দেশে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা নেপথ্য কারিগর আবুল কাশেম মোঃ শিরীন

এইচ.চৌধূরী||
আবুল কাশেম মোঃ শিরীন যোগদান ১৯৯০ সালের জানুয়ারীতে বৃটিশ সরকারের বৃত্তি নিয়ে ব্যাংককস্থ এশিয়ান ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি (AIT) তে মাস্টার্স অব ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে যান। অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তিনি AIT থেকে ডিগ্রি অর্জন করে ৬ মাস সেখানে রিসার্চ এসোসিয়েট হিসেবে কাজ করেছেন।  অতঃপর তিনি ১৯৯২ সালের মার্চ মাসে দেশে ফিরে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের মতিঝিলস্থ প্রধান কার্যালয়ের কম্পিউটার বিভাগে কম্পিউটার প্রোগ্রামার হিসেবে যোগ দেন। এখানে যোগদান করার পরই কর্পোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভীত হয়ে পড়লেন-এবার বুঝি কম্পিউটার সবার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করবে । কিন্তু এসব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ৩ মাস পর যখন তিনি সবার হাতে ঠিক মাসের ২৫ তারিখেই একটি তথ্যবহুল পে-স্লিপ ধরিয়ে দিলেন তখন তারা অবাক হয়ে গেলেন।  ১৮ জন কর্মকর্তা সারা মাসে যে বেতনের বিবরণী তৈরী করতেন জনাব শিরীনের তৈরীকৃত পে-রোল প্রোগ্রামের বদৌলতে সেই বেতন বিবরণী কয়েক ঘন্টায় তৈরী হয়ে গেল। কিন্তু বিপত্তি ঘটলো অন্যত্র। ১৮ জন কর্মকর্তার বেশ কয়েক জনকে বদলী করে দেয়া হলো অন্য বিভাগে। এতে অন্যান্য বিভাগের কর্মকর্তারা ভয় পেয়ে গেলেন। ঐ সময়ে তিনি প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং একাউন্টিং সফ্টওয়ার তৈরীর কাজ করছিলেন। এখানে তিনি সহযোগিতা না পেলেও MIS বিভাগের প্রধান জনাব  হাবিবুর রহমানের কাছ থেকে জ্ঞান নিয়ে একাউন্টিং প্রোগ্রাম লেখার কাজ চালিয়ে যান।
প্রায় ১ বছর পরিশ্রমের পর এ দুটি বিভাগের সমুদয় কাজ কম্পিউটারের আওতায় নিয়ে আসেন। ফলে ঐ দুই বিভাগের প্রায় অর্ধেক জনবল অন্য কাজে লাগানো সম্ভব হয়। তাছাড়া, দ্রুত ও নির্ভূল হিসাব নিকাশে তার লেখা প্রোগ্রাম সমূহ যথেষ্ট ভূমিকা পালন করতে থাকে। অতঃপর তিনি হিউম্যান রিসোর্সেস  এডমিন  বিভাগের কম্পিউটারাজেশনের কাজ শুরু করেন। এখানেও প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। তাই বেসিক ব্যাংকে আই.টি.হেড হিসেবে তিনি চাকুরী পাওয়ার পর কর্পোরেশনের চাকুরীতে ইস্তফা দেন ।
পরিবর্তন শুরু যেখান থেকে : ৯৪ সালের অক্টোবর মাসে বেসিক ব্যাংককে যোগদান করার পর তিনি ব্যাংকের আই.টি বিভাগে একা। তাকে কম্পিউটার মেরামত, নেটওয়ার্ক  স্থাপন, প্রোগাম লেখা, দাপ্তরীক কাজ কর্ম ছাড়ও ব্যাংকের সকল শাখায় দৌড়াদৌড়ি করে টেকনিক্যাল সাপোর্ট দিতে হতো। কাজ করতে করতে তার মনে হতো, কেন গ্রাহকদের শুধুমাত্র নির্দিষ্ট একটি শাখায় সকাল ৯টা থেকে ১টার মধ্যেই ব্যাংকিং কার্যক্রমের জন্য আসতে হবে? কেন গ্রাহকগণ ব্যাংকের যে কোন শাখায় লেনদেন করতে পারবে না? কেনই বা তাদেরকেক সশরীরে শাখায় যেতে হবে? কেনইবা ঘরে বসেই লেনদেন করা যাবে না? কেন দিনে ২৪ ঘন্টা, বছরের ৩৬৫ দিনই টাকা উঠানো বা জমা দেওয়া যাবে না? এসব প্রশ্নের জবাব তার জানা নেই। তিনি এ বিষয়ে বিশ্বের নামীদামী ব্যাংকসমূহ কি করছে তা জানতে শুরু