শুভ্র সকালের প্রতীক্ষায়

মোঃ মাহমুদুর রহমান :
শিক্ষিত বাঙ্গালী সমাজের বেশীর ভাগ মানুষ সকালের শুরু করেন দুটি জিনিস দিয়ে। একটি হচ্ছে চা অন্যটি দৈনিক পত্রিকা। সকালে চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে পত্রিকায় চোখ বুলাতে সত্যিই খুব ভাল লাগে। এই ভাল লাগায় ছন্দ পতন ঘটে দুটি কারণে। একটি হচ্ছে সময়মত পত্রিকা হাতে না পৌঁছা। পত্রিকার হকার সময়মত পত্রিকা না দিয়ে গেলে দিনের শুরুটা ভাল লাগা দিয়ে শুরু করা যায় না। বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস’ার কারণে হকারদের ইচ্ছা থাকলেও অনেক দুরবর্তী স’ানে সকাল বেলা পত্রিকা পৌঁছানোর কথা এখনো ভাবা যায় না। অবশ্য ঐসব এলাকায় থাকলে সকালে চায়ের সাথে পত্রিকা পড়ার শখও জাগে না। আমার গ্রামের বাড়ীতে এখনও পত্রিকা পৌঁছে বিকেল বেলা। আমার উপজেলা হচ্ছে সম্ভবত বাংলাদেশের মধ্যে জেলা শহর থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী উপজেলা। তবে সিলেট শহরে থেকেও মাঝে মাঝে দেরীতে পত্রিকা পাওয়ার কষ্ট সইতে হয়। এ সম্পর্কে আমার এক করুণ অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমি তখন এম. সি. কলেজ হোস্টেলের তৃতীয় ছাত্রাবাসের আবাসিক ছাত্র। ছাত্রাবাসের মধ্যখানে খালি জায়গায় একটি কাঠের খাট রাখা ছিল,যেখানে বসে সবাই পত্রিকা পড়তাম। কলেজে ক্লাস কিংবা বাইরে কাজ না থাকলে আমাদের কয়েকজনের দিনের বেশীরভাগ সময় কাটত এই খাটে-বসে বসে পত্রিকা পড়ে আর গল্প করে। হকার পত্রিকা দিতে একটু দেরী করলে তাকে দশ জনের দশ কথা শুনতে হত। একদিন সকাল, দুপুর এমনকি বিকেলও গড়িয়ে যাচ্ছে কিন’ হকার পত্রিকা নিয়ে আসছে না। সারাদিন বার বার রুমে যাচ্ছি আর খাটের কাছে আসছি পত্রিকার খোঁজে। পত্রিকা না পেয়ে সবাই ইচ্ছে মত বকা ঝকা করছি হকারকে। অবশেষে অধৈর্য্য হয়ে বিকেল বেলা চিন্তা করলাম এই হকারকে কালই বদলাতে হবে। এমন সময় দেখি হকার পত্রিকা নিয়ে এসেছে। তার চেহারাটা ছিল খুবই মলিন। অথচ তার চেহারার দিকে তাকানোর কোন সুযোগ ছিল না আমাদের। সারাদিনের অপেক্ষার ক্রোধে কর্কশ ভাষায় তার কাছ থেকে এত দেরির কারণ জানতে চাইলাম। জবাবে সে যা বলেছিল তা শুনে মাথা ঘুরে আমার পড়ে যাওয়ার অবস’া হয়েছিল। নিজেকে ধিক্কার দেয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। বাকরুদ্ধ হয়ে হকারকেও কোন সান্ত্বনার কথা বলতে পারিনি। হকার মলিন চেহারা আর শান্ত গলায় দেরির কারণ হিসাবে বলেছিল তার বাবা মারা গেছেন কাল রাতে। আজ দুপুরে জানাজা আর দাফন-কাফন পর্ব সারতে হয়েছিল বলেই আজ এত দেরি। ঐদিনের স্মৃতি মনে হলে আমার আজও কান্না পায়। আমাদের সমাজে একদল মানুষ শুধুমাত্র দু’বেলা খাবার জোগাড়ের