খালেক স্যারের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে-

 

মানুষের জীবনে অবধারিত। প্রত্যেক মানুষকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। সব মৃত্যুই পীড়াদায়ক। কিন্তু কিছু কিছু মৃত্যু মানুষকে নাড়া দেয় দারুণভাবে। সিলেট শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এস এম আব্দুল খালেকের মৃত্যুও সিলেটবাসীকে আহত করেছিল সেভাবে।
প্রফেসর আব্দুল খালেক ছিলেন ইংরেজী সাহিত্যে অগাধ পান্ডিত্যের অধিকারী। একজন সুপন্ডিত। ইংরেজী সাহিত্যে সিলেট অঞ্চলে সমসাময়িককালে তাঁর মতো ‘পন্ডিত’ দ্বিতীয়জন আমার জানা নেই।
১৯৯৪ সালে সিলেট সরকারি কলেজে যোগদান করেন খালেক স্যার। এটাই ছিল সিলেট বিভাগে তার প্রথম পোস্টিং। এর আগে তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগে কর্মরত ছিলেন। প্রফেসর খালেকের যোগদানের আগ পর্যন্ত সিলেট সরকারি কলেজে ইংরেজী শিক্ষকের সবকটি পদ খালি ছিল। এম সি কলেজ থেকে মাঝে-মধ্যে জয়নুল আবেদীন স্যার (জ্যাক স্যার) এসে সরকারি কলেজের ক্লাস নিতেন। মাঝে-মধ্যে কলেজের প্রিন্সিপাল গোলাম কিবরিয়া স্যারও ইংরেজীর ক্লাস নিতেন। নিয়মিত ইংরেজীর ক্লাস না হওয়ায় সরকারি কলেজের ছাত্ররা ছিল ইংরেজীতে ছিল খুবই দুর্বল। এরপর ‘আলোকবর্তিকা’ হিসাবে সরকারি কলেজের ইংরেজী বিভাগে যোগদান করলেন খালেক স্যার। তাঁর যোগদানের পর কলেজে নিয়মিত ইংরেজীর ক্লাস হতে লাগল। এ বিভাগে যোগ দিলেন প্রফেসর হারুনুর রশীদ স্যারও।
খালেক স্যার ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের শিক্ষক। জগন্নাথ কলেজে তিনি মাস্টার্সের ইংরেজী পড়াতেন। ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র হিসাবে আমিসহ অনেক ছাত্র মনে করেছিলাম, সরকারি কলেজে স্যারের স্থায়িত্ব বেশীদিন হবে না। কিন্তু, সরকারী কলেজে একাধাওে ৫/৬ বছর কাজ করে স্যার প্রমাণ করে দিলেন-শিক্ষার ক্ষেত্রে বড়-ছোট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলতে কিছু নেই। বলতে গেলে, স্যারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সরকারী কলেজের শিক্ষার্থীরা উত্তরোত্তর ভালো ফলাফল করতে লাগল।
এরশাদ সরকারের আমলে ডিগ্রী(¯œাতক) কোর্স থেকে ইংরেজী বিষয়টি উঠিয়ে দেয়া হয়। আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের ইংরেজীতে দুর্বলতার জন্য এটি একটি অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে আবার ডিগ্রী কোর্সে ২০০ মার্কসের ইংরেজী অন্তর্ভূক্ত করা হয়। ডিগ্রীর সিলেবাস কমিটির সদস্য ছিলেন জনাব খালেক স্যার। তার সুপারিশে ডিগ্রী কোর্সে ডায়ালগ(কথোপকথন) অন্তর্ভূক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ইংরেজীতে কথোপকথনের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
খালেক স্যার কেবল একজন শিক্ষকই ছিলেন না। তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন ভালো মানুষ। শিক্ষার্থীদের সাথে তার মধুর সম্পর্ক, সময়ানুবর্তিতা, সহকর্মীদের প্রতি তার দায়িত্ববোধ সর্বোপরি কর্তব্যনিষ্টা তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।
সরকারী কলেজের যোগদানের কিছুদিন পরই স্যার ইংরেজী সাহিত্যে পিএইচডি (ডক্টর অব ফিলোসফি) ডিগ্রী অর্জন করেন। এরপর তার দ্রুত পদোন্নতি হতে লাগলো। প্রভাষক থেকে অল্প দিনের ব্যবধানেই তিনি সহকারী অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। পর্যায়ক্রমে তিনি সহযোগী অধ্যাপক এবং অধ্যাপকও হন। এরপর ২০০৬ সালে সিলেট শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান হিসাবে প্রেষণে যোগ দেন। সেখানে কর্মরত থাকা অবস্থায় ২০১২ সালের ১৩ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়।
আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুন। আমিন।
মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম ঃ সম্পাদক, সিলেটের সকাল

শেয়ার করুন