করেন। দেখলেন বিদেশে চালু থাকা আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা এদেশের অবকাঠামো ও ব্যাংকিং নিয়মকানুনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই এদেশের উপযোগী একটি যুৎসই আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা ডিজাইন করে তিনি তার ব্যাংকের ব্যবস্থাপনার কাছে তা পেশ করেন। ব্যাংক ব্যবস্থাপনা তা গ্রহণ করে বৈদেশিক দরপত্রের মাধ্যমে প্রজেক্টটি বাস্তবায়ন করার জন্য তাকে দায়িত্ব দেয়। তিনি প্রায় ১ বছর রাতদিন নিরলস চেষ্টা করে বৈদেশিক দরপত্রের মাধ্যমে বেশ কয়েকটি বিদেশী কোম্পানীকে মনোনীত করে তা অনুমোদনের জন্য বোর্ডের উপস্থাপন করেন। কিন্তু বোর্ড ধরে নেয় এত বড় একটি প্রজেক্ট জনাব শিরীনের পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। ফলে ব্যাংকের প্রায় ২৫ কোটি টাকার অপচয় হবার সম্ভবনা রয়েছে। তাই বোর্ডে প্রজেক্টটি অনুমোদন দেয়নি।
কিন্তু শিরিন বসে থাকেননি। মনকে শক্ত করে নতুন স্বপ্ন দেখেন। বেসিক ব্যাংকে তার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে না বুঝে তিনি অন্য ব্যাংকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অবশেষে যোগাযোগ করে বুঝতে পারেন যে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকেই তার স্বপ্নের বাস্তবায়ন করতে পারবে। তিনি বেসিক ব্যাংকের চাকুরী ইস্তফা দেন।  ডাচ্ বাংলা ব্যাংকে যোগদানের প্রস্তুতি নেন। এরই মধ্যে তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০১ সালে কৃতিত্বের সাথে কম্পিউটার সায়েন্সে মাস্টার্স অব ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি লাভ করে দু’টি মাস্টার্স অব ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রির অধিকারী হন। ২০০৩ সালের ১ জানুযারি ডাচ্ বাংলা ব্যাংকে এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে যোগদেন।  ডাচ্ বাংলা ব্যাংক (DBBL) এ যোগদানের পূর্বেই বোর্ডের চেয়ারম্যান মোঃ সাহাবুদ্দিন আহমেদ এর সাথে প্রজেক্ট নিয়ে কথা হয়েছিল। তাই ব্যাংকে যোগদানের ৭ দিনের মাথায় তিনি তার প্রজেক্ট সম্পর্কে বোর্ডের কাছে একটি Presentation উপস্থাপন করেন। বোর্ডের ২ জন সদস্য ছিলেন নেদারল্যান্ডের। তারা বেকে বসলেন। বললেন, এই ব্যাংকিং পদ্ধতি নেদারল্যান্ডেই এখনও চালু হয়নি। এদেশে এই প্রজেক্ট ফেল মারবে। বোর্ড মিটিং ভেঙ্গে গেল। চেয়ারম্যান  ২/৩ দিন পর আবার মিটিং ডাকলেন এবং আবার বোর্ডে প্রজেক্টটি উপস্থাপন করতে বললেন। যথারীতি বোর্ডকে জনাব শিরীন বুঝানোর চেষ্টা করলেন, এ প্রজেক্টটি এদেশেই সম্ভব। এদেশে এটিএম এর নিরাপত্তারও অভাব হবে না। তাছাড়া সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধের সকল ব্যবস্থা রয়েছে এই প্রজেক্টে। দেশে প্রাপ্ত টেলিফোন ব্যবস্থা ব্যবহার করেই কম্পিউটার ও এটিএম এর জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করা হবে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় লোড শেডিং এর সময় কম্পিউটার ও এটিএম চালানোর জন্য জেনারেটর ব্যবহার করা হবে।
