মুক্তিযোদ্ধা শ্বশুর (ছোটগল্প)

muktijuddaমুনশি আলিম: এক. ‘‘যেনু বইয়্যা খায়, হেনু বইয়াই অ্যাগে, … এইডা তো মানুষ না গো, আস্তা একটা জানোয়ার! উপরওয়ালা যে আমার কপালে কী রাকছাল গো! জানুয়াররে টানতে টানতে জীবন আমার একবারে কয়লা অইয়্যা গেছে!’ বাজখাই কণ্ঠে কথাগুলো মুক্তিযোদ্ধা শ্বশুর সুদীপ তালুকদারকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললো শিখা। সে সুদীপের একমাত্র ছেলে দিলীপের স্ত্রী। বয়স পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি। কিন্তু শরীরের গাঠনিক অবয়ব এখনো টিনএজার তরুণীদের মতোই। বড় বোন অনামিকার কল্যাণে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি কোনক্রমে অতিক্রম করা সম্ভব হয়েছিল। এরপর ষোল পেরুতে না পেরুতেই ধনাঢ্য দিলীপের সাথে তার বিয়ে হয়।

দিলীপের বিদ্যার দৌঁড় প্রাইমারি পর্যন্ত। লেখাপড়ায় তেমন একটা ভালো ছিল না। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় চারবার একই ক্লাসে ছিল কিন্তু পাশ করা তার পক্ষে আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এজন্য ‘আদুভাই’ গল্পের সাথে পরিচিত গ্রামের অনেকেই তাকে ‘আদুভাই’ বলে ডাকে। এতে সে মোটেও রাগ করে না, লজ্জাবোধ করে বলেও মনে হয় না। শারীরিক উচ্চতার দিক দিয়ে সে বাংলাদেশের প্রমাণসাইজ মানুষের মতো। পড়াশোনাতে ভাল না হলে কী হবে, ছবি আঁকার ক্ষেত্রে তাঁর জুড়ি নেই। কিন্তু বিয়ের পর সঙ্গদোষে এই একটিমাত্র প্রতিভাও লজ্জিত হয়ে পালিয়ে গেছে অন্ধকারের গহীনে।

এই কিছুদিন আগেও সুদীপ তালুকদারের বেশ জমিজমা ছিল। এলাকার মধ্যে সকলেই তাকে বিত্তশালী বলেই জানতো। কেউ কেউ আবার তাকে নাম ধরে ডাকতো না, ডাকতো তালুকদার মুক্তিযোদ্ধা নামে। গ্রামের আটদশজন ধনী গৃহস্তের মতো তারও কাঁচা-পাকা ঘর-বাড়ি ছিল। গোলা ভরা ধান আর গোয়াল ভরা গরু ছিল। দিলীপ জুয়া খেলে মোটামুটি তিন চতুর্থাংশ সম্পত্তিই এক বছরের মধ্যে প্রায় শেষ করে দিয়েছে। অবশ্য এ নিয়ে স্ত্রী শিখার সাথে তার বেশ কয়েকবার মনোমালিন্য হয়। একবার তো প্রায় ছাড়াছাড়িও হবার উপক্রম হয়েছিল। নিজের ভুল স্বীকার করার মাধ্যমেই সেবার রক্ষা পেয়েছিল। তাছাড়া জুয়া খেলবে না বলে তিনি যে শপথ করেছিলেন সে শপথের প্রতিও অগাধ বিশ্বাস স্থাপন করেছিল শিখা। কিন্তু সে বিশ্বাস সপ্তাহ না পেরুতেই ভাঙ্গন ধরিয়েছিল দিলীপ। কুকুরের লেজ যেমন সহজে সোজা হবার নয় তেমনি জুয়াখোরদের স্বভাবও সহজে পরিবর্তন হওয়ার নয়!