জন্য জীবনের সমস্ত আনন্দ বেদনা বিসর্জন দিয়ে অন্য মানুষ গুলোর দৈনন্দিন অভ্যাস ঠিক রাখার কাজে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। সমাজের এই শ্রেণী বৈষম্য দূরীকরণের জন্য, ধনী-গরীবের মধ্যে আকাশ পাতাল ব্যবধান কমানোর জন্য আমরা স্বাধীন হয়েছি, সংবিধানেও সমাজতন্ত্র সংযোজন করেছি, কিন’ এই ব্যবধান কমার পরিবর্তে দিন দিন বেড়েই চলছে। আমাদের মিডিয়া এই বৈষম্য দূরীকরণে জনমতকে প্রভাবিত করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ কি-না আমার যথেষ্ট সন্দেহ হয়। আমি চাই অনলাইন পত্রিকা “সিলেটের সকাল” এই ব্যাপারে অঙ্গীকারাবদ্ধ হবে। এই হকারের মত গরীব মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সমাজের বিবেককে জাগ্রত করতে সাধ্যমত চেষ্টা করবে।
সকাল বেলার আনন্দে ছেদ ঘটার আরেকটি কারণ হচ্ছে পত্রিকার খবর। কোন খবর যখন বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যহীন হয়, অর্ধ সত্য – অর্ধ মিথ্যার আবরণে আচ্ছাদিত থাকে কিংবা পুরো সত্যের পরিবর্তে খন্ডিত সত্যকে উপস’াপন করে তখন মন খারাপ হয়। আমার প্রত্যাশা খবরের ক্ষেত্রে “সিলেটের সকাল” সত্য প্রকাশে হবে আপোষহীন। ক্ষমতার লাল চোখ, পেশী শক্তির আস্ফালন, প্রভাবশালীদের অঙ্গুলী, অর্থের বিষাক্ত ছোবল কিংবা বন্ধু-স্বজনদের প্রতি কাতরতা, “সিলেটের সকাল” কে সত্য খবর সঠিক সময়ে প্রকাশ থেকে একচুলও বিচ্যুত করতে পারবে না বলে বিশ্বাস করতে চাই।
অনলাইন পত্রিকাগুলো প্রচলিত পত্রিকা থেকে তাৎক্ষণিক খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে একচ্ছত্র সুবিধা ভোগ করে থাকে। বর্তমানে প্রচলিত পত্রিকাগুলো রাতের বেলা প্রেসে যায়। এরপর যত গুরুত্বপূর্ণ খবরই আসুক না কেন তা দিতে পারে না-এর পরদিনের পত্রিকা প্রকাশের আগ পর্যন্ত। অথচ অনলাইন পত্রিকা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন খবর সংযোজন করতে পারে-তার পত্রিকায়। সিলেট থেকে প্রকাশিত কোন অনলাইন পত্রিকাই এই কাজটি করে না। সাধারণত সিলেটের অনলাইন পত্রিকাগুলো পড়াও হয় না। শখের বশে একদিন সিলেটের একটি অনলাইন পত্রিকা ভিজিট করে তিনমাস আগের খবর দেখে অবাক হই। এরপর আর কোনদিন সিলেটের অনলাইন পত্রিকায় ক্লিক করা হয় নাই। আমার মনে হয় ”সিলেটের সকাল” সিলেট বাসীর এই তরতাজা খবর প্রাপ্তির চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে। আর হয়ত কোর্ট পয়েন্টে পুলিশ আর রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার কারণে কোন কিছু না জেনে সিলেট প্লাজা, শুকরিয়া মার্কেট, সিটি সেন্টার, আল-হামরা, চৌহাট্রা এমনকি আম্বরখানা পর্যন্ত সবাই দোকানের শাটার লাগাবে না। হাতের কাছে যাদের ইন্টারনেট সংযোগ আছে তারা “সিলেটের সকাল” এ ক্লিক করে জেনে নেবে আসল ঘটনা।