উপরন্তু, চেয়ারম্যান ঘোষণা করলেন, ২০০২ সালে ব্যাংকের যে ৪৫ কোটি টাকা মুনাফা হয়েছে তা ব্যাংকের মালিকগণ না নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে এ প্রজেক্টে ব্যয় করা হবে। প্রজেক্ট সফল হলো ভাল, না হলে গবেষণায় এ টাকা ব্যয় হয়েছে বলে ধরে নেয়া হবে। অতঃপর বোর্ড প্রজেক্টটি অনুমোদন দিল। শুরু হল প্রজেক্ট বাস্তবায়নের প্রস্তুতি। ডাটা সেন্টার, ডিআরএস, জেনারেটর, ইউপিএস, নেটওয়ার্ক, হার্ডওয়ার সফটওয়ার, ডাটাবেজ, এসি, সিসিটিভি, এটিএম, পিওএস, টার্মিনাল ইত্যাদি ক্রয় ছাড়াও পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত লোকবল নিয়োগ-এ এক হৈ চৈ ব্যাপার। কিন্তু সব কিছু সময় মতন চাই। তিনি যখন DBBL এ যোগদান করেন তখন আইটি (ইনফরমেশন টেকনোলজি বিভাগ) এর জন্য অফিসের জায়গা ছিল মাত্র ২ শ বর্গফুট। তিনি ব্যাংকের ব্যবস্থাপককে বললেন ৮ হাজার বর্গফুট জায়গা লাগবে আইটির জন্য। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অবাক। তারা বললেন সর্বোচ্চ ৫০০ বর্গফুট চাইতে পারেন। তিনি তখন ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে বলে কয়ে ব্যাংকের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের নিয়ে শ্রীলংকা ও  ইন্ডিয়াতে ৭ দিনের একটি ট্যুরের ব্যবস্থা করলেন। টুর শেষে এই কর্তৃপক্ষই বললেন, দিলকুশায় নির্মাণাধীন বিল্ডিং এর ১টি কেন ২টি ফ্লোরই ভাড়া নিন। এ  দু‘টি  ফ্লোরের মোট আয়তন ছিল ১৬ হাজার বগর্ ফুট। সেই দটি ফ্লোর ভাড়া নিয়ে সেখানে ডাটা সেন্টার স্থাপনের পর ২০০৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ব্যাংক থেকে মোট ২২ জন কর্মকর্তা নিয়ে ২ মাসের প্রশিক্ষণের জন্য তিনি ইন্ডিয়ার বাংগালুর ও মুম্বাই যান।
প্রশিক্ষণ শেষে দেশে এসে প্রজেক্টের মূল কাজ পুরোদমে শুরু হয়। তখন ব্যাংকের শাখার সংখ্যা ছিল ১৭ টি ও মোট গ্রাহকের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩০ হাজার। আর এফডিআর এর পরিমাণ ছিল মোট ডিপোজিটের ৮০ ভাগ। অর্থাৎ ডিপোজিটের উপর গ্রাহকদের বড় অংকের সুদ দিতে হতো। তাতে ব্যাংকের খরচ হতো বেশি। আস্তে আস্তে তার নেতৃত্বে ব্যাংকের সব কয়টি শাখাই অন-লাইনের আওতায় চলে আসে। চালু হয় অসংখ্য ATM, দোকানে দেওয়া হয় অসংখ্য POS, টার্মিনাল, প্রত্যেক গ্রাহককে দেওয়া হয় ডেবিট কার্ড, চালু হয় ইন্টারনেট ব্যাংকিং, SMS, ব্যাংকিং, এলার্ট ব্যাংকিং, বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ EMV ক্রেডিট কার্ড, আধুনিক কল সেন্টার (Call Center) ও ই-কমার্স ট্রানজেকশনের জন্য Internet Payment Gateway  (IPG)। ২২ টি ব্যাংক DBBL এর ATM সেবা তাদের গ্রাহকদের দেয়ার জন্য  DBBL এর সালে চুক্তি স্বাক্ষর করে।  অগণিত ছোট বড়, দেশী-বিদেশী কোম্পানীও তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন DBBL এর মাধ্যমে প্রদানের জন্য ব্যাংকের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়।
ফলে ব্যাংকটির সুনাম অতিদ্রুত ছড়াতে থাকে এবং ব্যাংকটি অল্প দিনেই জনগণের একটি প্রিয় ব্যাংকে পরিণত হয়। ২০১২ সালে ব্যাংকটির  শাখা ১২৫, ATM ০০ এর সংখ্যা ২৩০০, POS টার্মিনালের সংখ্যা ৪৫০০, গ্রাহক সংখ্যা  ২৫ লক্ষ, FDR এর পরিমাণ মাত্র ৩৫% (অর্থাৎ লো-কস্ট ডিপোজিটই বেশী) এবং বার্ষিক মুনাফা ৫শ কোটি টাকার উপর। প্রজেক্টটি যেমন নিয়ে এসেছে অফুরন্ত সুফল, তেমনি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এনেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এখন