এখন সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে শুধু নিজের ভিটে বাড়িটা আর বনেদী আমলের ছোট একটি পুকুর। বছর চারেক ধরে সুদীপ মুক্তিযোদ্ধার ভাতা পাচ্ছে। প্রথম প্রথম টাকাগুলো নিজের কাছে রাখলেও পরবর্তীতে তা দিলীপের হাতে তুলে দেয়। আর বউভক্ত দিলীপ তুলে দেয় শিখার হাতে। যেদিন টাকা হাতে পায় সেদিন শিখা শ্বশুরের সাথে খুব ভাল ব্যবহার করে। আপ্যায়ন বা সেবা যত্নের দিক থেকেও কোন ঘাটতি রাখে না।

দুই. মাস দুয়েক আগে সুদীপের সুন্দরী স্ত্রী বড় ননদের জামাইয়ের সাথে রাতের আঁধারে পালিয়ে যায়। স্ত্রী মারা গেলে হয়ত তা সময়ে সয়ে যায় কিন্তু অন্যের সাথে পালিয়ে গেলে যে পুরুষত্বেরই অসম্মান হয়! এর চেয়ে আর বড় কষ্ট বোধ করি পুরুষের আর দ্বিতীয়টি নেই – এ সত্য শুধু সুদীপ কেন, যে কোন শিক্ষিত-অশিক্ষিত পুরুষমাত্রই স্বীকার করবে। এই সীমাহীন কষ্ট সইতে না পেরে সেদিনই সে বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। এর দুদিনের মধ্যেই তার শরীরের অর্ধাংশ অবশ হয়ে যায়। সুন্দর মুখ বিকৃত হয়ে যায়। পক্ষাঘাতগ্রস্থ হওয়ার সপ্তাহখানেক পর থেকেই তার আদরের পুত্রবধূর আচরণে সহসাই অভূতপূর্ব  পরিবর্তন দেখা গেল।

যে শ্বশুর নিজে কাপড় না কিনে স্ত্রী এবং পুত্রবধূর জন্য আনত, নিজে ভাল ফলমূল না খেয়ে স্ত্রী ও পুত্রবধূর জন্য আনত, আজ সেই পুত্রবধূ কিনা পর হয়ে গেল! সাত সকালে শিখার অশ্রাব্য গালি শুনে এমনি নানা রকম স্মৃতি সুদীপের হৃদয়ের ক্যানভাসে ভেসে ওঠতে থাকে। তার মনে পড়তে থাকে মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বাহিনীকে নিজের পৌরুষত্বের বিনিময়ে বাঁচানোর কথা। পাক হানাদারদের বোমার একটি তেজস্ক্রীয় অংশে আক্রান্ত হয়ে তার যৌনক্রিয়া একেবারে প্রায় দুর্বল হয়ে যায়। কিন্তু তাতেও তার দুঃখ নেই। নিজের অপূরণীয় ক্ষতি স্বীকার করেও যে সেদিন তিনি পঁয়ত্রিশ জন মুক্তিযোদ্ধাকে বাঁচিয়ে ছিলেন সে আনন্দের মধ্যেই তিনি নিজেকে প্রতিনিয়ত নতুন করে খুঁজে বেড়ান। নিজের অক্ষমতাকে ভুলে যাওয়ার নিরমত্মর চেষ্টা করেন।

আজ তার নিজের কাছেই অবাক লাগে, যে হাতে তিনি পাকহানাদারদের ব্যাংকার গুড়িয়ে দিয়েছিলেন, আজ সে হাতে ভাত পর্যন্ত তুলে খেতে পারেন না! সত্যিই সময় যে কাকে কখন কোথায় এনে দাঁড় করায় বলা যায় না। এই প্রথিতযশা মুক্তিযোদ্ধার চিকিৎসা হওয়ার টাকাটি পর্যন্ত নেই! কতদিন থেকে সে অসুস্থ! এই খবর কি আর লুকানো থাকার কথা! অথচ জীবিত মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুরা পর্যন্ত তাকে দেখতে এল না। দেশের জন্য সে কি-ই না করলো, নিজের সোনার যৌবন পর্যন্ত উৎসর্গ করলো, নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিলো কিন্তু রাষ্ট্র? কি দিলো? আজ তার এই প্রতিকূল মুহূর্তে কেউ পাশে নেই। না আছে সরকার, না আছে নিজের আত্মীয়-পরিজন! ‘সুসময়ের বন্ধু অনেকেই হয়, অসময়ে হায় কেউ কারো নয়’! কথাগুলো মনে করতে করতে সুদীপের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে।

