অসূয়ামুক্ত পৃথিবীর পথে

photoমোঃ মাহমুদুর রহমান
বছরের শেষ মাস ডিসেম্বর অতিক্রম করছি আমরা। আমাদের দেশের জন্মের ইতিহাসের সাথে আনন্দ ও বেদনার স্মৃতি বিজড়িত এই মাস। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বিজয় আনন্দের দিন ১৬ই ডিসেম্বর যেমন এই মাসে, তেমনি আমাদের বুদ্ধিজীবিদের কাপুরুষের মত হত্যার ন্যাক্কারজনক দিন ১৪ই ডিসেম্বরও এ মাসে। ২৫শে মার্চের কালো রাতে গণহত্যার মাধ্যমে পাক হানাদাররা বাংলার মানুষের উপর যে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল তা বীর বাঙ্গালীরা জীবন উৎসর্গের মাধ্যমে সাহসিকতার সাথে মোকাবেলা করে চুড়ান্ত বিজয় নিয়ে এসেছিল এ মাসে। বীর মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে দীর্ঘ নয় মাসের কষ্টের স্মৃতি ভুলে আনন্দে মেতে উঠেছিলেন। যদিও এই আনন্দ উৎসবের পর ফিরে যাওয়ার জন্য যুদ্ধের শুরুতে রেখে যাওয়া ঠিকানাও তাদের সবার অক্ষত ছিল না। অনেকের বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল, পরিবারের অনেকেই গনহত্যা কিংবা ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। তবুও তাদের চোখে ছিল স্বপ্ন। তাদের কানে ভাসছিল ১০ ই এপ্রিলের স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রের বজ্র কঠিন বক্তব্য- “বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করণার্থে, সার্বভৌম গনপ্রজাতন্ত্ররূপে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করিলাম“। অধ্যাপক ইউসুফ আলী স্বাক্ষরিত স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রটি বার বার পড়তে ইচ্ছে করে। এত সুন্দর ভাষায় এক অপূর্ব বাংলাদেশের ছবি এই ঘোষণায় লুকায়িত ছিল। বিশেষ করে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করার প্রত্যয়- পৃথিবীর যেকোন শান্তিকামী, মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও বৈষম্যহীন সমাজের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ সভ্য মানুষের সম্মান, সহানুভুতি ও সহযোগিতা আকর্ষণ করতে বাধ্য। হয়েছিলও তাই। শুধু দেশের মানুষ নয়, পৃথিবীর সমস্ত শান্তিকামী মানুষও আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন জানিয়েছিল।
স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর বিজয়ের এই মাসে আমরা যদি জাতি হিসেবে আমাদের লিখিত ঘোষণা নিয়ে বসি এবং কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পেরেছি তা পর্যালোচনা করি তাহলে মুক্তিযুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারী লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চাওয়ার কোন বিকল্প খুঁজে পাব না। ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার‘ নিশ্চিতকরণের স্বপ্ন- স্বপ্নই রয়ে গেছে এখনও। উল্টো আমরা প্রতিহিংসা ও অসহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমনভাবে নিমজ্জিত হচ্ছি যা রীতিমত ভীতিকর। পুরো জাতিকে দু‘ভাগে বিভক্ত করার কাজটি করা হলেও ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার‘ প্রতিষ্ঠায় আমাদের কোন অগ্রগতি নেই। আমরা যে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন করতে সমর্থ হয়েছি তা সামাজিক বৈষম্যকে বাড়িয়ে দিচ্ছে, মানবিক মর্যাদাকে ভুলুন্ঠিত করছে। সর্বোপরি শোষণহীন ও সুষম বন্টনের ভিত্তিতে