সকল ব্যাংকই অন-লাইন ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু করেছে বা করতে চেষ্টা করছে। এতে যেমন দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তেমনি সাধারণ মানুষ আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সুবিধা পাচ্ছে। বলা বাহুল্য যে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা কোন ভাবেই উন্নত বিশ্বের চেয়ে পিছিয়ে নেই, বরং অনেক দেশের তুলনায় এগিয়ে আছে।
ব্যাংকের সাফল্যের সাথে সাথে শিরীনের চাকুরী জীবনেও সাফল্য এসেছে। তিনি ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারীতে ডেপুটি ম্যানেজিং ডাইরেক্টর (DMD) পদে পদোন্নতি পান। আইটি সেক্টর থেকে বাংলাদেশের ব্যাংকিং জগতে তিনিই প্রথম DMD হন।  অন-লাইন প্রজেক্টের পর শিরীনের মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগলো গ্রামগঞ্জের গরীব মানুষের কথা। কেন ব্যাংকে তাদের কোন একাউন্ট নেই? কেন শষ্য বিক্রির টাকা বা গ্রামের ছোট একটি দোকানে পণ্য বিক্রির টাকা ঘরে রাখতে হবে? কেন দেশের অশিক্ষিত লোকজন চেক না লিখে বা এটিএম ব্যবহার না করে টাকা উঠাতে বা জমা দিতে পারবে না? কেন তারা ২৪ ঘন্টা ব্যাংকিং লেনদেন করতে পারবে না? তিনি বিভিন্ন দেশে প্রচলিত বিভিন্ন ধরণের ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু করলেন। আবিষ্কার করলেন-মোবাইল ব্যাংকিংই হবে এর সঠিক সমাধান। কিন্তু তিনি দেখলেন যে, পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই মোবাইল ব্যাংকিং সফল হচ্ছে না। কেন হচ্চে না তারও একটা ধারণা তিনি সংগ্রহ করলেন। সব মিলিয়ে আমাদের দেশের উপযোগী একটি মোবাইল ব্যাংকিং এর রূপরেখা নির্ণয় করলেন তিনি।
সেই অনুযায়ী ব্যাংকের বোর্ড ও কেন্দ্রিয় ব্যাংকের অনুমতি নিয়ে ২০০৯ সালে শুরু করলেন আরেকটি প্রজেক্ট। রূপরেখা অনুযায়ী সফ্টওয়ার কোম্পানী থেকে নতুন করে সফ্টওয়ারটি তৈরী করতে হবে। তাদের ডেলিভারী অনুযায়ী একটি করে প্রোডাক্ট মার্কেটে ছাড়তে হবে আর সে অনুযায়ী সারা দেশকে তিনটি ভাগে ভাগ করে তিন ধাপে উপজেলা পর্যায়ে অফিস স্থাপন করতে হবে। সেই সাথে লোক নিয়োগ করে প্রশিক্ষণের পর তাদেরকে বিভিন্ন অফিসে পোষ্টিং দিতে হবে। গ্রাহক সংখ্যা দ্রুত বাড়াতে  হবে এবং পাশাপাশি গ্রাহকদের লেনদেনের জন্য যথেষ্ট সংখ্যক এজেন্ট নিয়োগ করতে হবে। তাছাড়া গ্রাহকদের সচেতনতা, নিরাপত্তা ও বিশ্বাস অর্জনের জন্য পত্রিকা, রেডিও ও টেলিভিশনে বিজ্ঞাপনের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশাল কাজ। দক্ষতার সাথে না করলে প্রজেক্ট ফেল। গ্রামের জনগণের বিশ্বাস একবার ভেঙ্গে গেলে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো এখানেও মোবাইল ব্যাংকিং এর অকাল মৃত্যু হবে। কিন্তু তা হলো না।
২০১১ সালের ৩১শে মার্চ সাফল্যের সাথে ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী ৬টি জেলার ৪২টি উপজেলায় DBBL এর মোবাইল ব্যাংকিং চালু হয়। আর ২০১২ সালে ফেব্রুয়ারীতে সারা দেশে তা চালু করা সম্ভব হয়। এই অল্প দিনের মধ্যে ৭ লক্ষ লোক মোবাইল ব্যাংকিং এর জন্য একাউন্ট খুলেছে ১৭ হাজার এজেন্ট হিসেবে যোগ দিয়েছে এবং ১ হাজার কোটি টাকার বেশী লেনদেন হয়েছে (অক্টোবর, ২০১২ পর্যন্ত)। আর বাংলাদেশের এই সুফলের কথা