শ্বশুরের সে অশ্রুসিক্ত চোখের দিকে চোখ পড়তেই শিখা আরও তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে। তার গলার স্বর আরও কর্কশ হয়ে ওঠে। সামাজিকতার দায়ে কেবল নিজের হাতে মেরে ফেলতে পারে না, নতুবা যন্ত্রণা লাঘবে হয়ত সেটাও করে ফেলত! না মারলেই বা কী! প্রত্যেহ এইরকম মানসিক নির্যাতনও যে মৃত্যু তুল্য! শিখার গলা চড়াও হলেও সুদীপ কোন প্রতি উত্তর করতে পারে না। একে তো কথা বলতে পারে না, তার ওপর আবার চলতে অক্ষম। ফলে পুত্রবধূর অবহেলা না মেনেও তার কোন উপায় নেই।

সুদীপের ডান হাত পুরোপুরি অবশ। বামহাত দিয়ে কোনরকমে আহারাদির কাজ সম্পন্ন করতে পারে। রাতে বাসি খাবার খাওয়ার কারণে সকাল থেকেই তার বেশ কয়েকবার পাতলা পায়খানা হয়েছে। পাতলা পায়খানা হলে দৈহিক কর্মক্ষম ব্যক্তির অবস্থাও শোচনীয় হয়ে যায় আর সেদিক থেকে সুদীপ তালুকদারের অবস্থা খুব খারাপ হবে সেটাই স্বাভাবিক। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি বলে সে বিছানাতেই পায়খানা করে দিয়েছে। তার নিজের পায়খানা নিজের শরীরের সাথেই লেপ্টে রয়েছে। শত চেষ্টা করেও সে একটু সরতে পারলো না। তার রুমের মধ্যেই রাখা হয়েছিল শুটকি মাছ। শুটকি আর পায়খানার গন্ধ পেয়ে কোথা থেকে যেন কালো মাছিগুলো ছুটে এল। মিষ্টির গন্ধ পেলে যেমন পিঁপড়ার দল আসে তেমনি পায়খানা ও শুটকি মাছের গন্ধ পেলেও কালো মাছিরা ভনভন করে ছুটে আসে। প্রায় মাইল খানেক দূর থেকে নাকি মশারা মানুষের উপস্থিতি টের পায়, কিন্তু মাছি কতটুকু দূর থেকে শুটকি ও পায়খানার উপস্থিতি টের পায় তা নিয়ে বিস্তর এক গবেষণা হতে পারে!

তিন. কিছু কিছু মাছি সুদীপের পায়খানার ওপর বসে গুঞ্জন তোলে, লুটোপুটো খায়। ক্ষণপরে আবার তারই পায়খানায় লুটোপুটো খাওয়া কতক মাছি তার নাকের ওপর বসে। বিড়বিড় করে হেঁটে হেঁটে ঠোঁটে আসে। সুদীপ বিস্ময়ী চোখ মেলে সবই দেখে। কিন্তু তা তাড়ানোর মত শক্তিটিও পর্যন্ত আজ তার নেই। এমনিতেই অনিয়মিত খাওয়া-দাওয়া তার ওপর বেশ কয়েকবার পাতলা পায়খানা হওয়ায় তার শরীর বেশি নাজেহাল হয়ে পড়েছে। হায়রে মুক্তিযোদ্ধা! যে হাতে পাক হানাদারদের আস্তানা গুড়িয়ে দিয়েছে, আজ সে হাতে একটি মাছি পর্যন্ত তাড়াতে পারে না! সত্যিই ভাগ্যের কারিগরের খেলা বুঝা বড় মুশকিল।