গঠিত একটি মানবিক সমাজ যেখানে সবাই সমান অধিকার ভোগ করবে- এরকম ধারণাকে অবাস্তব প্রতীয়মান করছে। এ জাতির সম্মিলিত ত্যাগের কথা উল্লেখ করে আবেগঘন বক্তব্যের মাধ্যমে সবাইকে রাজনৈতিক সুবিধা হাসিলের চেষ্টরত দেখলেও তাদের স্বপ্নের সত্যিকার বাংলাদেশ বিনির্মাণে সামান্যতম ত্যাগের নজির চোখে পড়ে না। বর্তমান কুশীলবরা ঘৃণা, প্রতিহিংসা ও সুবিধাবাদিতার সংস্কৃতি উপহার দিলেও একটা সময় আসবে যখন মানুষ মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকার চেতনাকে আঁকড়ে ধরবে। কারণ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার‘ প্রতিষ্ঠার সুমহান আদর্শকে ধারণ করে, যা সময় ও সমাজের ভিন্নতা সত্ত্বেও সমানভাবে সারাবিশ্বে বর্তমানে যেমন গ্রহনীয় তেমনি ভবিষ্যতেও থাকবে। তাই ভবিষ্যতে হয়ত দৃশ্যমান উন্নয়নের সাথে সাথে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার‘ নিশ্চিতকরণের প্রচেষ্ঠাকে উন্নয়ন ও অগ্রগতির মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তখন হয়ত বিজয়ের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের পাশাপাশি বিগত বছরের জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধির সাথে সাথে ব্যাক্তি পর্যায়ে আয়-বৈষম্যকেও বিবেচনা করতে হবে। কোন এনজিও বা বিদেশী মানবাধিকার কোন সংস্থার রিপোর্ট থেকে দেশের মানবাধিকারের অবস্থা জানতে হবে না। ১৬ই ডিসেম্বর আমরাই তা প্রকাশ করব এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মাকে স্বাক্ষী রেখে শহীদ মিনারেই শপথ করব পরবর্তী বছরে মানবাধিকার হরণের ঘটনা শূন্যে নামানোর। পুলিশ বা র‌্যাবের বর্বরতার কোন কাহিনি নিয়ে পত্রিকায় শিরোনাম করার প্রয়োজন হবে না। উল্টো হয়ত এসব বাহিনির মানবিক সাহায্যের কাহিনিগুলোই শিরোনাম হবে। যেমন বর্তমানে জাতিসংঘের অধীনে শান্তিমিশনে আমাদের সেনাবাহিনি ও পুলিশ সদস্যদের মানবিক ভূমিকার প্রশংসা করছে সারাবিশ্ব।
আজকের অনিশ্চয়তা ও সার্বিক অশান্তিতে জর্জরিত বাংলাদেশে গনতন্ত্র, মানবাধিকার ও সামাজিক সুবিচারের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ ভবিষ্যত বাংলাদেশের কথা হয়ত স্বপ্ন মনে হতে পারে। আজকের বাস্তবতায় স্বপ্নই। তবে এই স্বপ্নের বাস্তবায়ন অসম্ভব নয়। বাংলার মানুষ এই স্বপ্ন দেখেছিল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়। এই স্বপ্ন দেখছে এখনও। স্বার্থান্বেষী রাজনীতি ঘৃণামুক্ত-বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে মানুষের এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রধান অন্তরায়। তবে সময়ের প্রবল ¯্রােতে এসব বাঁধা খড়কুটোর মত ভেসে যাবে।
কারণ আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন এদেশে প্রবল ভারত বিরোধী একটি সেন্টিমেন্ট ছিল। অপছন্দের প্রতিপক্ষ কাউকে ‘ভারতীয় দালাল‘ বলে চালিয়ে দিতে পারলেই কেল্লা ফতে। চতুর রাজনীতিকরা এই সুবিধাটুকু নিত। মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে এই হুজুগ আর আগের মত নেই। এখন মানুষ প্রতিবেশী দেশের সাথে সুসম্পর্ক থাকবে এটাই আশা করে। কখনও দ্বি-পাক্ষিক চুক্তি বা লেনদেনে দেশের স্বার্থের ক্ষতি হলে যুক্তিসঙ্গত সমালোচনা করে। শুধু শুধু ‘ভারতীয় দালাল‘ বলে রাজনৈতিক সুবিধা নেয়ার সময় সম্ভবত শেষ হয়ে গেছে। এখন দেশে চলছে পাকিস্তানী দালাল বা রাজাকার বিরোধী প্রচারণার সুবর্ণ সময়। আদর্শিক ভিন্নতার কারণে, ভিন্নমত দমনের জন্য যাকে ইচ্ছা তাকেই ‘রাজাকার‘ ঘোষণা করা হচ্ছে। এমনকি প্রতিষ্ঠিত মুক্তিযোদ্ধাদেরকেও রাজাকার বলা হচ্ছে। