চারকলের ধোঁয়ায় দূষিত নগরীর শেখঘাটের পরিবেশ

চারকলের ধোঁয়ায় দূষিত নগরীর শেখঘাটের পরিবেশ: ছবি আমির হোসেন সাগর

চারকলের ধোঁয়ায় দূষিত নগরীর শেখঘাটের পরিবেশ: ছবি আমির হোসেন সাগর

বিশেষ রিপোর্ট : চার কলের ধোঁয়ায় দূষিত হয়ে উঠেছে সুরমা নদী সংলগ্ন সিলেট নগরীর শেখঘাটের পরিবেশ। পরিবেশ আইনের তোয়াক্কা না করে ওই এলাকায় গড়ে উঠেছে কমপক্ষে ৪০টি চার কল। রয়েছে-অধর্শতাধিক রাইস মিল ও সো মিল। এসব মিল থেকে নির্গত ধোঁয়া ও ধুলোয় বিষিয়ে উঠেছে সেখানকার পরিবেশ। এ কারণে সেখানকার বাসিন্দাদের শ্বাস কষ্ট, অ্যাজমা এবং শিশুদের নিউমোনিয়াসহ নানা জটিল রোগের আক্রান্ত হওয়ার আশংকা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, চারকলের কারখানায় ধানের গুড়া পুড়য়ে তৈরী এক ধরণের লম্বা আকৃতির কালো লাকড়ি উৎপাদন হয়। সিলেট বিভাগে এই লাকড়ির বেশ কদরও রয়েছে। বিশেষ করে গ্যাসবিহীন হোটেল রেস্তোরাঁয় জ্বালানীর প্রধান উৎস লাকড়ি হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ফলে দিন দিন এই লাকড়ির যেমন ব্যবহার বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে প্রসারও। কম টাকা বিনিয়োগ করে বেশি মুনাফা অর্জন হওয়ায় অনেকেই বর্তমানে এই ব্যবসায় ঝুঁকে পড়ছেন। এই লাকড়ী তৈরীর প্রধান উপাদান ধানের উচ্ছিষ্ট গুড়া  হওয়ায় শেখঘাট এলাকার অধিকাংশ রাইস মিলের ব্যবসায়ীরাও এই ব্যবসায় ঝুঁকে পড়ছেন। বর্তমানে শুধু শেখঘাট এলাকায় প্রায় ৪০টির মতো চারকলের মিল গড়ে উঠেছে।

সরেজমিনে শেখঘাট এলাকার স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি  ও এসব মিলের সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, শেখঘাট এলাকায় রাইস মিল ও সো’ মিলের জন্য প্রসিদ্ধ হলেও মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই এলাকায় চারকলের (কালো লাকড়ি) কারখানাও  যুক্ত হয়েছে। তবে সেই চারকলের কারখানাগুলো পরিবেশ আইন অনুযায়ী তৈরী না হওয়ায় বর্তমানে পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শেখঘাটে এলাকায় প্রায় ৫০টির মতো রাইস মিল ও সো’ মিলই রয়েছে। চারকলের কারখানা আছে চল্লিশটির মতো। সব মিলিয়ে বর্তমানে এই এলাকায় প্রায় শতাধিক মিল প্রতিদিন একযোগে পরিচালিত হচ্ছে।  তবে, চারকল   তৈরীর প্রধান উপকরণ ধানের গুড়া হওয়ায় স্থানীয় অধিকাংশ রাইস মিলের ব্যবসায়ী চারকলের কারখানা তৈরীতে অতি উৎসাহী হয়ে উঠেছেন। কারণ, ধান থেকে উচ্ছিষ্ট চাচগুলো এক সময় নদীতেই ভাসিয়ে দেয়া ছাড়া তাদের কোনো উপায় ছিলো না। কিন্তু এখন সেই চাচ দিয়ে ব্যবসার নতুন পথ তেরী হওয়ায় মানুষের আগ্রহটাও বেড়ে চলেছে।  অধিকাংশ ধানের ব্যবসায়ী বর্তমানে চারকলের ব্যবসাকেও বেশী গুরুত্ব দিচ্ছেন। সাধারণত ধানের চাচকে আগুনে পুড়িয়ে সেই লাকড়ি তৈরী করা হয়ে থাকে। জ্বালানী কাজে লাকড়িটি বিশেষ অবদান রাখলেও যথাযথ ভাবে কারখানাগুলো গড়ে না উঠায় বর্তমানে শেখঘাট এলাকাকে বিষিয়ে তুলেছে এই কারখানার কালো ধোঁয়া। ধোঁয়ার সাথে ধানের উড়ন্ত ধুলি পুরো এলাকা বিবর্ণ করে তুলেছে। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই কারখানাগুলোর ধোঁয়া এবং ধুলি বৃহত্তর শেখঘাট এলাকার চেহারা পাল্টে দিয়েছে।

পরিবেশ আইন অনুযায়ী, কারখানার চিমনি চল্লিশ ফুট উচু করে তৈরী করার কথা। কিন্তু, কেউ দশ ফুট উচু অথবা কেউ কেউ পনের থেকে বিশ ফুট উচু করে  নিজেদের ইচ্ছেমতো তৈরী করেছেন চিমনি। যে কারণে যত্রতত্র নির্মিত চিমনির কালো ধোঁয়া ও ধানের ধুলি বাতাসের সঙ্গে উড়ে সারাক্ষণ রাস্তাঘাট মাড়িয়ে আশপাশ এলাকার বাসাবাড়ির উপর এসে পড়ছে।

