বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুরের রক্তে সিক্ত কমলগঞ্জের ধলই সীমান্ত

কমলগঞ্জে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতি সৌধ

কমলগঞ্জে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতি সৌধ

কমলগঞ্জ প্রতিনিধি : বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের ৪৪ তম শাহাদাত বার্ষিকী আজ। ১৯৭১ সালের এই দিনে (২৮ অক্টোবর) রক্তে স্নাত হয়েছিল মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ধলাই সীমান্ত। হানাদার পাকবাহিনীর গুলিতে শহীদ হন বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমান। প্রতি বছর ২৮ অক্টোবর উপজেলা প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল, বিজিবি ব্যাটেলিয়ন কমান্ড ও প্রেসক্লাব ধলই সীমান্তে বীর শ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্পণ করেন।
১৯৪৫ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার চাপড়া থানার ডুমুরিয়া গ্রামে তার জন্ম হয়। তার পিতার নাম মরহুম আক্কাচ আলী এবং মাতার নাম মরহুমা কায়ছুন নেছা। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর তাদের পরিবার যশোরের সীমান্তবর্তী মহেশপুর উপজেলার খর্দ্দখালিশপুর গ্রামে বসবাস শুরু করেন। ২৬ বছর বয়সে ১৯৭১ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের ১১ টি সেক্টরের মধ্যে ৪ নং সেক্টর ছিল মেজর জেনারেল সি আর দত্তের অধীনে। সেটির একটি সাব সেক্টর হলো ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কমলপুর। সেই সেক্টর থেকে ২৪ অক্টোবর শেষ রাত্র হতে ২৮ অক্টোবর ভোর পর্যন্ত কমলগঞ্জ উপজেলার ধলই সীমান্তে ইপিআর, পরবর্তীতে বিডিআর ও বর্তমান বিজিবির ফাঁড়ির সামনে থাকা পাক সেনাদের সাথে তুমুল যুদ্ধ চলে মুক্তিবাহিনীর। ধলই সীমান্তে আক্রমণকারী মুক্তিবাহিনীর প্লাটুনের এ্যাসল্ট অফিসার ছিলেন মেজর (অব.) কাইয়ুম চৌধুরী। আর সিপাহী হামিদুর রহমান ছিলেন কাইয়ুম চৌধুরীর রানার। চারদিকে চা বাগান, মাঝখানে ধলই সীমান্ত চৌকি। চৌকি থেকে দক্ষিণপূর্ব দিকে ত্রিপুরার কমলপুর সাব সেক্টর ক্যাম্প থেকে সকল প্রস্তুতি নিয়ে ২৮ অক্টোবর ভোরে কাইয়ুমের নেতৃত্বে একটি দল পাক সেনাদের উপর চতুর্দিক থেকে সাঁড়াশি আক্রমন চালায়। ব্যাপক গোলাবর্ষনে পাক সেনাদের ক্যাম্পে ধরে যায় আগুন। প্রচন্ড গুলিবর্ষন ও পাকবাহিনীর পুতে রাখা মাইন বিষ্ফোরণে বেশ কিছু মুক্তিযুদ্ধা হতাহত হন। ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য হামিদুর রহমান সীমান্ত চৌকি দখলের উদ্দেশ্যে মৃত্যুকে তুচ্ছ করে হালকা একটি মেশিনগান নিয়ে বিক্ষিপ্ত গোলাগুলির মধ্যে হামাগুড়ি দিয়ে শক্রপক্ষের ৫০ গজের মধ্যে ঢুকে পড়েন। গর্জে উঠে তার হাতের মেশিনগান। শক্র দলের অধিনায়কসহ বেশ কয়েকজন সৈন্য এতে প্রাণ হারায়। এমন সময় শক্র পক্ষের একটি বুলেট তার কপালে বিদ্ধ হয়। মুহূর্তেই সামীন্তবর্তী ছড়ার পারে মৃত্যুর কুলে ঢলে পড়লেন হামিদুর রহমান। তখন তার সহপাঠীরা তার লাশ নিয়ে ৩০ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ ভারতের আমবাসা গ্রামের একটি মসজিদের পাশে দাফন সম্পন্ন করেন। ৩৬ বছর পর ২০০৭ সালের ১১ই ডিসেম্বর তার লাশ ওই স্থান থেকে উত্তোলন করে ঢাকার মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। ২০০৫ সালে তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী মরহুম এম সাইফুর রহমান ধলাই সীমান্ত এলাকায় বীর শ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের স্মৃতি সৌধের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছিলন।

১৯৯২ সালে তৎকালীন বিডিআর বর্তমান বিজিবির উদ্যোগে সর্ব প্রথম ধলই সীমান্ত চৌকির পাশে নির্মাণ করা হয় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মরনী। ২০০৬ সালে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ১০ শতাংশ জায়গার উপর সাড়ে ১৪ লক্ষ টাকা ব্যয়ে গণপূর্ত বিভাগ নির্মান করে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমান স্মৃতিস্তম্ভ। এছাড়া কমলগঞ্জের ভানুগাছ-মাধবপুর সড়কটির নামকরন করা হয় বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমান সড়ক হিসেবে। ২০০৭ সালে ধলই বিওপির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমান সীমান্ত ফাঁড়ি। ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে শ্রীমঙ্গস্থ ১৪ বিজিবির সাবেক অধিনায়ক ল্যাফটেন্যান্ট কর্নেল নুরুল হুদার উদ্যোগে ধলই সীমান্ত চৌকি এলাকায় গড়ে তোলা হয় আকর্ষনীয় পর্যটন স্পট। নির্মান করা হয় একটি বড় পুকুর, প্রস্তাবিত মনুমেন্টে রাখা হয় গাড়ী পার্কিং এরিয়া, টয়লেট, ওয়েটিং রুম, রিসোর্ট, ক্যাফেটারিয়া, গলঘর। নির্মাণ করা হয় সীমান্ত স্মৃতি কুঞ্জ দুতলা ঘর, সীমান্ত অবকাশ যাপন কেন্দ্র। যা পর্যটকদের জন্য এখন আকর্ষনীয় স্থান হিসেবে পরিচিত হয়েছে। হামিদুর রহমানের ৪৪ তম শাহাদাৎ বার্ষিকী উপলক্ষে কমলগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আজ বুধবার তার স্মৃতিস্তম্ভে^ পুষ্পস্তবক অর্পন, ফাতেহা পাঠ ও দোয়া মাহফিলের কর্মসূচী নেয়া হয়েছে।

শেয়ার করুন