৩৬ দফা ঘোষণার মধ্য দিয়ে পর্দা নামলো সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের

pmসকাল ডেস্ক : সার্কভুক্ত দেশগুলোর মাঝে বিদ্যুৎ চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার মধ্য দিয়ে পর্দা নামলো অষ্টাদশ সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের। ৩৬ দফা কাঠমান্ডু ঘোষণার মধ্য দিয়ে সম্মেলনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন নব নির্বাচিত সার্কের চেয়ারম্যান ও নেপালের প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালা।

অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে চলতে চলতে অবশেষে সম্মেলনের শেষ দিন বৃহস্পতিবার বিকেলে সমাপনী অধিবেশনে সার্ক নেতারা এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এর ফলে সার্কভুক্ত দেশগুলোতে অবিচ্ছিন্ন বিদ্যু‍ৎ বাজার গড়ে তোলার প্রেক্ষাপট তৈরি হলো।

এর আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সচিবদের বৈঠকে চুক্তিটির বিষয়ে সব সদস্য দেশ একমত হতে পারেনি। ফলে সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের প্রথম দিন চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি অনুষ্ঠান সূচিতে থাকলেও সেটা ছাড়াই অনুষ্ঠান ম‍ুলতবি করা হয়।

এদিকে সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের শেষ দিন বৃহস্পতিবার সকালে নেপালের অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র দোয়ারিকাস পরিদর্শনে যান নেতারা। তবে অসুস্থতার কারণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখানে অংশ নেননি। অবকাশ কর্মসূচির এই অনুষ্ঠানের আলোচনাতেই সার্কের নেতারা চুক্তিটি সই করতে সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নেন। এসময় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী এবং পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হক।

এদিকে ১৮তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে নিজ বক্তব্যে সার্ক দেশগুলোর রোগী ও তাঁদের সঙ্গীদের অবিলম্বে ভারতীয় ভিসা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সার্ক দেশগুলোর রোগী ও তাঁদের সঙ্গীদের অবিলম্বে ভারতীয় ভিসা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

অপরদিকে গতকাল বুধবার বিকেলে কাঠমন্ডুর হোটেল সলটিতে বৈঠকে মিলিত হন বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী। এসময় নরেন্দ্র মোদি শেখ হাসিনাকে জানান, তিস্তা চুক্তি ও স্থলসীমানা চুক্তি বাস্তবায়নের জোর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। বৈঠক শেষে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব শহিদুল হক সাংবাদিকদের বিষয়টি অবহিত করে বলেন, ল্যান্ড বাউন্ডারি ও তিস্তা চুক্তির বিষয়ে কি অগ্রগতি হয়েছে তা ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জবাবে মোদি বলেছেন- এটা তাড়াতাড়ি সমাধানের জন্য তিনি জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। এ বিষয়ে একটা কনসেনসাস গড়ে উঠছে বলে জানান মোদি। শিগগিরই সুরাহা হবে বলে ‍আশাবাদী তিনি। দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এ অঞ্চলের সন্ত্রাস দমনে দুই নেতা একসঙ্গে কাজ করার বিষয়েও ঐকমত্য পোষণ করেছেন।

সমাপনী অনুষ্ঠান

একইদিন বিকেলে বুধবার বিকালে ক্রাউন প্লাজা কাঠমান্ডুর সোয়ালটিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠকের পর পাকিস্তানের সরকার প্রধানের সঙ্গেও নানা বিষয়ে আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী সাংবাদিকদের বলেন, সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে আমাদের সাফল্যের প্রশংসা করেছেন নওয়াজ শরিফ। সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে পাকিস্তানও সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা সাফল্য অর্জন করেছে বলে নওয়াজ তুলে ধরেছেন।

বৈঠকে শেখ হাসিনা ও নওয়াজ দু’দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের অভিজ্ঞতা বিনিময়কালে সৌর বিদ্যুতে বাংলাদেশের অর্জিত সাফল্যের বিষয়টি শেখ হাসিনা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন। সৌর বিদ্যুতে বাংলাদেশের সাফল্যের অভিজ্ঞতা অর্জনে নওয়াজ পাকিস্তান থেকে একটি প্রতিনিধিদল পাঠানোর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন বলেও জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

এর আগে ক্রাউন প্লাজা কাঠমান্ডু- সোয়ালটিতে সম্মেলনের স্বাগতিক দেশ নেপালের প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালার সঙ্গে বৈঠক করেন শেখ হাসিনা। ওই বৈঠকে দু’দেশের আন্তঃযোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং সার্ক দেশগুলোর যৌথ প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে সমষ্টিগত সমৃদ্ধির প্রত্যয় ব্যক্ত করেন দুই নেতা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নেপালের বিপুল জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন। এছাড়াও বাংলাদেশ থেকে ওষুধ, তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, সিরামিক, সবজি এবং কৃষিজাত পণ্য নেপালে রপ্তানির আগ্রহও প্রকাশ করেন তিনি।