স্থানীয় রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী বাবুল মিয়া এ প্রতিবেদককে জানান, কারখানাগুলোর কাজ চলা অবস্থায় আশপাশ সড়কের উপর সারাক্ষণ ধুলোবালি উড়তে থাকে। তখন চলাফেরা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এলাকার অধিকাংশ  বাসা-বাড়ির ধোঁয়ার কালো আস্তরণ পড়েছে। কাপড় চোপড়ও পরিচ্ছন্ন রাখা যায় না। তিনি বলেন, দিনের বেলা ধোঁয়া কিছুটা কম উড়লেও রাতের বেলা মনে হয় যেন সর্বত্র কুয়াশা বিরাজ করছে। এ কারণে তিনি নিজেও শ্বাসকষ্টে ভুগছেন বলে জানান বাবুল। তিনি জানান, এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে সিটি মেয়র, জেলা প্রশাসক ও সরকারের পরিবেশ বিষয়ক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এ বিষয়ে লিখিতভাবে অভিযোগ করা হয়েছে।   নদীতীরের আশপাশ এলাকা সারাক্ষণ ধুলিময় থাকায় বিকেলে অথবা কোনো অবসর সময়ে ওইসব কারখানার আশপাশ এলাকার নদীর পাড়ে বসে সুন্দর কোনো সময় কাঠানোর ফুসরত এখন আর শেখঘাট বাসীর কপালে জুটে না বলে জানান তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শেখঘাট এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, যত্রতত্র স্থাপিত কারখানা পুরো এলাকার ঐতিহ্য নষ্ট করে দিয়েছে। তারা বলেন, কারখানার উড়ন্ত ধুলোবালির কারণে অনেককেই নানা রোগ ব্যাধিতে ভুগতে হচ্ছে। এসব কারখানায় একসময় কাজ করতেন, এমন অনেক শ্রমিক বর্তমানে বিভিন্ন জটিল নোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী রয়েছেন। তারা আরো জানান, কাখানাগুলোর চিমনিগুলো খাটো হওয়ায় খুব সহজে ধোঁয়া রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে। শেখঘাট রাইস মিলের সেক্রেটারী মঞ্জুর আহমদের সাথে কথা হলে তিনি জানান, কারখানা অথবা চিমনী তৈরীতে নির্দিষ্ট নীতিমালা থাকলেও পরিবেশ অধিদপ্তর বিষয়টিকে গুরুত্ব  দিচ্ছে না অথবা কারখানার মালিকদের সচেতন করতে তারা কোনো ভুমিকা পালন করছে না।

মেসার্স ফাইয়ান অটো রাইস মিল ও মেসার্স ফাইয়ান চারকল মিলের পরিচালক হাজী মো. ইয়াছিন  কালো ধোঁয়া এবং ধুলি জনস্বাাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকরের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, চল্লিশ ফুটের উপরে প্রতিটি চিমনি তৈরী করা হলে পরিবেশ এবং আশপাশ এলাকার বাসিন্দাদের অতটা ক্ষতির কারণ হতো না। কিন্তু অধিকাংশ চিমনি ১০ থেকে ১৫ফুট থাকায় সমস্যাটা বেশী হচ্ছে। সেই সমস্যার কবলে তিনি নিজেও পড়ছেন বলে জানান।

যোগাযোগ করা হলে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সদ্য অবসরে যাওয়া উপ-পরিচালক ডা: তন্ময় ভট্টাচার্য বলেন, শ্বাস কষ্টজনিত রোগে ভুগে ওই এলাকার অনেক রোগী প্রায়শ তার কাছে আসেন। তিনি বলেন, শেখঘাটের মিল কারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টের পাশাপাশি ফুসফুসের প্রদাহ(ব্রংকাইটিস), অ্যাজমা এবং শিশুদের নিউমোনিয়াসহ নানা জটিল রোগ দেখা দিতে পারে। তিনি বলেন, এসব মিল কারখানা ঘেঁষেই রয়েছে কুষ্ঠ হাসপাতাল, মূক বধির স্কুল, শেখঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। হাসপাতালের রোগীসহ বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিশুদের ক্ষেত্রেও এ ঝুঁকির বিষয়টি এড়িয়ে দেয়া যায় না।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক ছালাহ উদ্দিন চৌধুরী জানান, শেখঘাট এলাকার এসব মিলকারখানা অনেক পুরনো। এ কারণে এগুলোর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। তবে, এগুলোর কোন  লাইসেন্স নেই বলে তিনি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, এগুলোর বিষয়ে তাদের কাছে প্রায়শ অভিযোগ আসে। এগুলোর বিরুদ্ধে কি ধরণের পদক্ষেপ নেয়া যায়-সে বিষয়ে তারা পদক্ষেপ নিচ্ছেন বলে জানান তিনি। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ক্ষেত্রভেদে চারকলের চিমনি ৪০ ফুট থেকে শুরু করে আরো উচু হওয়ার কথা।

শেয়ার করুন