এইসব সুবিধার কথা চিন্তা করে আর প্রিন্টেড পত্রিকা ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে আজকাল বিশ্বের অনেক নামী পত্রিকাও হার্ড কপির পরিবর্তে অনলাইনে সফ্‌ট কপিতে চলে যাচ্ছে। বিশ্ববিখ্যাত সাময়িকী “নিউজ উইক” ডিসেম্বর ২০১২ তে তাদের আশি বছরের দীর্ঘ যাত্রাপথে সর্বশেষ হার্ড কপি প্রকাশ করছে। জানুয়ারী মাস থেকে তারা অনলাইনে চলে যাচ্ছে। পত্রিকার প্রধান সম্পাদক টনি ব্রাউন সর্বশেষ প্রিন্টেড সংখ্যায় এই পরিবর্তনকে শুধু ভাল নয় প্রয়োজনীয় হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। ”সিলেটের সকাল” পত্রিকার কর্তৃপক্ষ এই প্রয়োজনীয়ার কথা শুরুতেই বিবেচনা করে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। এই দূরদর্শিতার সাথে যদি পত্রিকার সাংবাদিকদের দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সংযোগ ঘটে তাহলে সিলেটবাসী নিশ্চয়ই উপকৃত হবে।
পরিবেশবাদীরাও কাগুজে পত্রিকার পরিবর্তে অনলাইন পত্রিকার পক্ষে। সারাবিশ্বে প্রতিদিন যত কাগজের ব্যবহার হয় তা প্রস’ত করতে যে পরিমাণ বনাঞ্চল উজাড় হয়, ঐ পরিমাণ বনাঞ্চল তৈরী করতে প্রায় পঁচিশ বছর সময় লাগে। আর প্রতিদিনের ব্যবহৃত কাগজের মধ্যে ৬২% কাগজ সংবাদ পত্র প্রকাশে ব্যবহৃত হয় (সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর, ২৪শে ডিসেম্বর)। তাই পরিবেশবাদীদের মতে সবুজ বনাঞ্চল ধ্বংসের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্টের ক্ষেত্রে কাগুজে সংবাদ পত্রের ভুমিকা উল্লেখযোগ্য। অনলাইন পত্রিকা “সিলেটের সকাল” এক্ষেত্রেও পরিবেশবান্ধব হিসাবে হচ্ছে।
আমরা আশা করছি-বর্তমান এই ডিজিটাল যুগে অনলাইন পত্রিকা “সিলেটের সকাল” সিলেটবাসীর প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হবে। আজকাল বাংলাদেশে নতুন কৌশলের সব বড় দুর্নীতিকে ডিজিটাল দুর্নীতি হিসাবে ব্যঙ্গ করা হয়, নিত্য নতুন নেতিবাচক সব ঘটনাকে ডিজিটাল ঘটনা হিসাবে বর্ণনা করা হয়। তাই জানি না নিউজউইকের টনি ব্রাউনের অঙ্গীকার – One thing, however, will not change, and that is our commitment to journalism of the very highest quality এর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া ঠিক হবে কি-না। তবে আমি বিশ্বাস করি এই নতুন অনলাইন পত্রিকার সকল সাংবাদিক সিলেটবাসীকে একটি সুন্দর, স্বচ্ছ পত্রিকা উপহার দিতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। তাই আমরাও সিলেটের সকালের আগমনী বার্তা শুনে একটি সুন্দর-শুভ্র সকালের প্রতীক্ষায় আছি।
লেখকঃ ব্যাংক কর্মকর্তা

mahmudpukra@gmail.com

 

শেয়ার করুন