পলো বাওয়া উৎসব : ঝাপ দিলে মাছ আসে

এমদাদুর রহমান মিলাদ, বিশ্বনাথ : আধুনিকতার স্রোতে ভেসে যাচ্ছে চিরায়ত বাংলার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিগুলো। মানুষ হচ্ছে শহরমুখী, যান্ত্রিকতায় হারিয়ে যাচ্ছে অতীত, পেছনে পড়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী এই ইতিহাস। দেশজুড়ে এমন আলোচনা যখন চলছে তখন গ্রাম-বাংলায় অসংখ্য মানুষ ও সমাজ পুরনো ঐতিহ্যের সাথে শহরবাসীকেও পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে নানান ভাবে।
বিশ্বনাথের পল্লীতে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য উদযাপিত হয়েছে বার্ষিক ‘পলো বাওয়া উৎসব’। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও বার্ষিক এই ‘পলো বাওয়া উৎসব’। গত বুধবার উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের গোয়াহরি গ্রামের দক্ষিণের (বড়) বিলে অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশগ্রহণ করেন মসজিদের ইমাম, মাদ্রাসার শিক্ষক, কৃষক, সৌখিন প্রবাসীসহ এলাকার বিভিন্ন পেশার কয়েক শতাধিক মানুষ। এবছর মাছের সংখ্যা বেশী হওয়ায় খালি হাতে ফিরেননি কেউ। শিকারকৃত মাছের মধ্যে বোয়াল, শউল, রুই, কাতলাসহ বিভিন্ন জাতের মাছ বেশী ছিল।
এদিকে, গোয়াহরি গ্রামের ঐতিহ্যবাহী এই বার্ষিক ‘পলো বাওয়া উৎসব’ কে কেন্দ্র করে উৎসবে অংশ নিতে গ্রামের অনেক প্রবাসী দেশে এসেছেন। জানা যায়, এলাকার লোকজন প্রায় আড়াই থেকে তিনশত বছর ধরে গোয়াহরি বিলে “পলো বাওয়া উৎসব” পালন করে আসছেন। শীত মৌসুমে এলাাকাবাসী একত্রিত হয়ে বিলে মাছ শিকার করেন। প্রতি বছর বাংলা মাঘ মাসের ১তারিখে এ উৎসব পালিত হয়ে আসলেও শীতের কারণে এবছর এ উৎসব পালিত হয়েছে নির্ধারিত তারিখের কিছু দিন পর। পলো বাওয়াকে কেন্দ্র করে গোয়াহরি গ্রামে গত কয়েকদিন ধরে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছিল।
পলো বাওয়া এই উৎসবে অংশ নিতে গত বুধবার সকাল ৮টা থেকে গোয়াহরি গ্রামের সৌখিন মানুষ দল বেঁধে মাছ ধরার সরঞ্জাম নিয়ে বিলের পাড়ে জমায়েত হতে থাকেন। বেলা বাড়ার সাথে সাথে বিলের পাড়ে লোকসমাগম বাড়তে থাকে। সকাল ১১টায় সবাই এক সাথে বিলে নামেন। শুরু হয় ঝপ্ ঝপ্ শব্দে পলো বাওয়া। বেলা ১টা পর্যন্ত পায় ২ঘন্টাব্যাপী এ পলো বাওয়া উৎসবে গোয়াহরি গ্রামের সব বয়সী পুরুষ অংশ নেন। এ দৃশ্য উপভোগ করতে বিলের পারে শিশু, বৃদ্ধ সবাই হাজির হন।
সরেজমিন গোয়াহরি বিলে গিয়ে দেখা যায়, যারা উৎসবে অংশ নিচ্ছেন তারা যার যার পলো নিয়ে বিলের পাড়ে অপেক্ষা করছেন। পূর্ব ঘোষিত সময় অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে গ্রামের একজন প্রবীণ মুরব্বি চিৎকার করে হাঁক ডাকেন এবং সাথে সাথে মুহুর্তের মধ্যে মাছ শিকার করতে নিজ নিজ পলো নিয়ে বিলের পানিতে ঝাপিয়ে পড়েন লোকজন। এসময় মাছ ধরার এ দৃশ্যটি উপভোগ করতে বিলের পারে ছোট ছোট শিশু থেকে বৃদ্ধ বয়সের লোকজন, দূর থেকে আসা অনেকের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
ঐতিহ্যবাহি এ “পলো বাওয়া উৎসব দেখতে উপজেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা উৎসুক জনতা জানান, আমরা পলো বাওয়া উৎসব দেখতে এসেছি। আমাদের খুব ভাল লাগে পলো বাওয়া দেখতে। আমাদের কাছে পলো বাওয়া উৎসব খুব মজার বিষয়। শত ব্যস্ততার মধ্যেও তারা এ উৎসব দেখতে আসেন। গ্রামবাসী কয়েক যুগ ধরে এই উৎসব পালন করে আসছেন। তারা গোয়াহরি গ্রামবাসির জন্য কৃতজ্ঞতা জানান এবং উৎসব ধরে রাখার আহবান জানান।
গোয়াহরি গ্রামের ইকবাল হোসেন জানান, বিল সংস্কার করা হয়েছে। ফলে এবছর সবাই মাছ শিকার করতে পেরেছেন। কেউ খালি হাতে ফিরেনি। স্থানীয় ইউ/পি সদস্য গোলাম হোসেন বলেন, এটি আমাদের পুরনো ঐতিহ্য। আমরা প্রতিবছর উৎসবের মাধ্যমে পলো দিয়ে মাছ শিকার করি। এতে আলাদা আনন্দ পাওয়া যায়। মাছ শিকার করতে আসা অনেকেই জানান, তাদের কাছে পলো বাওয়া উৎসব খুব মজার বিষয়। শত ব্যস্ততার মধ্যেও তারা এ উৎসবে অংশ নিয়েছেন। গোয়াহরি গ্রামের মাওলানা ইউনুছ আহমদ বলেন, আমি একটি মাদ্রাসার শিক্ষক ও একটি মসজিদের খতিব। এই মাছ ধরায় অংশ নিতে পেরেছি তাই আমার খুব আনন্দ লাগছে। তবে গত বছরের চেয়ে এবার আমি কম মাছ শিকার করতে পেরেছি।

শেয়ার করুন