অকালে হারিয়ে গেলেন বাতাস চালিত মোটর সাইকেলের উদ্ভাবক

Bike-1

মনসুর উদ্দিন আহমেদ ইকবাল, হবিগঞ্জ সংবাদদাতা ॥ স্বপ্নপূরণ না হতেই সড়ক দূর্ঘটনায় অকালে হারিয়ে গেলেন বাতাস চালিত মোটর সাইকেলের উদ্ভাবক  হাফেজ মোঃ নুরুজ্জামান। গত ২৩ নভেম্বর অপরাহ্নে ঢাকা-সিলেট মহা-সড়কের আশুগঞ্জ উপজেলার সোনারামপুর কলেজের নিকট প্রাইভেট কার-ট্রাক সংঘর্ষে গুরুতর আহত হওয়ার পর ব্রাহ্মনবাড়িয়া সদর আধুনিক হাসপাতালে নেয়ার পথে তিনি মারা যান। শায়েস্তাগঞ্জ থেকে প্রাইভেট কার যোগে ঢাকা যাওয়ার পথে তিনি এই দুর্ঘটনায় পড়েন। পরদিন তার নিজ গ্রাম রিচি ঈদগাহ মাঠে নামাজে জানাযার পর তাকে স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

সমাজের বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিবর্গ তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য এডভোকেট মোঃ আবু জাহির এই তরুণ উদ্ভাবকের মৃত্যুতে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বলে শোক বার্তায় উল্লেখ করেন। হবিগঞ্জ সদর উপজেলার রিচি গ্রামের কৃষক মোঃ সৈয়দ আলী ও মোছাম্মত রোকেয়া বেগমের ৬ সন্তানের মধ্যে সবার ছোট ২২ বছরের তরুণ উদ্ভাবক হাফেজ মোঃ নুরুজ্জামান।

কিশোর বয়সে তিনি নবীগঞ্জ উপজেলার ফুলতলী মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখান থেকে দাখিল পাস করা ছাড়াও হবিগঞ্জ শহরের শায়েস্তানগর গাউছিয়া একাডেমি থেকে কোরআনে হাফেজ হন। ছোটবেলা থেকেই আবিষ্কারের নেশায় পায় এই উদ্ভাবককে। মাদ্রাসায় অধ্যয়নকালে তিনি ছোটখাটো যান্ত্রিক খেলনা তৈরিতে সক্ষম হন। তার উদ্ভাবনী শক্তি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে বিমোহিত করে। মাদ্রাসা সুপার মাওলানা শেখ ফরহাদ সাদ উদ্দিনের সহযোগিতায় পরে তিনি চট্টগ্রামে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন।

Bike-2সেখানে অধ্যয়নকালে ২০১১ সাল থেকে বাতাস চালিত মোটর সাইকেল তৈরির কাজ শুরু করেন। টানা ২ বছর সাধনার পর তিনি এটি তৈরিতে সক্ষম হন। মোটর সাইকেলটি চালাতে কোন ধরনের জ্বালানি তেল, গ্যাস বা ব্যাটারির প্রয়োজন নেই। এ মোটর সাইকেল চালানোর জন্য প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ধরা হয় মাত্র ৯১ পয়সা। অথচ বর্তমান প্রযুক্তিতে বাজারে চালু মোটর সাইকেলের ব্যয় হয় ২ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৩ টাকা।

গত ১০ মার্চ হবিগঞ্জ টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ মাঠে নুরুজ্জামানের তৈরি বাতাস চালিত মোটর সাইকেলের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। প্রদর্শনীতে উপস্থিত সাংবাদিক, শিক্ষকসহ বিশিষ্টজন তার উদ্ভাবনী শক্তি দেখে বিস্মিত হন। মোটর সাইকেলটির ডিজাইন তিনি নিজেই তৈরি করেন। কাঠ, লোহা, এলোমনিয়াম শিট ইত্যাদি ব্যবহার করে মোটর সাইকেলটি তৈরি করা হয়েছে।

গত সেপ্টেম্বর মাসে এই প্রতিনিধির সাথে একান্ত স্বাক্ষাতকারে নুরুজ্জামান জানিয়েছিলেন মোটর সাইকেলের ইঞ্জিনে এমন কিছু বিশেষত্ব রয়েছে যা ইতিপূর্বে ব্যবহৃত হয়নি। উচ্চতর প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই যানটিকে বাজারে চালু মোটর সাইকেলের চেয়েও দ্রুতগামী হিসেবে তৈরি করা সম্ভব। এই প্রযুক্তি শুধু মোটর সাইকেলের জন্য প্রযোজ্য নয় বরঞ্চ অন্যান্য যান-বাহনেও ব্যবহার যোগ্য বলে নুরুজ্জামান দাবি করেছিলেন। ইতিমধ্যে অনেক কোম্পানী বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মোটর সাইকেলটি উৎপাদনের ব্যাপারে আগ্রহ ব্যক্ত করেছিল। কিন্তু গবেষনার কোন সুযোগ-সুবিধা না থাকায় তিনি এ প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করেননি। এমনকি বিদেশে যাওয়ার প্রস্তাবও ছিল। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা ভাল কোন দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তার গবেষনা লব্ধ বাতাস চালিত মোটর সাইকেল উৎপাদন করে স্বল্পমূল্যে এদেশের মানুষের কল্যাণে বাজারজাত করতে আগ্রহ ব্যক্ত করেছিলেন অকালে হারিয়ে যাওয়া এই উদ্ভাবক।

হাফেজ নুরুজ্জামানের অকাল মৃত্যুতে তার উদ্ভাবিত বাতাস চালিত মোটরসাইকেল প্রযুক্তির সুফল দেশবাসী ভোগ করতে পারবে কিনা তা নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।

শেয়ার করুন