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী এবং মুক্তিযুদ্ধের উপ-অধিনায়ক এ.কে খন্দকারও ‘রাজাকার‘ অপবাদ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। এসব অপরিপক্ক আবেগী প্রচারণা সময়ের ব্যবধানে অকার্যকর হতে বাধ্য। হয়ত আরও কয়েক দশকের মধ্যে মানুষের সম্বিত ফিরে আসবে। তখন দেখবে স্বাধীনতার ঘোষণা বাস্তবায়নে অনেক দেরী হয়ে গেছে। আর দেরী করা ঠিক নয়।
আরও কয়েক দশক পর একটা সময় আসবে যখন কোন মুক্তিযোদ্ধা বা রাজাকার জীবিত থাকবেন না। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে বয়সের কারণে সবাইকে চলে যেতে হবে। তবুও থাকবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ এবং আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র। তখন আমাদের ভবিষ্যত রাজনীতিকরা আর এসব নিয়ে তর্ক-বিতর্কের সময় থাকবে না। তারা প্রতিযোগিতা করবে কে কার চেয়ে বেশী মুক্তিযুদ্ধের ঘোষিত চেতনা “সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার“ নিশ্চিত করতে পেরেছেন তা নিয়ে। সমস্ত বিশ্বে তখন আমরা মানবাধিকার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার অনন্য নজির হিসেবে উপস্থাপিত হব। আজকের মত ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে মানবাধিকারের সবক নিয়ে আসতে হবে না, আমরাই তাদেরকে সবক দেব।
ভবিষ্যত সম্পর্কে এই আশাবাদ কোন উচ্চাশা নয়। ব্যক্তিগত পর্যায়ে অনেকেই ক্ষমা, মানবিকতা ও সুবিচারের অনেক নজির রাখছেন। এরকম একটি উজ্জ্বল নাম হচ্ছে রইস উদ্দিন ভুইয়া যাকে বাংলাদেশের পাঠকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন বরেণ্য সাংবাদিক, লেখক ও টিভি ব্যক্তিত্ব শফিক রেহমান। আমেরিকা প্রবাসী বাংলাদেশী রইস ভুঁইয়া নাইন ইলেভেনের পর বর্ণবাদী এক মার্কিন নাগরিকের হামলার শিকার হন। তিনি ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে গেলেও অন্য দুজন তার হাতে নিহত হন। ঐ খুনী মার্ক স্ট্রুম্যানের ফাঁসির দন্ড মওকুফের জন্য রইস উদ্দিন ভুঁইয়া আন্দোলন শুরু করেন। রইসের ক্ষমা ও মার্ককে বাঁচানোর চেষ্টা সবাইকে হতবাক করে দেয়। রইস এজন্য ‘ডড়ৎষফ ডরঃযড়ঁঃ ঐধঃব’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। আজ সমস্ত বিশ্বের চিন্তাশীল মানুষের কাছে রইস উদ্দীন ভুঁইয়া এক অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশের মানুষ ঘৃণার সংস্কৃতি আঁকড়ে ধরবে না রইসকে অনুসরণ করবে তা সময়ই বলে দেবে।
সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের ঘোষনা যখন পঠিত হয় তখন আমার সম-সাময়িকরা যেমন পৃথিবীতে ছিল না, তেমনি হয়ত যখন এই ঘোষণা পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হবে তখনও পৃথিবীতে হয়ত থাকব না। তবে ব্যক্তিগতভাবে সবাই এই নীতিগুলোর চর্চা করতে পারি। এবারের বিজয়ের মাস ডিসেম্বর থেকে আমাদের যাত্রা হোক অসূয়ামুক্ত পৃথিবীর পথে যাতে স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের মাধ্যমে শহীদদের রক্তের বদলা নিতে পারি।
লেখক: ব্যাংকার ও কলাম লেখক

mahmudpukra@gmail.com

শেয়ার করুন