একই দিন আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গানির সঙ্গেও বৈঠক করেন শেখ হাসিনা। বৈঠকে আন্তঃযোগোযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং আঞ্চলিক ও সামষ্টিক সমৃদ্ধি অর্জনের সম্ভাবনার কথা আলোচিত হয়েছে বলে জানান মাহমুদ আলী। দারিদ্র্য দূরীকরণে বাংলাদেশের অর্জিত সাফল্যের প্রশংসাও করেন আশরাফ গানি।

অপরদিকে বুধবার সকালে ১৮তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বুধবার সকালে দেওয়া ভাষণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সড়ক, রেল ও আকাশপথে যোগাযোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি জ্ঞান-বিজ্ঞান, তথ্য-প্রযুক্তি, সাংস্কৃতিক পরিসর বাড়ানোর তাগিদ দেন।

তিনি বলেন, ‘কানেকটিভিটি’ কে বাংলাদেশ বিস্তৃত পরিসরে চিন্তা করে। আমরা পারস্পরিক আইডিয়া, জ্ঞান, প্রযুক্তি, সাংস্কৃতিক কানেকটিভিটি, জনগণের সঙ্গে জনগণের সংযুক্তি, সড়ক-রেল-আকাশ পথে কানেকটিভিটি, পণ্য পরিবহন, সেবা ও বিনিয়োগের কানেকটিভিটিতে বিশ্বাস করি। এ বিষয়ে তিনি সাফটা কার্যকর করার কথা বলেন।

তিনি বলেন, আমরা জ্বালানি চাহিদা মেটাতে জলবিদ্যুৎকে কাজে লাগাতে পারি। ভবিষ্যতে আমরা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে একসঙ্গে কাজ করে লাভবান হতে চাই।

দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের সমৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ, এমন মত দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সার্ক কাঠামোর মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতা প্রশংসনীয়।

সার্ক দেশগুলোর মানুষের দারিদ্র্য দূর করতে ‘সার্ক ফুড ব্যাংক’ ও ‘সার্ক সিড ব্যাংক’ কে কার্যকর করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, মানুষের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও দারিদ্র্য নির্মূলে প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদন, অভ্যন্তরীণ মৎস ও প্রাণিজ সম্পদ উৎপাদন, কৃষিতে পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, গত ২১ নভেম্বর কাঠমান্ডুতে ১৮তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য নিবিড় সংহতি’ এই প্রতিপাদ্যে শুরু হয় দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সংস্থার এ সম্মেলন। সার্কের আট নেতার উপস্থিতিতে বিদায়ী চেয়ারম্যান মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিন আবদুল গাইয়ুম সম্মেলন উদ্বোধন করেন। সার্ক রীতি অনুযায়ী দায়িত্ব নেন স্বাগতিক দেশ নেপালের প্রধান মন্ত্রী সুশীল কৈরালা।

প্রসঙ্গত, দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) ১৯তম শীর্ষ সম্মেলন হবে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে। নেপালে অনুষ্ঠেয় ১৮তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ।

৩৬ দফা কাঠমান্ডু ঘোষণা

কাঠমাণ্ডু ঘোষণায় দক্ষিণ এশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অবাধ বাণিজ্য চালু, সার্ক উন্নয়ন তহবিল, যোগাযোগ, জ্বালানি, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ, সাগর অর্থনীতি, ২০১৫ সাল-পরবর্তী উন্নয়ন এজেন্ডা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অভিবাসন, পর্যটন, সন্ত্রাসবাদ, সুশাসন ও সার্ক সচিবালয়সহ সার্কের প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করার মতো বিষয়গুলো এসেছে।

ঘোষণায় দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে সার্ক নেতারা নিজেদের সহযোগিতা জোরদারে অঙ্গীকার করেন। এ লক্ষ্যে তারা সহযোগিতা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, নিরাপত্তা, অবকাঠামো ও যোগাযোগ খাতের বিভিন্ন প্রকল্প অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এবং নির্দিষ্ট সময়ে শেষ হবে- ফলাফলভিত্তিক এমন প্রকল্প, কর্মসূচি ও কার্যক্রম নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

কাঠমান্ডু ঘোষণায় ইতিপূর্বে সই হওয়া চুক্তি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সার্ক সচিবালয়ের ক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

এছাড়া প্রতিবছর সার্কের কার্যক্রম ও অগ্রগতি সম্পর্কিত প্রতিবেদন প্রকাশের বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তও স্থান পায় ৩৬ দফা কাঠমন্ডু ঘোষণায়।

শেয়ার করুন