথোপিয়াতে অবস্থান করছেন। ইথোপিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ বছরের কাজ শেষ করে ফের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসবেন বলে জানা গেছে। তিনি লেখালেখিও করেন। ২০১৪ সালের জুন মাসে শারমিন আহমদ লিখিত ‘তাজউদ্দীন আহমদ : নেতা ও পিতা’ বইটি প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত বইটি নিয়ে দেশের রাজনীতিতে আলোচনা সমালোচনার ঝড় উঠে।

তাজউদ্দীন আহমদের দ্বিতীয় মেয়ে সিমিন হোসেন রিমি বর্তমানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য ও গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১২ সালের ২৯ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনে কেন্দ্রীয় সদস্য হিসেবে মনোনীত হন তিনি। তৃতীয় মেয়ে মাহজাবিন আহমদ কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত নয়। বর্তমানে ঢাকাতেই অবস্থান করছেন।

প্রথম প্রধানমন্ত্রীর একমাত্র পুত্র তানজিম আহমদ সোহেল তাজ। ২০০৮ সালের নির্বাচনে গাজীপুর-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। একই বছর ৩১ মে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ওই পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার তিন বছর পরও সোহেল তাজের ব্যাংক হিসাবে প্রতিমন্ত্রীর বেতন-ভাতা জমা হতে থাকায় ২০১৩ সালের ১৭ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে একটি চিঠি দেন তিনি। পাশাপাশি তিনি পদত্যাগ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারিরও আবেদন জানান। সেই সময় থেকে তার ব্যক্তিগত হিসেবে পাঠানো বেতন-ভাতার যাবতীয় অর্থ ফেরত নেওয়ারও অনুরোধ জানানো হয় ওই চিঠিতে। ২০১৩ সালের ২৩ এপ্রিল ব্যক্তিগত সহকারীর মাধ্যমে সংসদ থেকে পদত্যাগ করার আবেদন স্পিকারের কাছে পাঠান সোহেল তাজ। তবে সশরীরে পদত্যাগপত্র জমা না দেওয়ায় তা গ্রহণ করা হয়নি বলে জানান স্পিকার। ২০১২ সালের ৭ জুলাই সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের উপস্থিতিতে তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন স্পিকার আবদুল হামিদ এ্যাডভোকেট। একই বছরে ৩০ সেপ্টেম্বর উপনির্বাচনে ওই আসনে নির্বাচিত হন সিমিন হোসেন রিমি।

ক্যাপ্টেন (অব.) এম মনসুর আলীর পরিবার
ক্যাপ্টেন (অব.) এম মনসুর আলীর ৬ সন্তান। ৫ ছেলে ১ মেয়ে। বড় ছেলে মরহুম ড. মোহাম্মদ সেলিম আওয়ামী লীগের এক সময়কার সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যের দায়িত্ব পালন করেন। মোহাম্মদ নাসিম বর্তমানে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যের দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৯৬ সালের সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে জয় পাওয়া বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মোহাম্মদ নাসিম। এম মনসুর আলীর তৃতীয় পুত্র মো. রেজাউল করিম ঠিকাদারী ব্যবসায় নিয়োজিত। তার চতুর্থ পুত্র ডা. মারুফ আহমেদ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল ২০০৪ সালে করেছেন। পঞ্চম পুত্র মঞ্জুর আহমেদ পেশায় ব্যাংকার। একমাত্র মেয়ে শিরিন নিগার দীর্ঘ ৩০ বছর নিজ জন্মভূমি ছেড়ে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। পেশায় এরোমেটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। দাদার উত্তরসূরী হয়ে রাজনীতিতে এসেছেন মোহাম্মদ নাসিমের পুত্র তানভীর শাকিল জয়। তিনি ২০০৯ সালের নির্বাচনে সিরাজগঞ্জ-১ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

এইচ এম কামরুজ্জামানের পরিবার
এ এইচ এম কামরুজ্জামানের বড় ছেলে এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন ২০০৮ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালের ১৬ জুন অনুষ্ঠিত রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। বর্তমানে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও রাজশাহী মহানগরের সভাপতি দায়িত্ব পালন করছেন। এ এইচ এম কামরুজ্জামানের অপর ছেলে এ এইচ এম এহসানুজ্জামান স্বপন আন্তর্জাতিক একটি কোম্পানিতে কর্মরত রয়েছেন।

এ এইচ এম কামরুজ্জামানের ৪ মেয়ের ৩ জনই গৃহিণী। তার বড় মেয়ে ফেরদৌস মমতাজ সাঈদ গৃহিণী স্বামী আবু সাঈদ দুলাল আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য। তার দ্বিতীয় মেয়ে রিয়া জুম্মা গৃহিণী স্বামী সাজ্জাতুল জুম্মা শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক। এ এইচ এম কামরুজ্জামানের তৃতীয় মেয়ে রওশন আক্তার স্বামী রেহান ব্যবসায় নিয়োজিত। এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামানের চতুর্থ মেয়ে কবিতা সুলতান ঢাকার একটি বেসরকারি কলেজে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত রয়েছেন।- দ্য রিপোর্ট

শেয়ার করুন