নাক বেঁধে পায়খানা পরিষ্কার করতে করতে শিখা বলতে থাকে- ‘‘বুইড়া ব্যাডা মরেও না, আমারেও
… । ওই শম্পা, কনু গেলি? ছিনালরে কামের সোময় পাওয়া যায় না। তর দাদারে একটু সেমাই
খাওয়া।’’

বিছানা পরিষ্কার হয়ে গেলে সে পাশের বাড়ি চলে যায়। যাওয়ার আগে শম্পারে পুনরায় পূর্বোক্ত কথাটি বলে যায়। শম্পা তাদের একমাত্র মেয়ে। বয়স এ বছরই আট পূর্ণ হল। দেখতে খুব আকর্ষণীয় হলেও শম্পা ছিল একটু হাবাগোবা টাইপের। ঘরে দুই বাটিতে সেমাই রাখা আছে। একটি নিচে রাখা অপরটি বিছানার ওপর। উচ্চতায় একটু খাট হওয়ায় সে নিচের বাটিটি নিয়ে তার দাদা সুদীপ তালুকদারকে দিল।

সুদীপ খেতে পারছে না। কিন্তু নজি হাতে তুলে খাওয়ার জন্য ছঁটফট করছে। বিষয়টি ছোট্ট শম্পাও বুঝে ফেলল। পরক্ষণে বেশ একটু দরদ নিয়ে শম্পাই পরপর কয়েকবার তাকে খাইয়ে দিল। খাওয়ার কিছুক্ষণ পরই সুদীপের গুঙ্গানি শুরু হয়। সে গুঙ্গানি মুহুর্তেই তীব্র থেকে আরও তীব্রতর হতে লাগলো। বুক ফাটা চিৎকার নেই কেবল বোবাদের মতো আউআউ করতে লাগলো। মুহূর্তেই সুদীপের চোখ লাটিমের মতো বড়ো আর রক্তিম হতে থাকে, অক্ষিকোঠর থেকে এই বুঝি বেরিয়ে আসবে! মাথা তুলে বমির ভাব করে কিন্তু হয় না। আকাশে যেমন মেঘ ডাকলেও অনেক সময় বৃষ্টি হয় না, তেমনি আর কি! ক্রমশই তার শরীর নীলবর্ণ হয়ে ওঠছে। অবস্থা বেগতিক দেখে শম্পা দৌঁড়ে তার মায়ের কাছে যায়। গিয়ে বলে- মা, দাদা যেন ক্যামুন করতাছে? জলদি আহ্!

শিখা তেমন একটা গুরুত্ব দিল না। ভাবলো, এ আর নতুন কী! তবু শম্পাকে আশ্বাসের ছলে বলল- তুই যা খেলাগা, আমি ইটটু পরে যামু। আশ্বাস পেয়ে শম্পা চলে যায়। প্রতিবেশি রুমানার সাথে শিখার বেশ ভাব। বহুদিন পর রুমানা বাপের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। বাল্যকালের সই বলে কথা! কত কথা যে জমানো, সে না বলে কি আর যাওয়া যায়!

এর প্রায় ঘণ্টা তিনেক পর শিখা ঘরে ফিরে। রুমে ঢুকেই দেখে মেঝতে রাখা পায়েসের বাটি নেই। তার মনে ছ্যাৎ করে ওঠে। নিচের বাটিতে যে বিড়াল মারার জন্য পায়েসের সাথে বিষ মাখানো ছিল! শিখা দৌঁড়ে শ্বশুরের ঘরে প্রবেশ করে। সুদীপের বুকের বাম পাশেই সে পায়েসের বাটি। একেবারে খালি। সব পায়েসই বোধ করি খেয়েছে। সুদীপের পলকহীন চোখের দিকে তাকিয়ে এক অজ্ঞাত অপরাধবোধে সে জর্জরিত হতে থাকে। তার নিজের ভেতরেই চলে নির্লিপ্ত ক্ষরণ! গভীর রাতের মতোই নিস্তব্দ সুদীপের কক্ষ।

শেয়ার করুন