শুনে পাকিস্তান, ইন্ডিয়া, মায়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, লাওস ও ভিয়েতনাম থেকে অনেক ব্যাংক DBBL এর এই মোবাইল ব্যাংকিং এর কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করে গেছে। তাছাড়া ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম, বিল গেটস্ ফাউন্ডেশন, ডিএফআইডি ইত্যাদি সংস্থা ঘনঘন DBBL এর সাথে মিটিং করে যাচ্ছে। এমনই একটি মিটিং এ অংশ গ্রহণ করার জন্য সেপ্টেম্বর ২০১২ তে জনাব শিরীন আমেরিকার ওয়াশিংটনে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের অফিসে গিয়েছিলেন।  DBBL এর মোবাইল ব্যাংকিং এর প্রজেক্টটি নির্ভুলভাবে ব্যাংকের উপযোগী করে তৈরী হয়েছে-তার প্রমাণ হলো DBBL ইতোমধ্যেই এই প্রজেক্টের জন্য ৫টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েয়েছ্ সেগুলো হলো-জাতীয় ডিজিটাল উদ্ভাবনী পুরস্কার, দুবাই থেকে MMT পুরস্কার, ঢাকা থেকে EASIA-2011 -২০১১ পুরস্কার, ব্যাংকক থেকে Asian Banker’s  পুরস্কার ও আমেরিকা থেকে কম্পিউটার ওয়ার্ল্ড লরেট-২০১২। তাছাড়া, মোবাইল ব্যাংকিং এর বিষয়ে বিভিন্ন সেমিনারে বক্তব্য প্রদানের জন্য জনাব শিরীন বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক আমন্ত্রিত হয়ে সিংগাপুর, ব্যাংকক ও আমেরিকার ফ্লোরিডায় যান ও মূল্যবান বক্তব্য রাখেন। তাছাড়া, তিনি বাংলাদেশের জাতীয় TV চ্যানেলে BTV সহ অন্যান্য TV চ্যানেলে নিয়মিত এ বিষয়ে কথা বলে থাকেন।
DBBL এর মোবাইল ব্যাংকিং পদ্ধতিটি বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ব্যাংক হুবুহু চালু করে তারা সুফল পাচ্ছে। ভবিষ্যতে এটিই বিশ্বময় একটি সঠিক মোবাইল ব্যাংকিং মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পাবে-এটিই জনাব শিরীনের বিশ্বাস।
এদেশে শত বছরের গতানুগতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে গত ৮/৯ বছরে। আর এ পরিবর্তনে যে মানুষটির প্রচেষ্টা ও চিন্তাভাবনা কাজ করেছে তিনি হলেন আবুল কাশেম মোঃ শিরীন। জনাব শিরীন কম্পিউটার বিষয়ে দুইটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার একটি প্রকাশিত হয়েছে বাংলা একাডেমী থেকে এবং অন্যটি Institute of Bankers Bangladesh (IBB) (BBA) থেকে ইইঅ সম্পন্ন করে একটি ব্যাংকে MTO হিসেবে যোগদান করেছে এবং ছেলে আশিক মোহায়মীন অর্ণব জানুয়ারী ২০১৩ সালে এ-লেভেল পরীক্ষা দেবে।
আবুল কাশেম মোঃ শিরীনঃ আবুল কাশেম মোঃ শিরীন ১৯৬১ সালে সুনামগঞ্জ শহরের অদূরে অবস্থিত ধাড়ারগাঁও  গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৭৬ সালে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাশ করেন। অতঃপর তিনি ভর্তি হন সিলেট সরকারি এমসি কলেজে। ১৯৭৮ সালে ঐ কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে ঐ বছরই কৃষি প্রকৌশল বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহে ভর্তি হন। তিনি ১৯৮৩ সালে কৃষি প্রকৌশল পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে কৃতিত্বের সাথে স্নাতক কৃষি প্রকৌশল ডিগ্রী অর্জন করেন। ঐ বছরই তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইন্টিফিক অফিসার ও পার্ট টাইম লেকচারার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।#

শেয়ার করুন