‘সবুজ চা পাতার ফাঁকে উঁকি দেয় লাল টকটকে সূর্য’

শহীদ মিনারের মূল স্তম্ভের পেছনে সবুজ টিলার মতো ভাঁজ ভাঁজ ভূমি, ঠিক মাঝখানে টকটকে লাল সূর্য: ছবি আমির হোসেন সাগর

শহীদ মিনারের মূল স্তম্ভের পেছনে সবুজ টিলার মতো ভাঁজ ভাঁজ ভূমি, ঠিক মাঝখানে টকটকে লাল সূর্য: ছবি আমির হোসেন সাগর

সিলেটের সকাল : চায়ের দেশ সিলেট। পাহাড়-টিলার নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই জনপদ। প্রতিদিন ভোরে সবুজ চা পাতার ফাঁক গলে উঁকি দেওয়া লাল টকটকে সূর্যের আবহই যেন প্রতিবিম্বিত হয়েছে এই শহীদ মিনারে। শহীদ মিনারের মূল স্তম্ভের পেছনে সবুজ টিলার মতো ভাঁজ ভাঁজ ভূমি, ঠিক মাঝখানে টকটকে লাল সূর্য। মাটি দিয়ে বিদ্রোহের প্রকাশ ঘটিয়ে এমন শহীদ মিনার বাংলাদেশে এই প্রথম নির্মিত হলো।

মহান ভাষা আন্দোলনে সিলেটের অবদান অনন্য। সারা দেশে ১৯৪৮ সাল থেকে এই আন্দোলন শুরু হলেও সিলেটের মানুষ ১৯৪৭ সাল থেকেই ছিল সরব। এমনকি প্রকাশ্যে সভাও হয়। সিলেটের পত্রপত্রিকায়ই প্রথম বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি ওঠে। আর ভাষা আন্দোলনে সিলেটের নারীরা যে অনন্য ভূমিকা রাখেন তা আজ ইতিহাসের অংশ। কিন্তু সিলেটে দীর্ঘদিন ছিল না কোনো শহীদ মিনার। আশির দশকের শেষ দিকে চারজন মুক্তিযোদ্ধার উদ্যোগে নির্মিত হয় স্থায়ী শহীদ মিনার। কিন্তু বারবার প্রতিক্রিয়াশীলদের হামলার শিকার হয় গর্বের স্থাপনা।

সর্বশেষ ২০১৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি হেফাজতের তাণ্ডবে ক্ষতবিক্ষত হয় সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। এরপর সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের উদ্যোগে শুরু হয় এটির পুনর্নির্মাণ কাজ। এতে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয় হয়। প্রকল্প বাস্তবায়ন করে সিলেট সিটি করপোরেশন। শহীদ মিনারটির দৃষ্টিনন্দন নকশা আঁকেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শুভজিৎ চৌধুরী।

নকশা অনুযায়ী শহীদ মিনারে পাঁচটি স্থাপনা থাকছে। এতে মূল বেদি, ভূগর্ভস্থ প্রদর্শনী কেন্দ্র ও গ্রন্থাগার, মুক্তমঞ্চ, অনুশীলন কক্ষ, গ্রিনরুম ও ব্যাক স্টেজ এবং সামনের চত্বর রয়েছে। ভূগর্ভস্থ প্রদর্শনী কক্ষে থাকবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রকাশনা। এখানে বসে যে কেউ বই পড়া বা কিনে নিয়ে যেতে পারবে।

স্থপতি শুভজিৎ চৌধুরী জানান, নবনির্মিত এই শহীদ মিনারের উচ্চতা ভূমি থেকে ৪৫ ফুট ও প্রস্থে ৩৫ ফুট। মিনারের পাদদেশে এই ভূমির সংস্পর্শেই মুক্ত মঞ্চ। মঞ্চের আকার ৩০ ফুট বাই ২০ ফুট। মঞ্চের পেছনে রয়েছে ব্যাক স্টেজ, অনুশীলন পরিসর, গ্রিনরুম, টয়লেট ইত্যাদি। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের মূল বেদিতে যাওয়ার জন্য ১০ ফুট প্রস্থের র‌্যাম্প, ৩০ ফুট প্রস্থের সিঁড়ি, জরুরি নির্গমন পথ ও মঞ্চের ব্যবহারের জন্য পৃথক প্রবেশপথ বিন্যাস করা হয়েছে। সংগ্রহশালার আয়তন তিন হাজার বর্গফুট, সমাবেশ প্রাঙ্গণের আয়তন আট হাজার বর্গফুট এবং উন্মুক্ত প্রদর্শনী পরিসরের আয়তন আড়াই হাজার বর্গফুট।077

এই স্থপতি বলেন, সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরের নকশা ভাবনার মূল প্রতিপাদ্য ‘চেতনায় আন্দোলিত ভূমি থেকে জেগে ওঠা বাঙালির আবহমান সংগ্রামী ঐতিহ্য। বিদ্রোহ নিয়েই আমাদের গৌরব, বাঙালি জাতির বিদ্রোহে ভূমি যে অংশ নেয় তার বহিঃপ্রকাশ শহীদ মিনারের স্থাপত্যশৈলীতে দেখানো হয়েছে।’
এদিকে, পুন:নির্মিত শহীদ মিনারের উদ্বোধন উপলক্ষে মাস ব্যাপী চলে এর উদ্বোধনীকার্য অর্থাৎ প্রস্তুতি। ইতোমধ্যে সকল প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। সিলেট নগরীর জুড়ে বয়ে যাচ্ছে এক আনন্দ উৎসবের হাওয়া সবার মাঝে। রাস্তা-ঘাট থেকে শুরু করে নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টগুলোকে রঙিন ফেস্টুন, রাস্তার বিপরীত পাশের দেয়ালগুলোতে তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্থিরচিত্র আর মূল সড়কে আঁকা হয়েছে বিশাল আলপনা। ফলে সকাল থেকে লোকজন ভিড় করছেন কেন্দ্র্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গনে।
সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার উদ্বোধন করতে আজ সিলেট আসছেন সরকারের চারজন প্রভাবশালী মন্ত্রী। বিকেল সাড়ে ৪টায় পায়রা উড়িয়ে শহীদ মিনারের উদ্বোধন করবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সন্ধ্যার পর অনুষ্ঠিত হবে ফলক উন্মোচন ও সুধী সমাবেশ। বিশেষ অতিথি থাকছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর।                                                                                                                                    -তথ্য সূত্র কালের কন্ঠ
শেয়ার করুন